পাঁচ বছরে বদলে যাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: উপাচার্য

0

আরিফুল ইসলাম আরিফ, জাবি প্রতিনিধি:

 ২০১৪ সালের ২ মার্চ উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনে প্রথম হয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম। এই বছরের (২০১৮ সাল) মার্চ মাসে চার বছরের মেয়াদকাল পূর্ণ করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত এই নারী উপাচার্য।
এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮ বছরের ইতিহাসে খুব কম সংখ্যক উপাচার্যই স্বাভাবিকভাবে মেয়াদকাল পূর্ণ করতে পেরেছেন। আর সাম্প্রতিক অতীতে তো প্রায় সবাই কোনো না কোনো আন্দোলনের মুখে পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। সেদিক থেকে অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের সময়ে তুলনামূলক স্থিতিশীল থেকেছে বিশ্ববিদ্যালয়। অস্থির সময়ে দায়িত্ব নিয়ে নিজের চিন্তা আর বাস্তবের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বেশ সফলভাবেই মেয়াদকাল শেষ করছেন উপাচার্য ফারজানা।

এই প্রতিবেদক এর সাথে একান্ত আলাপচারিতায় শোনালেন বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিচালনার সেই গল্প। সেই সঙ্গে জানান আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়কে বদলে ফেলার পরিকল্পনার কথাও ।

২০১৪ সালে যখন উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরজানা ইসলাম দায়িত্ব নেন তখন একরকম বিপর্যস্তই ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ তার আগের পাঁচ বছরের প্রায় পুরোটা সময়ই কেটেছে কোনো না কোনো আন্দোলনে। ফলে একাডেমিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল বারবার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবেও জাবির সুনামে ধাক্কা লেগেছিল। ওই সময়ে সবার মনেই একটা ধারণা জন্মেছিল, কেউ  জাহাঙ্গীরনগরে পড়লে সে আন্দোলনেই হারিয়ে যাবে।

এ ব্যাপারে উপাচার্য বলেন, আমি শিক্ষা ও মেধাচর্চার মাধ্যমে এই পরিবেশটা বদলাতে চেয়েছিলাম। আমার মনে হচ্ছে আমি তা অনেকটা করতে পেরেছি। আর আমি কতটুকু সফল তা সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

উপাচার্য বলেন, আমি সবসময় চেয়েছি শিক্ষার্থীরা যাতে তাদের শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে মেধার বিকাশ ঘটাতে পারে। এখন আমাদের শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে অনেক সফল হচ্ছে। শিক্ষক- শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বাইরে যাচ্ছে। এটাকে আমি সফলতাই বলব।

সম্প্রতি উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। সাবেক একজন উপাচার্যের নেতৃত্বে আওয়ামী পন্থী শিক্ষকদের একটি দল বর্তমান উপাচার্যের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ধারা ব্যহত করার অভিযোগ করছেন। তারা বলছেন, উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা না করে উল্টো তিনি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯৭৩-এর ১১(১) ও ১১(২) ধারার ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।

বিষয়টি নিয়ে ফারজানা ইসলাম বলেন, এখানে একাধিক পন্থা আছে। আমি চাইলে সময় শেষ হওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন দিতে পারি। আবার মহামান্য রাষ্ট্রপতি দ্বিতীয়বারের মতো সময় বর্ধিত করতে পারেন। আর আমি চলে গেলে চ্যান্সেলর যাকে উপযুক্ত মনে করবেন তাকেই মনোনীত করবেন, যাতে তিনি পরবর্তী নির্বাচন দিতে পারেন।

তিনি বলেন, এখন যারা অভিযোগ করছেন তারা অধিকাংশই সম্প্রতি রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু শিক্ষকদের মধ্যে যারা সিনেটর অনেকেই তাদের সঙ্গে একমত নন।

দীর্ঘ ১৯ বছর পর গত ৩০ ডিসেম্বর রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক ধারা আরও একধাপ এগিয়ে গেল। এতে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন বর্তমান উপাচার্য ও তার প্রশাসন। এই গণতান্ত্রিক ধারায় এখন শিক্ষার্থীরা চাচ্ছেন জাকসু নির্বাচন।

বিষয়টি নিয়ে অধ্যাপক ফারজানা ইসলামও আশাবাদী। রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট নির্বাচনে সফলতার পর জাকসু নির্বাচনের দিকে যাওয়ার সাহস ও উৎসাহ বেড়ে গেছে সবারই। একটা সময় ক্ষমতাসীন সরকারই এটা চায়নি। তবে এখন অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। সবাই গণতান্ত্রিকতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন সরকার, ছাত্র সংগঠন, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সবাই যদি এ গণতান্ত্রিক অধিকারটাকে নতুন করে সাপোর্ট দেয় তাহলে এটা সহজ হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের আগমন বেড়েছে। তাদের আগমনে যে কোলাহল সৃষ্টি হয় তাতে অতিথি পাখিরা সময়ের আগেই চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। এর জন্য ভেতরের হস্তক্ষেপকেই দায়ী করেনি উপাচার্য।

তিনি বলেন, শুক্র ও শনিবার বহিরাগত বেশি আসে। এখানে কয়েক রকমের বহিরাগত আছে। উইকেন্ড প্রোগ্রামে ছাত্ররা আসে, সাবেক ছাত্ররা আসে, বর্তমান ছাত্র ও শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আত্মীয় আসে। আরেক রকম বহিরাগত যারা কেবল বেড়াতেই আসে। এই বেড়াতে আসা কোনো সমস্যা না। কিন্তু এখানে প্রবেশের পর আমরা সবাই কিছু নিয়ম ভূলে যাই। সবাই গাড়ি নিয়ে ঘুরতে চাই, পাখির কাছে যেতে চাই এমনকি খাবার খেতেও গাড়ি নিয়ে যাই। এসব বিষয়ে নিজেদের সচেতন হতে হবে। তাদের মাথায় রাখতে হবে এটি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। আমরাই তো আমাদের সংস্কৃতির অপব্যবহার করছি।

তিনি আরও বলেন, এই লোকগুলোই যখন ক্যান্টমেন্টে যায় তখন তো তারা ঠিকই নিয়ম মেনে চলাফেরা করে। তাহলে আমাদের এখানে কেন করে না? এর জন্য অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপকেই দায়ী করেন উপাচার্য। অনেকেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পরিচয় দিয়ে অপরাধ ঘটিয়ে থাকে।এখানে আমরা আটকে গেছি। আমাদের শিক্ষক- শিক্ষার্থীদের সচেতন থাকতে হবে যেন নাম ভাঙিয়ে কেউ সুবিধা নিতে না পারে।

তাছাড়া গাড়িগুলোতে নকল স্টিকার লাগানো থাকে। যা অনেক সময় ধরা সম্ভব হয় না। আমাদের তো অনেক নিরাপত্তা কর্মী নেই যে তাদের দিয়ে এসব বন্ধ করা যাবে। পার্কিংয়ের টাকা নেওয়ায় সমালোচানা করা হয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত নিরাপত্তা কর্মীর বেতন দেওয়ার জন্যই তা নেওয়া হতো। তবে সুখবর হচ্ছে, এখন পার্কিয়ের জন্য স্থান বরাদ্দ করা হয়েছে।

এ সময় ভালোবাসা দিবস উপলক্ষ্যে কাপলদের জন্য রিকশায় ফ্রি রাইডের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘প্রশাসন তো অনুমতি দেয়নি। রেজিস্ট্রার যেখানে সরাসরি না করেছে সেখানে কিভাবে বাণিজ্যিক চিন্তুা থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি জায়গায় অপসংস্কৃতি ছড়াচ্ছে আয়োজকরা?

একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজ করা দরকার। এজন্য একটি মাস্টারপ্লান খুবই জরুরি। আমাদের মাস্টারপ্লানের কাজ শেষ হয়েছে। এখানে আবাসন সংকট রয়েছে। হলগুলোতে গাদাগাদি করে থাকার ফলে শিক্ষার্থীরা র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়। এজন্য আমরা ছেলেদের জন্য তিনটি ও মেয়েদের জন্য তিনটি হল করব। আরও জায়গা নিয়ে লাইব্রেরিকে ছয় তলা করা হবে। এক্সামিনেশন হল ও লেকচার থিয়েটার হল হবে।

মাস্টারপ্লান অনুযায়ী কাজ হলে পাঁচ বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের চেহারা বদলে যাবে। যখন প্রথম দায়িত্ব নেই তখন সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটা সমাবর্তন দিয়ে শুরু করেছিলাম। শেষ করছি রেজিস্ট্রাড গ্র্যাজুয়েট নির্বাচন এবং বড় বড় দুটি আন্তার্জাতিক সম্মেলন দিয়ে। পরিবেশ ভালো থাকায় এ দুটি সম্মেলনে প্রায় ২ শতাধিক বিদেশিরা এসেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একসঙ্গে এতো সংখ্যক বিদেশি কখনো আসেননি। এ দুটি সম্মেললে নিরাপত্তা বজায় রাখতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। আমাদের আত্মবিশ্বাসের কারণেই আমরা পেরেছি। গণতান্ত্রিকভাবে আমার যাত্রা শুরু হয়েছে নির্বাচনের মাধ্যমে তা বহালও থাকবে। আমার প্রথম প্রয়াস ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থিরতা আনা। সেটা আমি সম্ভবত পেরেছি।

Share.

Comments are closed.