বন্ধু মানে খোলা আকাশ, বন্ধু মানে মুক্তি

0

লাইফস্টাইল ডেস্ক :

ছোটবেলা থেকেই আমরা দুই বন্ধু ও ভাল্লুকের গল্পটা জানি। যেখানে এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে রেখেই নিজে বাঁচার তাগিদে গাছে উঠে পড়ে। যদিও অন্য বন্ধু তাৎক্ষণিক বুদ্ধির জোরে বেঁচে যায়। কিন্তু এই গল্পটার মোরাল হলো, বিপদের সময় যে বন্ধু তোমাকে ত্যাগ করে সে প্রকৃত বন্ধু নয়। তার সঙ্গ পরিত্যাগ করাই উত্তম। এ ধরনের বিপদের সময় গাছে উঠে যাওয়া বন্ধু বা গাছে তুলে মই টান দেওয়া বন্ধু আমাদের সমাজে ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

কথায় কথায় আমরা বলি, সৎসঙ্গে স্বর্গ বাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। বন্ধু শব্দটি খুব ছোট, কিন্তু এর অর্থেও ব্যাপকতা সীমাহীন। কোনো সুনির্দিষ্ট গণ্ডিতে বন্ধুত্বের সম্পর্ককে আবদ্ধ করে রাখা যায় না। সে চেষ্টা করা কেবল অর্থহীন শক্তির অপচয় মাত্র। বন্ধু মানে একে-অপরের সুহৃদ। দুটি মানুষের চিন্তা ও চেতনা যখন একই সমান্তরালে সামনের দিকে এগিয়ে যায়, তখন এবং সেখানেই তৈরি হয় বন্ধুত্ব।

আগস্ট মাসের প্রথম রোববার, আজ বন্ধু দিবস। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই পালন করে থাকে দিবসটি। এই দিনে বন্ধুরা একে-অপরকে উপহার দেয়, সবাই মিলে পার করে কিছুটা বাড়তি সময়। কবে কোথায় প্রথম এর সূচনা হয়েছিল তা নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে। তবে বেশ কিছু ইতিহাস থেকে ধারণা করা হয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর ত্রিশ থেকে চল্লিশ দশকের মধ্যবর্তী সময়ে বন্ধু দিবস পালন করার বিষয়টির যাত্রা শুরু। প্রথম দিকে কিছু কার্ড তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধু দিবসের পালন শুরু করে। বন্ধুরা একে-অপরকে কার্ড ও অন্যান্য গিফট উপহার দিয়ে এদিনটি পালন করত।

ধারণা করা হয়, ১৯৩৫ সালের দিকে আমেরিকাতে প্রথম বন্ধু দিবস পালন শুরু হয়। পরে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তা ছড়িয়ে যায়। আবার একই সঙ্গে প্যারাগুয়ের নামও শোনা যায়। ১৯৫৮ সালে সর্বপ্রথম ৩০ জুলাই বন্ধু দিবস পালনের প্রস্তাব করা হয়। তবে ২৭ এপ্রিল ২০১১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ৩০ জুলাইকে অফিসিয়ালি আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস ঘোষণা করে। বাংলাদেশসহ এশিয়ার অনেক দেশই আগস্ট মাসের প্রথম রোববারকে বন্ধু দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।

আত্মার সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে হয় আত্মীয়। বন্ধুর অবস্থান তো আত্মা, অস্থি-মজ্জায় মিশে একাকার হয়ে থাকা। তবে কিনা আজকাল বন্ধুর অভাব নেই। ফেসবুক, গুগুল প্লাস, স্কাইপে এ রকম অনেক ভার্চুয়াল বন্ধুত্বের কি আর অভাব আছে। এসব বন্ধুর কোনটা যে আসল আর কোনটা নকল তাও কি ধরার ক্ষমতা আছে। শুধু প্রোফাইলে ভারী ভারী সব পদবি দিলেই তা আসল ভেবে বন্ধু বানিয়ে নেই। যাচাই করার এত সময়ও নেই সুযোগও নেই। তাই বন্ধুর বেশে প্রতারণার হারও ক্রমেই বাড়ছে। বন্ধুর ওপর বিশ্বাসে চিড় ধরছে। এত এত বন্ধুর ভিড়ে আসল বন্ধুটিকে চিনে নেওয়ার কাজটি একটু কঠিনই বটে।

বন্ধু দিবস শুধু একটি দিন বন্ধুকে পেট পুরে খাইয়ে বা দামি উপহার দিয়ে এক দিনেই শেষ হওয়ার মতো কোনো সম্পর্ক নয়, বরং বছরের প্রতিটি দিন একে অপরের পাশে থাকার নামই বন্ধুত্ব। বস্তুত এখানেই প্রশ্নটি ঘুরেফিরে আসছে। কে বন্ধু হতে পারে? এরা কি পরিবারের বাইরের হতে হবে? আসলে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে কেউ বন্ধু হতে পারে না। তা সে ঘরের হোক কিংবা বাইরের। শ্রেণি বৈপরীত্বে যেমন প্রেম হয় না, একইভাবে বিপরীত চেতনার মাঝে বন্ধুত্ব সম্ভব নয়। বন্ধুত্ব হতে হলে দুজনকে অবশ্যই এক চেতনাসম্পন্ন মানুষ হতে হবে।

ক্ষয়ে যাওয়া সমাজের চারপাশে আজ অশান্তির ঐক্য। অশান্তি সৃষ্টিকারী মানুষের চিন্তার ঐক্যের কারণে চারদিকে আজ হানাহানি, অবিশ্বাস, প্রতিশোধের নেশা, একে-অপরকে আক্রমণ করার মনোভাব বিরাজ করছে। শান্তির জন্য নয়, ব্যক্তি সুখের জন্য সবাই কেমন মরিয়া হয়ে ছুটছেন। প্রত্যেকেই সুখের খোঁজ পেতে পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত চষে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু তা পাচ্ছেন না? পাওয়াটাও সম্ভব নয়। সংকীর্ণতায় আবদ্ধ হয়ে সুখ খোঁজার বৃথা এই চেষ্টা। তবুও ছুটছে মানুষ। অশান্তি সৃষ্টিকারীদের সমন্বিত চিন্তা-চেতনার কাছে বিপরীত চেতনার পরাজয় আজ পৃথিবীতে অশান্তির বন্যা নামিয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমরা বলতেই পারি, শান্তি এবং অশান্তি—তা সে যে গোত্রেই হোক না কেন, বন্ধুত্বের পূর্বশর্তই হচ্ছে চেতনার ঐক্য।

Share.

Comments are closed.