ইচ্ছে ছিল গায়িকা হওয়ার, হয়ে গেলাম ফটোগ্রাফার………

0

বিডিজার্নাল প্রতিবেদক :

তরুণ প্রজন্মের কাছে ফটোগ্রাফি এখন তুমুল জনপ্রিয়। স্মার্টফোনের বদৌলতে প্রায় সবাই ফটোগ্রাফার বনে গলেও ডিএসএলআর ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার অনুভূতি যেন অন্যরকম। আর এ ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে দিতে হয় মুন্সিয়ানার পরিচয়।তাই অনেকেই এখন নামীদামী ফটোগ্রাফারদের ক্লাসে গিয়ে শিখছেন ডিএসএলআর দিয়ে ছবি তোলার কায়দা-কানুন। এছাড়া শখের বশে কিংবা পেশা হিসেবেও ফটোগ্রাফিকে বেছে নিচ্ছেন অনেকে। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মেয়েদের এ জগতে প্রবেশ খুবই কম।পারিবারিক-সামাজিক নানা বাধ্যবাধকতার কারণে ফটোগ্রাফিতে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে মেয়েরা। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম তরুণ ফটোগ্রাফার রথী মোস্তফা।ছোটবেলার ভালোলাগার সেই ছবি তোলাকে এখন বেছে নিয়েছেন পেশা হিসেবে।ইতিমধ্যেই কাজ করেছেন দেশের অনেক নামী-দামী তারকা চলচ্চিত্র অভিনেতা-অভিনেত্রী ও মডেলদের সাথে।ঢাকার বেইলি রোডের একটি রেস্টুরেন্টে বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকমের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় উঠে আসে রথীর ফটোগ্রাফার হয়ে ওঠার গল্প, বর্তমান জীবন ও ভবিষ্যত ভাবনার নানা বিষয়।রথী মোস্তফার সাক্ষাতকার নিয়েছেন বিডিজার্নালের বার্তা প্রধান শেখ মেহেদী হাসান ও প্রধান প্রতিবেদক রুবেল দাশ

বিডিজার্নাল : ফটোগ্রাফার হওয়ার নেশা কিভাবে মাথায় চাপল?

রথী মোস্তফা : আসলে ছোটবেলা থেকেই আমার ছবি তুলতে খুব ভালো লাগত। তখনতো রিলের ক্যামেরা ছিল। আমার বাবার এক বন্ধু বিদেশে থাকতেন। তিনি দেশে আসার সময় রিলসহ ক্যামেরা নিয়ে আসতেন। তখন ক্যামেরা হাতে পেলেই আমি নিজেরসহ সবার ছবি তোলা শুরু করতাম। আর আমি তখন মনে করতাম ক্যামেরার ফ্ল্যাশ যে জায়গায় পড়ে সে জায়গার ছবি মনে হয় ভালো আসে। তাই ছবি তোলার সময় আমি একেবারে মাঝে গিয়ে দাঁড়িয়ে যেতাম! এছাড়াও পরিবারের সদস্যদের প্রচুর ছবি তুলতাম আমি। পরে আঙ্কেল যখন রিলগুলো ওয়াশ করত তখন দেখা যেত আমার তোলা ছবিগুলোই সবচেয়ে ভালো এসেছে। এজ্ন্য আঙ্কেল আমার প্রশংসাও করত। মা-বাবাকে বলত রথী বড় হয়ে বড় ফটোগ্রাফার হবে।মূলত ছোটবেলা থেকেই ছবি তোলার প্রতি একটা ভালোলাগা কাজ করত।

বিডিজার্নাল : তাহলে প্রথম থেকেই ফটোগ্রাফার হতে চেয়েছিলেন?

রথী মোস্তফা : আসলে আমি গায়িকা হতে চেয়েছিলাম। মাধ্যমিক পরীক্ষার আগ পর্যন্ত গান শিখেছিও। কিন্তু পরীক্ষার জন্য সেই যে গানে বিরতি পড়ল আর গানের দিকে যেতে পারিনি। পরে নানা সমস্যার কারণে গান গাওয়া ছেড়ে দিই।

বিডিজার্নাল : গান যেহেতু একসময় করতেন নিশ্চয়ই পছন্দের শিল্পী আছে?

রথী মোস্তফা : হুম। সব সময়ের পছন্দের শিল্পী হল রুনা লায়লা, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোসলে। তাদের গানগুলো শুনলে মনে হয় এগুলো কখনো পুরোনো হবে না।

বিডিজার্নাল : তো গান থেকে ফটোগ্রাফির জগতে কিভাবে পদার্পণ?

রথী মোস্তফা : ২০১৪ সালের ঘটনা।একদিন আমার ছোট বোন এসে আমাকে বলে, ‘আপু, চঞ্চল মাহমুদ ফটোগ্রাফি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের খবর পেয়েছি। চলো খোঁজ নিয়ে দেখি’।তো পরদিন আমি আর আমার বোন গেলাম সেখানে। তবে আমার জন্য না, গিয়েছিলাম বোনের ভর্তির জন্য। কিন্তু সেখানকার সময়ের সাথে বোনের সময় মিলছিল না। পরে আমিই ভর্তি হয়ে গেলাম। এরপর দুই-তিনটা ক্লাস করার পরে ভালো লাগতে শুরু করল। মনে হল যেন নতুন করে ফটোগ্রাফির প্রেমে পড়ে গেছি।

বিডিজার্নাল : তখন কি ক্যামেরা ছিল আপনার কাছে?

রথী মোস্তফা : হুম। আমার কাছে একটি নাইকন ক্যামেরা ছিল। পরে অবশ্য আমার মা আমাকে ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা দিয়ে ক্যাননের একটি ক্যামেরা কিনে দেয়। মূলত আমার ফটোগ্রাফার হওয়ার পেছনে আমার মায়ের অবদানই বেশি। তার কাছ থেকে যখনই যা চেয়েছি তখনই তা পেয়েছি। এমনকি আমার ৫ লাখ টাকা দামের ক্যামেরাটি ছিনতাই হয়ে যাওয়ার পর মা আমাকে আবারো তিন লাখ টাকা দিয়ে আরেকটি ক্যামেরা কিনে দেয়।

বিডিজার্নাল : ক্যামেরা কিভাবে ছিনতাই হল?

রথী মোস্তফা : একবার একটি অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে গুলশান লিংক রোড থেকে ক্যামেরাটি ছিনতাই হয়। সেদিন রাতে আমি যে পরিমাণ কেঁদেছি, পুরো জীবনে মনে হয় এত কাঁদিনি। আসলে আমাদের ফটোগ্রাফারদের সবচেয়ে বড় ভয় ছিনতাইকারী। কারণ বেশির ভাগ সময় অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়ি ফিরতে আমাদের রাত হয়ে যায়। তখন ক্যামেরা ছিনতাইয়ের ভয় থাকে।

বিডিজার্নাল : এ ব্যাপারে প্রশাসনের সহায়তা নিতে পারেন।

রথী মোস্তফা : পুলিশকে বললে পুলিশ আরো উল্টো হয়রানি শুরু করে। অনেকবার বলেও কোন কাজ হয়নি।

বিডিজার্নাল : আচ্ছা, আপনি এখন কোন ধরণের ফটোগ্রাফি করছেন?

রথী মোস্তফা : বর্তমানে ওয়েডিং (বিয়ে) ফটোগ্রাফিই বেশি করছি। এছাড়া মাঝে মাঝে মডেলদের ফটোশ্যুটও করছি। ওয়েডিং ফটোগ্রাফি করার কারণ হচ্ছে, চঞ্চল ভাইয়ের কাছ থেকে প্রাথমিক তালিম নিয়ে আমি পরে ভর্তি হই অপূর্ব আব্দুল লতিফের ওয়েডিং স্টোরিতে। সেখানে অপূর্ব ভাইয়ের কাছে ইন্টার্নশিপ করি ওয়েডিং ফটোগ্রাফির উপর।

বিডিজার্নাল : এছাড়া আর অন্য কোথাও কাজ করেছেন?

রথী মোস্তফা : হ্যাঁ। অনেকগুলো সংবাদ মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করেছি। প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, আমাদের সময় ইত্যাদি পত্রিকায় দীর্ঘদিন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করা হয়েছে।এসব পত্রিকায় কাজ করার সুবাদে শাবনূর, মৌসুমী, অপূর্ব, সজলসহ আরো অনেক তারকা অভিনেতা-অভিনেত্রীর ছবি তোলার সৌভাগ্য হয়েছে।

বিডিজার্নাল : ফটোগ্রাফি করতে গিয়ে মেয়ে হিসেবে কি কখনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন ?

রথী মোস্তফা : তেমনটা আসলে কখনো হয়নি। কারণ আমি আমার পরিবার থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছি। তবে যতই বলি না কেন, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরণের পেশায় সচরাচর মেয়েরা আসতে চায় না। যেমন আমার খুব ইচ্ছা্ দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে প্রকৃতি, ফুল, পাখি ইত্যাদির ছবি তোলা। কিন্তু নানা বাধ্যবাধকতার কারণে তা হয়ে ওঠে না। তবে আমি আশাবাদী পরিস্থিতি অবশ্যই বদলাবে।

বিডিজার্নাল : ফটোগ্রাফির প্রথম উপার্জনটা কেমন ছিল?

রথী মোস্তফা : টাকার অংকটা ভালোই ছিল। ২০১৪ সালের নভেম্বরে একটি বিয়েতে কাজ করে ২০ হাজার টাকা পেয়েছিলাম। তবে দুঃখের বিষয় হল আমার উপার্জনের ৮৫ শতাংশ টাকাই বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে খাওয়ার পেছনে ব্যয় হয়ে যায়!

বিডিজার্নাল : তাহলে তো ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে নেয়া যায়।

রথী মোস্তফা :  অবশ্যই নেয়া যায়। তবে আমি টাকার জন্য ফটোগ্রাফিতে আসিনি। শখের বশেই করছি।

বিডিজার্নাল : নতুন যারা ফটোগ্রাফিতে আসতে চায় তাদের কি পরামর্শ দেবেন?

রথী মোস্তফা :  তাদের উদ্দেশ্যে বলব, ক্যামেরা যেমনই হোক নিজের চোখকে ঠিক রাখতে হবে। নিজের চোখই আসলে একটি ক্যামেরা। সব সময় সঠিক অ্যাঙ্গেলে ছবি তুলতে হবে। সিনিয়রদের অবশ্যই সম্মান করতে হবে এবং তাদের দিক-নিদের্শনা মেনে চলতে হবে। আর অবশ্যই ভালো কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ফটোগ্রাফি শিখে আসতে হবে।আর শিক্ষাগত যোগ্যতাটাও থাকা জরুরি।

বিডিজার্নাল : বর্তমানে কি একাই কাজ করছেন নাকি কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে আছেন?

রথী মোস্তফা :  বর্তমানে একাই কাজ করছি। ফেসবুকে আমার একটি পেজ আছেhttps://www.facebook.com/Roothis-photography-308079069361505/?fref=nf&pnref=story এ নামে। পেজটিতে আমার যাবতীয় তথ্য ও কাজের ছবিগুলো দেয়া আছে। যেকোন অনুষ্ঠানের জন্য এখানে নক করলেই পাওয়া যাবে আমাকে।

বিডিজার্নাল : ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছু বলুন।

রথী মোস্তফা : মা-বাবা, দুই বোন আর এক ভাই নিয়ে আমার পরিবার। আমার বাবা মোস্তফা শিকদার ব্যবসায়ী। মা নাসিমা আক্তার ঝর্না গৃহিনী।স্কুল জীবন কেটেছে খুলনা ও বরিশালে। উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হই ঢাকার মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়া কলেজে। সেখানেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে মাস্টার্স করছি।

বিডিজার্নাল : ফটোগ্রাফি নিয়ে কোন সুপ্ত বাসনা আছে?

রথী মোস্তফা : হ্যাঁ, আমার খুব ইচ্ছে প্যারিসে গিয়ে ফটোশ্যুট করব। পৃথিবীর অন্য দেশে যাই বা না যাই প্যারিসে আমি যাবই।

এসএমএইচ// শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭। ৭ আশ্বিন ১৪২৩

Share.

Comments are closed.