‘জঙ্গিবাদের কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে’

0

নিজস্ব প্রতিবেদক :

২০১৬ সালটা আমাদের মত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য খুবই খারাপ গেছে। ২০১৫ সালে পেট্রোল বোমাবাজি ও অবরোধ-হরতালের মধ্যেও এত খারাপ অবস্থা যায়নি। এর মূল কারণ হলো দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ির কারণে বিদেশী বিনিয়োগ অনেক কমে গেছে। এছাড়া জঙ্গিবাদের কারণেও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলে ২০১৬ সাল আমাদের মত ব্যবসায়ীদের খুবই খারাপ কেটেছে। আশা করি ২০১৭ সালে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি এবং জঙ্গিবাদের অবসান ঘটবে। এতে দেশের সাধারণ মানুষেরই লাভ হবে।

কথাগুলো চট্টগ্রামের মেশিনারী ব্যবসায়ী আরমান উর রাসুলের। চট্টগ্রাম শহরের কোতোয়ালী থানাধীন এনায়েত বাজার এলাকার বাসিন্দা আরমান উর রাসুল দীর্ঘদিন ধরে মেশিনারী ব্যবসার সাথে জড়িত। নগরীর জুবিলী রোডে অবস্থিত খাজা গরীবে নেওয়াজ মেশিনারী স্টোরের মালিক তিনি। কিন্তু ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে জানালেন ২০১৬ সালটা ব্যবসায়িক দিক দিয়ে খুবই খারাপ গেছে তার। অন্য কোন বছর এত লোকসানের সম্মুখীন হননি। এমনকি ২০১৫ সালে যখন দেশে বিরোধী জোটের হরতাল-অবরোধ চলছিল তখনও ব্যবসায় লাভ হয়েছিল।unnamed-2

ব্যবসায় ক্ষতির কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল নয়। বিরোধী দল বিএনপি এখনও মনে করে সরকারী দল অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে বসে আছে। আর সরকারী দল বিরোধী দলের কোন কথাই কানে তুলছে না। এ দুই দলের পারষ্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ির কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা অনেকটাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এছাড়া ব্যাংকে অনেক অলস টাকা পড়ে থাকলেও ব্যবসায়ীরা লোন নিতে গেলে তালবাহানা শুরু করে। যার ফলে ব্যবসায় এখন ধস নামার জোগাড়।

২০১৬ সালে জঙ্গিবাদ ছিল টক অব দ্যা কান্ট্রি। জঙ্গিবাদের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ইসলাম ধর্মের কোথাও লেখা নেই ইসলাম কায়েম করতে হলে মানুষ খুন করতে হবে। নিরপরাধ মানুষ খুন করে কেউ জান্নাতে যেতে পারে না। তবে সরকারের জঙ্গিবাদ বিরোধী কার্যক্রমের প্রশংসা করতে হবে। হলি আর্টিসান ঘটনার পর সরকার জঙ্গিবাদ বিরোধী যে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ২০১৬ সালে জঙ্গিবাদ বিরোধী যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে ২০১৭ সালে সেটি পুরোপুরি নির্মূল হবে সেটাই আমাদের প্রত্যাশা সরকারের কাছে।unnamed-1

জঙ্গিবাদ বিরোধী কর্মকান্ডে খুশি হলেও সরকারী বিভিন্ন আমলা ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া নিয়ে হতাশ ব্যবসায়ী আরমান। দুর্নীতি বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারের উপর মহল থেকে একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে। সবার রোমে রোমে এখন দুর্নীতি। ঘুষ ছাড়া সরকারি অফিসগুলোতে কাজই হাসিল করা যায় না। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, আমার দোকানের প্রায় সব জিনিসই চীন থেকে আমদানি করি। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মালগুলো আনা হয়। কিন্তু কাস্টমস ও বন্দরের কর্মকর্তাদের প্রতি চালানের জন্য ঘুষ দিতে হয়। যদি ১ কোটি টাকার মাল আমদানি করা হয় তাহলে তাদের ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। ফলে এগুলো আমাদের ব্যবসায় প্রভাব ফেলে। এসব বিষয়ে সরকারের আরো সজাগ দৃষ্টি দেয়া উচিত। তবে বছরের শেষের দিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের কিছু পদক্ষেপ ভালো লেগেছে। এভাবে সারা বছরই দুর্নীতির বিরুদ্ধে যদি সরকারের সজাগ দৃষ্টি থাকত তাহলে ভালো হত।

নিত্যপণ্যের দাম দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের বাজারে সরকারের পক্ষ থেকে কোন মনিটরিং নাই। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমত দামে জিনিসপত্র বিক্রি করে। এছাড়া শুনেছি আগামী বছর থেকে নাকি গ্যাসের দাম আবারো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা হলে জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়বে। ফলে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়বে। প্রতিবছর যদি এভাবে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়তে থাকে তাহলে ব্যবসা-বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়বে।

এক মেয়ের জনক আরমান উর রাসুল দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল। তার মতে পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষার তেমন দরকার নেই। আর যদি জেএসসি পরীক্ষা নিতেই হয় তাহলে এসএসসি পরীক্ষা বাদ দিয়ে সরাসরি এইচএসসি পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে। কারণ পরীক্ষার ভারে শিশুরা এখন ক্লান্ত। তাই এবিষয়টি নিয়ে সরকারের চিন্তা-ভাবনা করা উচিত।

শিক্ষাক্ষেত্রেও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে উল্লেখ করে আরমান বলেন, নগরীর একটি স্বনামধন্য স্কুলে আমার মেয়েকে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে ভর্তি করিয়েছি। লটারিতে আমার মেয়ের নাম আসলেও টাকা ছাড়া স্কুল কর্তৃপক্ষ কোনভাবেই ভর্তি নেবে না। পরে টাকা দিয়ে ভর্তি করিয়েছি। এ ধরণের কর্মকান্ড সারাদেশেই হয়ত চলছে। তাই শুধু বছর বছর জিপিএ-৫ বাড়ালেই চলবে না, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানের দিকেও নজর দিতে হবে এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে হবে।

চট্টগ্রাম নগরী সম্পর্কে তিনি বলেন, ২০১৫ সালের চেয়ে ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম শহরেরর পরিচ্ছন্নতা অনেক বেড়েছে। এ বছরই চট্টগ্রাম শহর বিলবোর্ডমুক্ত হয়েছে। মেয়রের এ কর্মকান্ডগুলো খুবই প্রশংসিত হয়েছে। তবে মেয়রের নাম ভাঙ্গিয়ে অনেক সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিভিন্ন অন্যায় আবদার করে থাকেন। এসব বিষয় প্রতিরোধে মেয়রের দৃষ্টি আর্কষণ করছি।

দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়েও হতাশ ব্যবসায়ী আরমান। ক্ষোভের সুরে তিনি বলেন, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা মোটেও ঠিক নেই। সরকারি হাসপাতালগুলোর অবস্থা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। আর বেসরকারি হাসপাতালগুলোর কাজই যেন মানুষের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাওয়া। এ বছরের মাঝামাঝিতে চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ের নামকরা প্রাইভেট হাসপাতাল মেডিকেল সেন্টারে আমার শ্বশুরকে ভর্তি করাই। ভর্তির আড়াই ঘন্টা পর কোন কারণ ছাড়াই তারা আমার শ্বশুরকে আইসিইউতে নিয়ে যায়। কিন্তু তার অবস্থা তেমন গুরুতর ছিল না। পরে জানতে পারি ওইদিন তাদের আইসিইউ’র একটি সিট খালি হয়। বেশি টাকা নেয়ার জন্য তারা এ নাটক করে। পরে অন্য হাসপাতালে আমার শ্বশুরকে সিফট করে স্বাভাবিকভাবে চিকিৎসা করানো হয়। এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায় দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার হাল কেমন।

বিনোদনপ্রিয় আরমান উর রাসুল অভিনেতা মোশাররফ করিমের ভক্ত। তার প্রত্যেকটি নাটকই দেখেছেন বলে জানান। তবে ২০১৬ সালে বাংলা কোন চলচ্চিত্র তার দেখা হয়নি। আয়নাবাজি দেখার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সময়ের অভাবে দেখতে পারেননি। তিনি বলেন, আমাদের চলচ্চিত্রের মান আগের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু এখনও নকল রয়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে হিন্দি সিনেমা দেখি। চলচ্চিত্রের মান যদি উন্নত হয় তাহলে আবারো হয়ত হলে গিয়ে ছবি দেখব।   

আরডি/ এসএমএইচ/ ৪ জানুয়ারি ২০১৭

Share.

Comments are closed.