জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জাদু দেখিয়ে যেতে চাই : রাজীব বসাক

0

রাজীব বসাক। জাদুর জগতে অনন্য এক নাম। যার জাদুতে মোহাবিষ্ট হয় দর্শক। তাঁর রসাল ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনা সহজেই ছুঁয়ে যায় দর্শক হৃদয়। দেশের প্রতিটি জেলাতেই ম্যাজিক শো করেছেন প্রখ্যাত এ জাদুশিল্পী। জুয়েল আইচের পর সম্ভবত দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় জাদুশিল্পী চট্টগ্রামের ছেলে রাজীব বসাক। সম্প্রতি বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম কার্যালয়ে এসে সবিস্তারে বর্ণণা করেছেন তার জাদুশিল্পী হয়ে ওঠার গল্প, ব্যক্তিগত জীবন, ভবিষ্যত চিন্তা ও চট্টগ্রামকে নিয়ে নানা ভাবনার কথা। তাঁর সাক্ষাতকার নিয়েছেন বিডিজার্নালের প্রধান প্রতিবেদক রুবেল দাশ ও বিশেষ প্রতিনিধি শেখ মেহেদী হাসান। পাঠকদের জন্য সাক্ষাতকারের চুম্বক অংশ নিচে তুলে ধরা হল। 

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : এত কিছু থাকতে জাদুশিল্পী হওয়ার চিন্তা কিভাবে মাথায় এল?

রাজীব বসাক : ১৯৮৬ সাল। ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে মাত্র। আমার এক বন্ধু সুকান্ত পাল সে বিভিন্ন জায়গায় ম্যাজিক দেখাত। মূলত তার কাছ থেকেই ম্যাজিকের প্রথম ধারণা পেয়েছিলাম। পরীক্ষা শেষ হওয়ার কারণে আমিও তার সাথে কয়েকটি শোতে গেলাম।আমার কাজ ছিল তার জাদুর উপকরণের বাক্সটি দেখে রাখা এবং জিনিসগুলো যথাস্থানে সাজিয়ে রাখা। কিছুদিন পর আমার বন্ধুটি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেল। তার জাদুর উপকরণের বাক্সটি আমার কাছেই ছিল। এরপর সেগুলো দিয়ে নিজেই জাদু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এভাবেই জাদুর জগতে চলে আসা।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : পরিবার থেকে সমর্থন কেমন ছিল এ ব্যাপারে?

রাজীব বসাক : সত্যি কথা বলতে, পরিবার থেকে কখনোই আমি সমর্থন পাইনি। আমার বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। তিনি কখনো মেনে নিতে পারেননি তার ছেলে মানুষকে জাদু দেখিয়ে টাকা উপার্জন করবে। তবে শত বাধা সত্ত্বেও আজ আমি নিজেকে একজন জাদুশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছি। কারণ আমার বিশ্বাস মানুষ মন থেকে কিছু করার চেষ্টা করলে সে অবশ্যই সফল হয়। আর জাদু হচ্ছে আমার ভালোবাসার জায়গা। তাই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দর্শকদের জাদু দেখিয়ে যেতে চাই।     

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : প্রথম জাদু দেখিয়ে কত টাকা উপার্জন করেছিলেন?

রাজীব বসাক : এটাও ১৯৮৬ সালের ঘটনা। একটা জন্মদিনের অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের টেরিবাজারের আফিমের গলিতে জাদু দেখিয়ে ১০০ টাকা আয় করেছিলাম।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : বর্তমানে বাংলাদেশে জাদুর অবস্থা কেমন  বলে মনে করেন আপনি?

রাজীব বসাক : খুবই খারাপ অবস্থা। পুরো সংস্কৃতি অঙ্গণের অবস্থাইতো ছন্নছড়া। এজন্য পৃষ্ঠপোষকরাই দায়ী। তারাই শিল্প-সংস্কৃতিতে ভেজাল মিশিয়ে দিচ্ছে। অযোগ্য লোকেরা বড় পদে বসে আছে। তারা শিল্পীদের গুণের কদর করতে জানে না। আর জাদুকে তো অনেকেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের বিষয় বলে মনে করে। মানুষকে যখন বলি, আমি একজন ম্যাজিশিয়ান তখন বিস্ময়ভরা কন্ঠে তারা আামকে পাল্টা প্রশ্ন করে, আপনি ম্যাজিক দেখান! যেন আমি কোন অন্য গ্রহের প্রাণী।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : তবে যে যাই বলুক, আপনি কিন্তু এখন বেশ জনপ্রিয়।কিন্তু জনপ্রিয় হওয়ার পরেও আপনি চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকা যাননি। অথচ আমাদের দেশে সচরাচর যেটা দেখা যায় খ্যাতির চূড়ায় ওঠার জন্য সবাই ঢাকায় পাড়ি জমায়। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি?

রাজীব বসাক : দেখুন ম্যাজিকের উৎপত্তি কিন্তু চট্টগ্রাম থেকেই। সেই চাঁটিগা’র আমলেই পিসি সরকার এ অঞ্চলে ম্যাজিককে জনপ্রিয় করেছিলেন। পরে ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীতে তা জনপ্রিয় হয়। কিন্তু অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে বাইরের ম্যাজিশিয়ানদের আমাদের অনুকরণ করতে হচ্ছে। আর আমাদের দেশের মানুষ কালো জাদু, সাদা জাদু নামের দুই ধরণের বিভক্তি নিয়ে এসেছে জাদুর মধ্যে। আসলেই কি জাদু সাদা বা কালো হতে পারে? আর চট্টগ্রাম আমার জন্মভূমি। এখানে থেকেই আমি কিছু একটা করে দেখাব। আমার বিশ্বাস কিছু করার জন্য ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রয়োজন। দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এজন্য অবশ্য মিডিয়ারও খানিকটা দায় আছে। চ্যানেল, পত্রিকাগুলো চট্টগ্রামের জন্য বিশেষ সংবাদ বরাদ্দ রাখে। এটা কেন? চট্টগ্রামে কি আজব মানুষরা বসবাস করে? তাহলে আপনারা ঢাকার জন্য বিশেষ সংবাদ প্রচার করেন না কেন? চট্টগ্রাম দেশকে এত কিছু দিয়েছে অথচ চট্টগ্রাম সে তুলনায় কিছুই পায়নি। তাই আমি যা কিছুই করি না কেন চট্টগ্রামে থেকেই করব। যাতে আমার নামের সাথে সবসময় চট্টগ্রামের নাম উচ্চারিত হয়।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : জাদু নিয়ে কোন মজার বা স্মরণীয় ঘটনা আছে?

রাজীব বসাক : সম্ভবত ২০০৭ সালের ঘটনা। মুরাদপুর বন গবেষণাগার ইনস্টিটিউটের এক কর্মকর্তা তার এক কলিগের মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে পারফর্ম করার জন্য আমার সাথে যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু স্বাভাবিকের চেয়ে কম টাকা দিতে চাচ্ছিল তারা। তাই প্রথমে রাজি হইনি। কিন্তু লোকটির ব্যবহার এত ভালো ছিল যে না করতে পারিনি। তো সন্ধ্যায় সে বাসায় গিয়ে দেখি কোন আয়োজন নেই, মেহমান নেই। কেমন যেন অদ্ভুত পরিবেশ। পরে লোকটি আমাকে তার মেয়ের রুমে নিয়ে গেল। মেয়েটি খাটে বসে আছে। লোকটি বলল জাদু দেখানো শুরু করতে। বলে তিনি চলে গেলেন। আমি প্রথমে একটু ভড়কে গিয়েছিলাম। পরে একলা ঘরে মেয়েটিকে জাদু দেখানো শুরু করি। প্রতিটি জাদুতেই সে খুব জোরে জোরে হাততালি দিচ্ছিল আর মজা পাচ্ছিল। মেয়েটির বয়স আনুমানিক ১৬ বছর হবে। যেহেতু মেয়েটি ঘরে একা ছিল তাই আমি ৬-৭টি ম্যাজিক দেখিয়েই ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আসার সময় তার বাবা আমাকে হাতে টাকা ধরিয়ে দিল আর বলল আমার মেয়েটি চোখে দেখেনা। সে কি আপনার ম্যাজিক উপভোগ করেছে? এ কথা শুনে আমি স্থির হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল তাকে টাকাগুলো ফেরত দিয়ে আসি। কিন্তু কেন জানি পারিনি। এ ঘটনা আমাকে আজো তাড়া করে বেড়ায়।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছু বলুন?

রাজীব বসাক : আমার জন্ম ১৯৭০ সালের ১৭ এপ্রিল, চট্টগ্রামের কোতোয়ালীতে। আমার বাবা মৃত বিশ্বনাথ বসাক ছিলেন ব্যবসায়ী। মা সতী বসাক। ২ ভাই ১ বোনের মধ্যে আমি সবার বড়। প্রাইমারী ও মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করি সেন্ট প্লাসিড স্কুল থেকে। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি এবং বাংলায় বিএ (পাস) করি। ভালোবেসে বিয়ে করেছি শম্পা বসাককে। ৩ মেয়ে আর ১ ছেলে নিয়ে আমাদের সংসার।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : কার জাদু দেখে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত হন?

রাজীব বসাক :  এক কথায় জুয়েল আইচ। তার কাছ থেকে সবসময় সহযোগিতা পেয়েছি। বাংলাদেশে তো তিনিই জাদুর পথিকৃৎ। তাকে দেখলে আর কিছুই লাগে না।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : কোন ইচ্ছেগুলো জীবদ্দশায় পূর্ণ করে যেতে চান?

রাজীব বসাক : আমার তিনটে ইচ্ছে। প্রথমত, জাদু নিয়ে ছোট-বড় ২০০ এর অধিক সম্মাননা পেয়েছি। তবে জীবদ্দশায় জাদু নিয়ে জাতীয় যে কোন সম্মাননা পেতে চাই। দ্বিতীয়, ঢাকার যেকোন পত্রিকায় আমার সাক্ষাতকার দেখতে চাই। আর শেষ ইচ্ছে হল, বিলবোর্ডে আমার ছবি দেখতে চাই।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম : আমরাও চাই আপনার ইচ্ছেগুলো পূরণ হোক। ধন্যবাদ আপনাকে।

রাজীব বসাক : আপনাদেরও ধন্যবাদ।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম //আরডি //এসএমএইচ// ০৩ ডিসেম্বর ২০১৫

Share.

Leave A Reply