জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস আজ 

0
আরিফুল ইসলাম আরিফ, জাবি প্রতিনিধি:
দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। সবুজ অরণ্যে ভরা এ ক্যাম্পাসটি ২০০১ সাল থেকে এ দিনটিকে ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও নানা বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটিকে পালন করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
 
দেশ স্বাধীন হওয়ার সাথে সাথে শুরু হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম।  অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের সমান বয়স এ বিশ্ববিদ্যালয়টির।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষিত হওয়ার পরে অখণ্ড ভারতের প্রধান প্রশাসক লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে আসেন। এ সময় নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহসহ আরও অনেকে পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য একটা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের দাবি জানান। ইংরেজ সরকার উপর্যুপরি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। তখন পূর্ব বাংলার নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান।
 
১৯২১ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী, কৃষি, প্রকৌশল ও চট্টগ্রাম বিশ্বিবিদ্যালয় স্থাপিত হলেও পূর্ব পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। 
তাই পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকার কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে গাজীপুর জেলার সালনায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন স্থান নির্বাচন করা হয় ঢাকা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে সাভার এলাকায়। সাভারের ওপর দিয়ে গেছে এশিয়ান হাইওয়ে।
 
এ মহাসড়কের পশ্চিম পাশে নির্ধারণ করা হয় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার স্থান। এর পাশে রয়েছে ডেইরি ফার্ম, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সাভার সেনানিবাস ও জাতীয় স্মৃতিসৌধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প প্রধান হিসেবে ড. সুরত আলী খানকে নিয়োগ করা হয়।
১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান সরকার এক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে এ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রাখে ‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’। এ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন বিশিষ্ট রসায়নবিদ অধ্যাপক ড. মফিজউদ্দিন আহমদ।
 
১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম আহসান আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় উদ্বোধন করেন। তবে এর আগেই ৪ জানুয়ারি অর্থনীতি, ভূগোল, গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগে ক্লাস শুরু হয়। প্রথম ব্যাচে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১৫০।
 
স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট পাস করা হয়। এ অ্যাক্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রাখা হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়’।
 
ইতিহাসের এ পথপরিক্রমায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আজ দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চারটি বিভাগ ও ১৫০ ছাত্রছাত্রী নিয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল; প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছরে সেই বিশ্ববিদ্যালয় আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
 
৩৩টি বিভাগ ও তিনটি ইনস্টিটিউটে ১৫ হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রী এখন লেখাপড়া করছে। ছাত্র হল ও ছাত্রী হল ৮টি করে মোট ১৬টি। বর্তমানে শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ৭শ, অফিসার প্রায় সাড়ে ৩শ, তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী প্রায় ৮শ এবং চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৮শ। 
 
প্রতিষ্ঠার এ ৪৬ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রায় গৌরবোজ্জ্বল অনেক কীর্তি সাধিত হয়েছে। অনেকেই জানেন, এ কীর্তি সাধনের মধ্যে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের নামও যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ‘প্রথম নারী উপাচার্য’ হয়ে তিনি এ কীর্তি রচনা করেছেন, গড়েছেন ইতিহাস।
বিগত এক বছরে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন সম্মানিত শিক্ষক দেশে-বিদেশে শিক্ষা ও গবেষণায় সাফল্য অর্জন করে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও সম্মানজনক অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।
 
৪৬ বছরের পথ পরিক্রমায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তার অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে অগ্রসরমান। সেশনজটকবলিত বিভাগগুলো এখন সেশনজটমুক্ত হওয়ার পথে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য নতুন কয়েকটি আবাসিক হল নির্মাণসহ ভৌত অবকাঠামো, একাডেমিক ও প্রশাসনিক উন্নয়নের ধাপগুলো এগিয়ে চলেছে।
 
বর্তমানে ভিসি, প্রোভিসি, কোষাধ্যক্ষ ও অন্যান্য শীর্ষ পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সম্মিলিত প্রয়াসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার স্বাভাবিক ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলমান এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে, এটাই সবার প্রত্যাশা।
 
এদিকে ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ পালনের জন্য বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দিবসটি পালন উপলক্ষে সকাল সাড়ে ৯টায় বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ চত্বরে সমাবেশ, সকাল ১০টায় উদ্বোধন ও বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। 
 
এদিন সকাল ১১টায় সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে ছাত্রকল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিকাল ৩টায় পুতুল নাট্য, ৪টায় পিঠা মেলা এবং সন্ধ্যা ৫টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের উদ্যোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
 
এসব আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ, ইনস্টিটিউট, হল, বিভাগ, অফিসসহ প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অফিসার, কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করবেন।
Share.

Comments are closed.