সবুজ পাহাড়ে সাহসী মেয়েদের স্বপ্নগাথা

0

নিজস্ব প্রতিবেদক :

শুক্রবার সকাল ৯টা। স্থান নগরীর সিআরবি রেলওয়ে মাঠ। এমনিতেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে্যর নিগর্সে ভরা জায়গাটি একটু নির্জন। তার ওপর ছুটির দিন হওয়ায় রাস্তায় নেই তেমন কোলাহল। জনমানুষের পদচারণাও নেই বললেই চলে। তবে ছুটির দিনের এই ভোরবেলাতেও মাঠের মাঝখান থেকে ভেসে আসছে কিছু নারী কন্ঠের দীপ্ত আওয়াজ। নানা শারীরিক কসরতে ব্যস্ত তারা। হঠাৎ দেখলে যে কেউ ভিমড়ি খেতে বাধ্য। ২০-২৫ জনের একটি মেয়ের দল বাতাসে পা উঠিয়ে একবার লাথি দিচ্ছে তো পরেরবার হাত দিয়ে শত্রুর আক্রমন কিভাবে ঠেকানো যায় সে তালিম নিতে ব্যস্ত। মূলত সমাজে দিন দিন বেড়ে চলা নারীর প্রতি সহিসংতা ও ইভটিজিংয়ের মত সামাজিক ব্যাধিকে নিজ হাতে রুখতেই তাদের এ বিশেষ প্রশিক্ষণ। আর এ প্রশিক্ষণের নেপথ্যের কারিগর মো. ইমরান নামের এক যুবক। পেশায় চাটার্ড একাউন্ট্যান্ট ইমরান ‘দ্যা ক্র্যাক প্লাটুন’ নামের সংগঠনের সাইড প্রজেক্ট হিসেবে ‘সেল্ফ ডিফেন্স প্রজেক্ট’ নামের এ প্রজেক্টটি শুরু করেন। প্রজেক্টের মেয়েদের এ দলটি নিয়ে কাজ করে চলছেন নিরলসভাবে। ইভটিজারদের কিভাবে শায়েস্তা করা যায় সে মন্ত্রই জপে দিচ্ছেন প্রতিটি মেয়ের কানে।14256708_1269344983078137_5

প্রশিক্ষণের এক ফাঁকে মাঠের পাশে বসেই ইমরান শোনালেন নিজের ও তার হাতে গড়ে তোলা এ সাহসী মেয়েদের গল্প। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে পরপর দু’বার পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে। এরপর সম্প্রতি তনু হত্যার ঘটনা পুরো দেশকে হতভম্ব করে দেয়। তাহলে কি এভাবেই মেয়েরা সর্বক্ষেত্রে নিগৃহীত হবে, অকালে প্রাণ দেবে? ইমরান ভাবলেন কিছু একটা করতে হবে। সামাজিক সংগঠন ক্র্যাক প্লাটুনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। সংগঠনটির কাজ ছিল দুস্থদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাহায্য-সহযোগিতা করা। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জুডো ও কারাতে ক্লাবে ইমরান ৪ বছর ধরে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন জুডো ও কারাতের উপর। ভাবলেন তার এ প্রশিক্ষণ কাজে লাগাবেন। পেশার খাতিরে চট্টগ্রাম এসেই শুরু করে দিলেন কাজ। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘দ্যা ক্র্যাক প্লাটুন’ নামের একটি গ্রুপ গঠন করলেন যেখানে আগ্রহী মেয়েদের বিনামূল্যে মিক্স মার্শাল আর্টের  প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, যাতে রাস্তা-ঘাটে যেকোন প্রতিকূল পরিবেশে তারা আত্মরক্ষা করতে পারে। মাত্র একজন মেয়ে নিয়ে তখন যাত্রা শুরু করেছিলেন ইমরান। বছর না ঘুরতেই সে গ্রুপের সদস্য এখন ৩০ জন। সপ্তাহে ৩-৪টি ক্লাস নেয়া হয়। স্থান ওই সিআরবি’র মাঠ। সপ্তাহের অন্যান্য দিন নির্ধারিত না থাকলেও শুক্রবার সকালে অবশ্যই অনুশীলন হয়। আর বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ হওয়ায় প্রতি সপ্তাহেই বাড়ছে মেয়ের সংখ্যা।14182278_1269344976411471_1

এখানে মার্শাল আর্ট শেখা চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ১ম বর্ষের ছাত্রী ফাহমিদা আহমেদ কথা বলেন, এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের আত্মবিশ্বাস খুবই বেড়ে গেছে। এখন আর কোন ছেলেকেই ভয় লাগে না। এখন কেউ ইভটিজিং করলে সাথে সাথেই প্রতিবাদ করি। একবার টেম্পোতে করে যাওয়ার সময় এক বয়স্ক ব্যক্তি ইচ্ছে করেই আমার গায়ে হাত দিচ্ছিল। টেম্পো থেকে নেমেই তাকে থাপ্পড় লাগিয়ে দি্ই।

আনন্দিতা ইসলাম নামের আরেক প্রশিক্ষণার্থী বলেন, প্রথম যখন এখানে এসেছিলাম আত্মবিশ্বাস খুবই কম ছিল। মনে হচ্ছিল কিছুই করতে পারব না। স্ট্যামিনাও অনেক কম ছিল। একটু কসরত করলেই হাঁপিয়ে পড়তাম। এখন এসব সমস্যা আর নেই। 14256490_1269345039744798_3

তিনি আরো বলেন, প্রথম প্রথম যখন আমরা আমাদের প্রশিক্ষনের ছবিগুলো  ফেসবুকে আপলোড করা শুরু করি তখন অনেক নেতিবাচক মন্তব্য আসত। কিন্তু পত্রিকায় ও টিভিতে নিউজ আসার পর এখন অনেকে ইতিবাচক মন্তব্য করেন, উৎসাহ দেন।

প্রশিক্ষক মো. ইমরান বলেন, আমি চাই এ ধরণের উদ্যোগ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ুক। মেয়েদের সমান অধিকারের কথা বললেও অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েরা এখনো পিছিয়ে আছে। সবচেয়ে বড় বাধা সামাজিক প্রতিকূলতা। এই সামাজিক প্রতিকূলতা যতদিন কাটিয়ে উঠতে না পারব ততদিন আসলে কিছুই হবে না। তাই আমাদের মূল লক্ষ্য হল এ সামাজিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠা। মেয়েরাও যে ছেলেদের মত সবকিছু করতে পারে এ বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দেয়া।

কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে ইমরান বলেন, এখানে মেয়েদের প্রশিক্ষণ বিনামূল্যে। যেকোন মেয়ে যখন ইচ্ছা তখন এসে যোগ দিতে পারবে। কিন্তু এ ধরণের প্রশিক্ষণে শারীরিক চোট পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। প্রায় প্রতিদিনই ছোটখাট চোট পাচ্ছে মেয়েরা। এগুলোর জন্য ঔষধপত্র, ব্যান্ডেজ ইত্যাদি আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র মেয়েদের নিজ খরচে চালাতে হচ্ছে। এছাড়া কয়েকটি পাঞ্চিং ব্যাগের ব্যবস্থা করা গেলে অনুশীলনে অনেক গতি আসত। কিন্তু এখানের সব মেয়েই শিক্ষার্থী। তাই এসবের খরচ তুলতে তাদের অনেক কষ্ট হয়। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন কিংবা বিত্তবান ব্যক্তিরা যদি এসব সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন তাহলে এ মেয়েরা আরো এগিয়ে যেত।

যেভাবে সব বাধা পেরিয়ে এ মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে হয়ত এ ছোটখাটো বাধাগুলোও পারবে না সাহসী এ মেয়েদের রুখতে। তারা এগিয়ে যাবে দৃপ্ত পায়ে, এক নতুন বাংলাদেশের সন্ধানে। যেখানে থাকবে না কোন নারী নির্যাতন, ইভটিজিং কিংবা এসিড সন্ত্রাস। অকালে প্রাণ দেবে না কোন তনু, রিশা।  

 আরডি/ এসএমএইচ // ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Share.

Comments are closed.