আবৃত্তি এখন শুধু বিনোদন নয়, অধিকার আদায়েরও হাতিয়ার : রাশেদ হাসান

0

তাঁর কথার জাদুতে মোহিত হয় মানুষ। ভরাট কন্ঠে যখন কবিতার লাইন ধ্বনিত হয় তখন বিমুদ্ধ দর্শক উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন।হতাশার মাঝেও তিনি গেয়ে যান আশার গান।তরুণদের মাঝে বুনে দিতে চান স্বপ্নের মায়াজাল।দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে এ সপ্ন ফেরি করে বেড়াচ্ছেন আবৃত্তি’র মত শক্তিশালী মাধ্যম দিয়ে।তিনি আবৃত্তিশিল্পী রাশেদ হাসান। আবৃত্তি ও উপস্থাপনা দুই ক্ষেত্রেই রাজত্ব তাঁর। তবে আবৃত্তিই হচ্ছে তাঁর প্রথম ভালোবাসার জায়গা। তিনি স্বপ্ন দেখেন শ্রেণী বৈষম্যহীন ও মৌলবাদমুক্ত এক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের। এছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে গণজাগরণ মঞ্চের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে সবসময়ই ছিলেন সামনের সারিতে। সম্প্রতি বিডিজার্নাল৩৬৫ কার্যালয়ে আড্ডায় সবিস্তারে বলেন তাঁর পথচলার দীর্ঘ পথের কাহিনি। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন বিডিজার্নালের প্রধান প্রতিবেদক রুবেল দাশ ও বিশেষ প্রতিনিধি শেখ মেহেদী হাসান।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : দীর্ঘ সময় আবৃত্তিকে সাথে নিয়েই আছেন। আবৃত্তির প্রতি ভালোবাসাটা কিভাবে জন্মাল?

রাশেদ হাসান : স্কুলে পড়ার সময়ই আবৃত্তির প্রতি ভালোলাগা তৈরি হয়। ভালোলাগা থেকে ভালোবাসা। আর এখনতো ভালোবাসার পাশাপাশি আবৃত্তি একটি কমিটমেন্টের জায়গায় স্থান পেয়েছে।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : কমিটমেন্ট বলতে আসলে কি বোঝাচ্ছেন?

রাশেদ হাসান : আমি মনে করি, শুধু বিনোদনের জন্য শিল্পচর্চা নয়। দুই অক্ষরের শিল্পী শব্দটা অনেক গভীর। যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করছি সেই মাটির প্রতি দায়বদ্ধতা। শিল্পী হিসেবে যখন মঞ্চে দাঁড়াচ্ছি তখন কিছু মানুষ ভালোবাসছে এবং বাসবে। কিন্তু আমার কথা হল, শিল্পের মাধ্যমে তাদের কী বার্তা দিচ্ছি, সেটা বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় আমার কাছে। আবৃত্তিকে প্রসাধনপ্রিয় শৌখিন মাধ্যম হিসেবে দেখতে নারাজ আমি। আবৃত্তিকে এখন অধিকার আদায়ের হাতিয়ারও বলা যায়।আমরা ক্রমাগত স্বপ্নহীন জাতিতে পরিণত হচ্ছি। সবাই কেমন যেন আত্মকেন্দ্রিক। নিজেকে নিয়েই আমাদের সব চিন্তাভাবনা। একটা তরুণকে স্বপ্ন দেখানোই আমাদের কাজ। হতে পারে ছোট পরিসরে। এবং বলছি না যে, আমরাই পুরো দেশটাকে বদলে দিতে পারব। তবে আমরা চেষ্টা করে যাব। আমরা যদি ১০টি তরুণকে স্বপ্ন দেখাতে পারি তাহলে সে ১০ জন আরো ১০জনকে স্বপ্ন দেখাবে।এভাবেই একদিন বদলে যাবে দেশ।আমরা সবাই কিন্তু একই মতের। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংকটে আর কিছু না হোক আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়েছি। গলা মিলিয়ে প্রতিবাদ করেছি।
বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : হুম তা ঠিক। আপনি তো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের শুরু থেকেই চট্টগ্রাম গণজাগরণ মঞ্চের সামনের সারির একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন, এখনো আছেন। একজন সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে এ বিষয়টি নিয়ে কিছু বলবেন?

রাশেদ হাসান : আসলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি। এ দেরি করার কারণেই এখন বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। অনেকে এসব যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করছে। তারা বলছে, ফাঁসি না দিয়ে কি যাবজ্জীবন দেয়া যেত না। হয়ত সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই তারা এসব বলছেন। কিন্তু তারা কি একবার ভেবে দেখেছেন, এই যুদ্ধাপরাধীরা যাদের পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করেছেন তাদের অনুভূতিটা কেমন? অথবা আপনার পরিবারের কেউ যদি এসব রাজাকার-আলবদরদের হাতে মারা যেতেন তখন আপনি কি এসব কথা বলতে পারতেন?   

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : আসলেই। কিন্তু অনেকে আবার বলছেন সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিচার হচ্ছে। বেছে বেছে বিএনপি-জামায়াতের নেতাদেরই ফাঁসির কাষ্ঠে তোলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে কি বলবেন?

রাশেদ হাসান : দেখুন, আমি কোন রাজনৈতিক কর্মী নই। তবুও বলতে পারি এগুলো এক ধরণের মোটা দাগের স্থুল কথাবার্তা। আমরা কিন্তু কাউকে যুদ্ধাপরাধ করতে দেখেনি বা মুক্তিযুদ্ধও দেখেনি। ‍কিন্তু ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদ, সাকা এরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে কাজ করেছে।এমনকি এদের অনেকে নিজের মুখেই তা স্বীকার করেছে। তাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হচ্ছে, এ কথা অবান্তর।  

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : এছাড়া সাকা-মুজাহিদের ফাঁসির পর পাকিস্তান তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

রাশেদ হাসান : হুম। এ থেকেই প্রমাণিত হয় এসব যুদ্ধাপরাধীরা বাংলাদেশ স্বাধীনের পরও দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে গেছে এবং পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছে। তাই পাকিস্তানের তাদের প্রতি এত দরদ। এদের অনেকে মন্ত্রী হয়ে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে দেশের বিপক্ষে কাজ করেছে। এর চেয়ে লজ্জার আর কি হতে পারে। আর পাকিস্তান এর আগেও এমন করেছিল যখন কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এবারও তা করল। ভবিষ্যতেও তারা যদি এমন করে তাহলে সরকারের কাছে আমাদের দাবি থাকবে পাকিস্তানের বাংলাদেশি দূতাবাস বন্ধ করে দেয়া এবং তাদের সাথে সকল কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : প্রমা আবৃত্তি সংগঠনতো আপনার নিজের হাতে গড়া। এটি নিয়ে কিছু বলুন।

রাশেদ হাসান : ১৯৯০ সালের ২৯ নভেম্বর আমরা কয়েকজন স্বপ্নবাজ তরুণ মিলে সংগঠনটি শুরু করি। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রমা’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। দেখতে দেখতে সংগঠনটি এখন ২৫ বছর পূর্তির দোঁড়গোড়ায়। এ মাসের ২৯ নভেম্বর সংগঠনটি ২৫ বছর পূর্তি উদযাপন করবে।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : এ উপলক্ষে নিশ্চয়ই সংগঠনের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে?

রাশেদ হাসান : হুম। ২৯ নভেম্বর শিল্পকলা একাডেমীতে শান্তির স্বপক্ষে আলোর মিছিল করব আমরা। এছাড়া নগরীর বিশিষ্টজনেরা নানা বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরবেন সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায়। এদিন ছোট পরিসরেই অনুষ্ঠান করব আমরা। পরে জানুয়ারিতে বড় পরিসরে একটি অনুষ্ঠান করা ইচ্ছা আছে।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : আপনার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছু বলুন।

রাশেদ হাসান : আমার জন্মতারিখ ২০ সেপ্টেম্বর। লালদীঘি এলাকায় জন্ম হলেও এখন বসবাস করছি পূর্ব মাদারবাড়িতে। প্রাইমারী শিক্ষাজীবন কেটেছে সেন্ট মেরিস স্কুলে। মাধ্যমিকে ছিলাম মুসলিম হাই স্কুলে। কলেজ জীবন কেটেছে মহসীন কলেজে এবং সর্বশেষ ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে কমার্স কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করি। এখনো বিয়ে করা হয়নি। মা হাসনাহেনা হুদা। যিনি আমাকে সবসময়ই আবৃত্তির ব্যাপারে উৎসাহ দিয়ে যান। বাবা মরহুম ডা. এ বি এম কামরুল হুদা। আমার বড় বোন তার স্বামী-সন্তানসহ এখন লন্ডনে বসবাস করছে।

উল্লেখ্য, রাশেদ হাসান ২০০৪ সালে সাউন্ড ক্যাসেলের আয়োজনে লন্ডনে ব্র্যাডি আর্টস অ্যান্ড কমিউনিটি সেন্টার, ২০০৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দারভাঙ্গা হলে মঞ্জুষ দাশগুপ্ত স্মৃতি সংসদের আয়োজনে সারা বাংলা আবৃত্তি অভিযান উৎসব ও ২০১২ সালে আবৃত্তি সংগঠন কবিতালোকের আমন্ত্রণে ভারতের আগরতলায় নজরুল কলাক্ষেত্রে একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন।
এ ছাড়া নিয়মিত দেশে-বিদেশে আবৃত্তি করে চলেছেন। আবৃত্তিচর্চায় স্বীকৃতিও পেয়েছেন বহুবার। ১৯৯৬ সালে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগে আবৃত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক তাঁর মধ্যে অন্যতম। নির্দেশনা দিয়েছেন ‘স্মৃতি-৭১’, ‘পরানের গহীন ভিতর’, ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’, ‘কথা মানবীর ভাষ্য’, ‘মানুষ জাগবে ফের’সহ বেশ কিছু আবৃত্তি প্রযোজনায়।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম //আরডি //এসএমএইচ// ২৮ নভেম্বর২০১৫

Share.

Leave A Reply