এক অস্থির অবস্থা চলছে চালের বাজারে

0

নিজস্ব প্রতিবেদক:

এক অস্থির অবস্থা চলছে চালের বাজারে। কম-বেশি প্রায় প্রতিদিন বাড়ছে চালের দাম। আজ যে দামে চাল কেনা হলো, কাল সেই দামে তা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। কিছু না না বাড়ছেই।

এভাবে ক্রমাগত দাম বাড়ার সঠিক কারণ কেউ বলছেন না। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন পাইকাররা এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন, পাইকাররা বলছেন মিল মালিক ও মোকামের কথা। তবে ভারতের চাল রপ্তানি না করার খবর দাম বাড়ার একটি কারণ বলে জানান ব্যবসায়ীরা, যদিও সরকার বলছে সেটি গুজব। দাম বাড়ার পেছনে সরকার অসাধু ব্যবসায়ীদের হাত দেখছে।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, বড় ব্যবসায়ীরা বস্তায় ৫০০-৬০০ টাকা বাড়ানোর সাহস দেখাবে না। তাদের দৌড় বড়জোর ৫০-৬০ টাকা।

সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, তারা চালের মূল্য ‘কারসাজির’ হোতাদের বের করার চেষ্টা করছে। কেউ চাল মজুত করে মূলবৃদ্ধির চেষ্টা করছে ধরতে পারলে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু সেই হোতারা এখনো চিহ্নিত হয়নি।

ঈদের ছু‌টি ঘিরে প্রথমে চা‌লের দাম বাড়া‌র প্রবণতা শুরু হয়েছিল। পরে ভারতের চাল রপ্তানি না করার খবরে আরেক দফা দামের উল্লম্ফন ঘটে। এখনো মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা চলছে।

এরই ম‌ধ্যে খুচরা বাজা‌রে চা‌লের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। মিনিকেট ৬০, নাজিরশাইল ৬৫-৬৬, স্বর্ণা ৫২-৫৩, আটাশ ৫৪ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।

চাল আমদানিতে শুল্ক কামানোর পরও চালের দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের একজন পাইকারি ব্যবসায়ী বলেন, ‘দাম বাড়ছে কেন আমরা বলতে পারমু না। উত্তরাঞ্চলের মেইন ব্যবসায়ীরা, যাদের কাছ থেকে আমরা চাল কিনি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে, তারা বলতে পারবে। আমরা যেহেতেু ওখানে যাই না, তাই সঠিকভাবে কিছু বলতে পারছি না।’

ওই ব্যবসায়ী আরো বলেন, ‘তয় ঈদের আগ থেকে শুনছি ভারত চাল রপ্তানি বন্ধ করবে, এইটা বড় বড় মিল মালিকরা খবর পেয়ে গেছে। ঈদের পরে ইন্ডিয়া তিন মাসের জন্য চাল দেওয়া বন্ধ করে দিল, এতেই দাম দাঁড় (চড়া) কইরা দিল।’

পাঁচ দিন আগের একটি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন এই ব্যবসায়ী, ‘নওগাঁয় ফোন দিছিলাম। তখন মিনিকেট ওখানেই ২৯০০ টাকা (৫০ কেজি)। ২৯০০ টাকা যদি বস্তায় হয়, সেই সঙ্গে বস্তা কেনা ৫৫, আড়ত খরচ ১৫, এরপর যাতায়ত খরচ ও অন্য খরচ তো আছেই। তিন হাজারের ওপর খরচ পড়ছে। এরপর এই রেট থেকে খুচরা বিক্রি কেজিতে অন্তত তিন টাকা বেশি। তাহলে খুচরা দাম কোথায় গিয়ে  দাঁড়ায় দেখেন।’

বাজার ঘুরে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে দেখা গেছে, কাটারিভোগ ও পোলাওর চালের দাম বাড়েনি। বেশি বাড়ছে বাসমতি, মিনিকেট, স্বর্ণা, আটাশ ও নাজিরশাইল। বাজারে টাঙানো চার্টে যে মূল্য উল্লেখ করা আছে, তা পেরিয়ে গেছে বহু আগেই।

চালের মূল্যবৃদ্ধির উৎস বের করে এর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে জানান কারওয়ান বাজার আড়ত বাদশা রাইচ এজেন্সির কর্ণধার। তিনি বলেন, ‘বড় বড় ব্যবসায়ীরা এতটা সাহস করবে না যে বস্তায় ৫০০-৬০০ টাকা বাড়িয়ে দেবে। তারা বড়জোর ৫০-৭০ টাকার মতো বাড়ায়। কিন্তু সকালে এক রেট, বিকেলে আরেক রেট, রাতে আরেক রেট- প্রতিদিন তরতর করে দাম বাড়ছেই।’ চালের মোকামে রেট বেশি দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমরাও সে হিসেবেই বিক্রি করি। মোকামে দাম কমলে আমরাও কম দামে বিক্রি করতাম।’

এবার সিলেট হাওরাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে দুই দফা বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে সরকারের ধান-চাল মজুদ কমে যায়। তবে সরকার বলছে তাতে চালের দাম এত বেশি বাড়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। অসাধু চাল ব্যবসায়ীদের দায়ী করছে সরকার।

আসল উৎস না খুঁজে সব দোষ ব্যবসায়ীদের দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন আল্লার দান রাইস দোকানের মালিক সিদ্দিকুর রহমান। তার ভাষ্য, ‘আইজকা বস্তায় ২০০ টাকা বাড়তি। ঈদের পর থেকে কেজিতে এখন ১০-১২ টাকা বাড়তি। সরকার শুধু বলে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াচ্ছে। তাইলে কেন তাদের ধরছে না! তাদের ধরলেই সব বের হয়ে যায়।’

রাজধানীর কাঁঠালবাগান বাজার ঘুর দেখা যায়, খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে চার্ট থেকে ৩-৪ টাকা বেশি। খুচরা বিক্রেতা সেলিম হোসেন বলেন, ‘এখন যে দামে পাবেন কালকে এ দামে পাবেন না। আমাদের কিছু করার নাই। আমরা যে রেটে আনছি তার চেয়ে ২-৩ টাকা বেশি নিচ্ছি।’

চালের বাজারের এই অস্থিরতা প্রভাব ফেলছে ক্রেতাদের ওপর। কাঁঠালবাগানের বাসিন্দা ও চালের ক্রেতা হাফিজুর রহমান বাসার জন্য চাল কিনতে এসেই মেজাজ হারিয়ে ফেললেন। তিনি বলেন, ‘বারবার চালের দাম বাড়লে কেমনে চলবে, তাও আবার ক্রেতাদের ক্রয়সীমার উপরের মূল্যে ধরা হয়। দিন দিন চাল কেনাটাই প্রায় অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।

হাফিজুর রহমান এ ধরনের চাল দেখিয়ে বলেন, এই চাল দুদিন আগে ছিল ২৫০০ টাকা, আজ বলছে ২৬৫০ টাকা। দেশে বসবাস করাটাই কঠিন হয়ে পড়বে।’

এই ক্ষুব্ধ ক্রেতার মতো বেশির ভাগ দোকানেই ক্রেতারা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ তো হচ্ছেই না, চরম বিরক্তি নিয়ে চাল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতারা।

এসএমএইচ//  শুক্রবার ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ৩১ ভাদ্র ১৪২৪

Share.

Comments are closed.