বিপদসীমার ওপরে সুরমা ও কুশিয়ারার পানি

0

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কয়েকদিনের উন্নতির পর গতকাল রবিবার থেকে ফের অবনতি হচ্ছে সিলেট ও মৌলভীবাজারের বন্যা পরিস্থিতি। আগের তিন দিন নদনদীর পানি কমলেও রবিবার থেকে ফের সুরমা ও কুশিয়ারার পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। এতে করে সিলেট ও মৌলভীবাজারের পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে পড়েছে। বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র মতে, কয়েকদিন নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও শনিবার থেকে নতুন করে সুরমা-কুশিয়ারার পানি বেড়ে গেছে। রবিবার সবকটি পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

পাউবো নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্যমতে, রবিবার কানাইঘাটে সুরমার পানি বিপদসীমার ৬৩ সেন্টিমিটার, শেওলায় কুশিয়ারা বিপদসীমার ৯৩ সেন্টিমিটার, আমলসীদের কুশিয়ারা বিপদসীমার ১৩৩ সেন্টিমিটার এবং শেরপুরে কুশিয়ারা বিপদসীমার ১৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারতের মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরাসহ কয়েকটি রাজ্যে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারায় পানি বেড়েছে বলেই মনে করছেন আবহাওয়াবিদ ও পাউবো কর্মকর্তারা।

পাউবো’র সিলেট কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, সিলেটে বৃষ্টি না হলেও উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী এ বন্যায় প্রায় দেড় মাস ধরে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে সিলেট ও মৌলভীবাজারের অন্তত ৯ টি উপজেলার ৫ লক্ষাধিক মানুষ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় যে, সিলেট ও মৌলভীবাজারের ১০ উপজেলায় বহু মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যার কারণে সিলেটে ১৭৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মৌলভীবাজারে ১৮৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে জানা গেছে।

দুই জেলার হাজার হাজার বাড়িঘর, দোকানপাট, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ডুবে গেছে। তলিয়ে গেছে বহু ফসলি জমি। বাড়িঘর ছেড়ে অনেকে এখন আশ্রয়কেন্দ্রে। বন্যাদুর্গত এলাকায় সরকারি ত্রাণ ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে।

কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো নিম্নাঞ্চলে পানি রয়েছে। একই অবস্থা সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চলগুলোতেও। তবে জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জ-এই ছয় উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

বালাগঞ্জ উপজেলায় গতকালও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া গত কয়েক দিনের বন্যায় উপজেলা পরিষদ, হাসপাতাল ও বাজার জলমগ্ন হয়ে আছে। বন্যার কারণে যাতায়াতের অসুবিধার জন্য অনেক রোগী হাসপাতালে আসতে পারছে না।

ওসমানীনগর উপজেলায় কুশিয়ারা নদীর পানি না বাড়লেও হাওরের পানি বাড়ায় কিছু কিছু এলাকা নতুন করে বন্যাকবলিত হচ্ছে। গোলাপগঞ্জ উপজেলায় পরিস্থিতি কিছুটা অবনতি ঘটেছে গতকালের বৃষ্টিতে। এদিকে বিয়ানীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে প্রধান ও আঞ্চলিক সড়ক বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করতে হচ্ছে। উপজেলার প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে।

মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া ও রাজনগর উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে মাছের ক্ষতি এবং বোরো ফসল হারিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে বন্যাদুর্গতরা। ২০০৪ সালের পর এবারই বন্যা এত বেশি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, দোকানপাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠে পড়ায় মানবেতর জীবন যাপন করছে বহু মানুষ। সদর উপজেলার নাজিরাবাদ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম এবং কাগাবলা ইউনিয়নের কিছু অংশের বাড়িঘর ও ফসলিজমি হাইল হাওরের পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে হাওর এলাকায় আবার পানি বেড়ে জেলার বিভিন্ন এলাকা তৃতীয় দফায় বন্যার কবলে পড়েছে। জুড়ী, বড়লেখা, কুলাউড়া, রাজনগর ও সদর উপজেলার প্রায় ৩০টি ইউনিয়নের তিন লক্ষাধিক মানুষ দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। এর আগে জেলার হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওর এলাকায় দুই দফা বন্যা হয়েছে। পানি ঢুকে যাওয়ায় ঘরবাড়ি ছেড়ে জেলার চারটি উপজেলার ২৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে কয়েক হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

কুলাউড়া-জুড়ী সড়কের কয়েকটি স্থান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বড়লেখার সঙ্গে জেলা সদরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। জুড়ী উপজেলা শহরের বেশির ভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলা পরিষদে আসা-যাওয়ার একমাত্র বাহন এখন নৌকা।

সাব্বির// এসএমএইচ //  জুলাই ২০১৭

Share.

Comments are closed.