চার বছরের মধ্যে জাকসু নির্বাচন ও সমাবর্তন করতে চাই: জাবি উপাচার্য

0

আরিফুল ইসলাম আরিফ:

উপাচার্য বিরোধী আন্দোলন, শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ, অবরোধ, ভর্তি পরিক্ষা চলাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের এক পক্ষের উপর অপর পক্ষের হামলা, অধিকাংশ বিভাগে ছয়মাস থেকে একবছরের সেজনজটসহ বেশকিছু বিষয়ে ২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ২০১৪ সালের প্রথম দুইমাস কার্যত অচল হয়ে পড়েছিলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

উপাচার্য বিরোধী আন্দোলন, অবরোধ, সেশনজটে যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পিষ্ট তখন ২০১৪ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম দায়িত্ব নেয়ার পরেই শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। এর পুরষ্কার হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতি কর্তৃক পুনরায় চার বছরের জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি। পুরোনো সেই স্মৃতি রোমন্থন আর আগামী চারবছরের পরিকল্পনা নিয়ে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিজার্নাল365 ডট  কমকে  একান্ত সাক্ষাতকার দিয়েছেন জাবি উপাচার্য। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম আরিফ।

বিডিজার্নাল365 ডট  কম : নতুুুন দায়িত্ব পেয়ে আপনার অনুভূতি কি?

অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম: আলহামদুলিল্লাহ, আমিতো কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। সরকার আমার উপর আস্থা রেখেছেন, আমি কি সেই আস্থার প্রতিদান দিতে পারবো? প্রথম প্রথম বিষয়টি নিয়ে একটু ঘাবরে গেলেও নিজেকে প্রস্তুত করেছি, তৈরি করেছি চ্যালেঞ্জ এর সম্মুখীন হওয়ার জন্য। সত্যি বলতে আমি শিক্ষা ও মেধা চর্চার মাধ্যমে এই পরিবেশটা বদলাতে চেয়েছিলাম। আমার মনে হচ্ছে আমি তা অনেকটা করতে পেরেছি। তাছাড়া আমার কতটুকু সফলতা তা সবচেয়ে ভালো বলতে পারবে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সরকার আমাকে ২য় বার নিয়োগ দেওয়ায় আমি কৃতজ্ঞ। ২য় মেয়াদে নিয়োগ পেয়ে অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করাই আমার মূল চ্যালেঞ্জ।

বিডিজার্নাল365 ডট  কম : একজন নারী হিসেবে আপনি দেশের প্রথম উপাচার্য। নারীর ক্ষমতায়নের পাথেয় হিসেবে এ বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?


জাবি উপাচার্য: 
দেখুন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দেশ। যেখানে নারী পুরুষের মধ্যকার কোন ভেদাভেদ চলে না। সবার সমান অংশগ্রহণের মাধ্যমে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই বর্তমান সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সবার সমান সুযোগ সুবিধা ভোগ করার অধিকার রয়েছে। সরকারিভাবে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যারা সেবা নিয়ে থাকেন তাদের অধিকাংশই নারী। তাই একজন নারী হিসেবে দেশের বিদ্যমান উন্নয়নে অংশগ্রহণ করতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছি। আমি মনে করি নারী পুরুষ সবার সমান অংশগ্রহণে দেশের উন্নয়ন সম্ভব। তাই নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছেন বলে মনে করি। দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে চাইলে নারীদেরও পুরুষদের মতো সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি করেছেন। নারীর ক্ষমতায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বিডিজার্নাল365 ডট  কম : গত চার বছরে আপনার সফলতা কতটুকু?

জাবি উপাচার্য: সবসময় চেয়েছি শিক্ষার্থীরা যাতে তাদের শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে মেধার বিকাশ ঘটাতে পারে। এখন আমাদের শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে অনেক সফল হচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বাইরে যাচ্ছে। এটাকে আমি সফলতাই বলব।

বিডিজার্নাল365 ডট  কম : বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে আগামী চার বছর আপনার পরিকল্পনা কি?


জাবি উপাচার্য:
 আসলেই গত চার বছরে চেষ্টা করেছি বিভাগ গুলোতে সেশনজট কমানোর। আর এর পুরষ্কার হিসেবেই রাষ্ট্রপতি ও আচার্য দ্বিতীয় মেয়াদে আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন। সত্যি বলতে কি, এটা আমার জন্য আনন্দের। তবে আনন্দের চেয়েও বেশি আমার অসম্পূর্ণ স্বপ্নসম্পূর্ণ করার চ্যালেঞ্জ। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে দেশের রোলমডেল হিসেবে গড়তে চাই আমি। এর জন্য কিছু কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। যা আগামী চার বছরে শেষ করার চেষ্টা করবো।

বিডিজার্নাল365 ডট  কম : বর্তমান শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট কমানোর জন্য কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিবেন কি?


জাবি উপাচার্য:
 শিক্ষার্থীদের হলগুলোতে আবাসন সংকট নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা চলছে। আমাদের সময়ে ছেলেদের জন্য একটি ও মেয়েদের জন্য দু’টি হল নির্মাণ করেছি। খুব শীঘ্রই আমরা ছেলেদের জন্য আরো তিনটি ও মেয়েদের জন্য তিনটি হলের কাজ শুরু করবো। আশা করছি খুব শীঘ্রই এই সংকট কাটিয়ে উঠবো আমরা।

বিডিজার্নাল365 ডট  কম : দীর্ঘ ১৯ বছর পর গ্র্যাজুয়েট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো আপনার আমলে। এটাকে কিভাবে দেখছেন?


জাবি উপাচার্য:
 দীর্ঘ ১৯ বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন কোনো ধরণের ঝামেলা ছাড়াই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি। এই বিশাল চ্যালেঞ্জ নিজের সদিচ্ছা আর পরিশ্রম দিয়েই সম্ভব করেছি। রেজিস্ট্রার্ড গ্রাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচনটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আমরা বদ্ধপরিকর ছিলাম। দুই দশক পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূয়সী প্রশংসা তো আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন।

বিডিজার্নাল365 ডট  কম : শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি জাকসু নির্বাচন। জাকসু নির্বাচন নিয়ে আপনার কোন পরিকল্পনা আছে কি?


জাবি উপাচার্য:
 শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি জাকসু নিয়েও আশার আলো দেখবে শিক্ষার্থীরা এই আশা রাখছি। জাকসু নির্বাচন নিয়েও সুখবর আছে। জাকসু নির্বাচন অনেক আগেই অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত ছিলো। আমি চাই জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব গড়ে উঠুক। জাকসু নির্বাচন নিয়ে আমার পরিকল্পনা আছে এবং জাকসু নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করবো আমি। এজন্য শিক্ষক শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা কর্মচারী সকলের সহযোগিতা চাই।

বিডিজার্নাল365 ডট  কম : বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের আসন সংকট এখনো কমেনি। গ্রন্থাগারের সার্বিক সমস্যা সমাধানে এবং সম্প্রসারিত অংশ নিয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন কি?


জাবি উপাচার্য: 
বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের জন্য ১২০০ কোটি টাকার বরাদ্দ রয়েছে। যার পরিকল্পনায় আওতায় রয়েছে গ্রন্থাগারের সার্বিক সমস্যা সমাধান প্রকল্প। বরাদ্দ পেলেই গ্রন্থাগারের সম্প্রসারণের বাকি কাজটিও হবে।

বিডিজার্নাল365 ডট  কম : ক্যাম্পাসে প্রায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। প্রায় দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিনতাই আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ বিষয়ে কোন জরুরি পদক্ষেপ নিবেন কি?


জাবি উপাচার্য: 
অবাধে বহিরাগতদের প্রবেশের কারণে ক্যাম্পাস কিছুটা অনিরাপদ হয়ে গেছে। ফলে এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনা ঘটে থাকে। যাইহোক বহিরাগতদের অবাধে চলাচল নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। এদিকে আমাদের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত ক্যাম্পাস টহল দিচ্ছে। আশাকরি এ সমস্যা দ্রুত সমাধান হবে।

বিডিজার্নাল365 ডট  কম : ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করায় শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি কিছু কিছু জায়গায় দোকান দিলে তাদের কষ্ট লাঘব হবে। এ বিষয়ে আপনি কোন পদক্ষেপ নিবেন কি? 


জাবি উপাচার্য:
 ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। আমিও শুনেছি ভাসমান দোকানগুলো না থাকায় শিক্ষার্থীদের অসুবিধা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এটা নিয়ে কথা বলেছেন। দেখি এই বিষয়ে আমরা আলোচনা করবো কিছু করা যায় কি না।

বিডিজার্নাল365 ডট  কম : দেশের সর্বোচ্চ শহীদ মিনার জাবিতে অবস্থিত কিন্তু শহীদ মিনারের যথাযথ মর্যাদা করা হচ্ছে না। এর মর্যাদা রক্ষায় প্রশাসনের কোন পদক্ষেপ রয়েছে কি?


জাবি উপাচার্য:
 শহীদ মিনার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের সবার। শুধু বহিরাগতরাই নয় আমাদের শিক্ষার্থীরাও শহীদ মিনারের মর্যাদা ক্ষুন্ন করছে। মিনার এলাকাতে সবার সাবধানতা অবলম্বন করে চলা উচিত। মিনার এলাকায় জনসাধারণের চলাফেরার সতর্কতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মিনারের এলাকায় নির্দেশনা দিয়েছে। এরপরেও আমরা শহীদ মিনারের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে অতিদ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নিবো। শহীদ মিনার এলাকা রক্ষণাবেক্ষণে সবার যৌথ উদ্যোগ কামনা করছি।

বিডিজার্নাল365 ডট  কম : আগামীতে পূর্বের মতো সমাবর্তন আয়োজন নিয়ে কোন পরিকল্পনা নিবেন কি?


জাবি উপাচার্য:
 আমি দায়িত্ব নেয়ার প্রথমদিকে সম্মিলিতভাবে একটি সমাবর্তনের (পঞ্চম সমাবর্তন) আয়োজন করেছিলাম। আবারও সমাবর্তন নিয়ে কাজ শুরু করতে চাই। এই বিষয়ে শীঘ্রই কাজ শুরু করবো।

বিডিজার্নাল365 ডট  কম : আগামী চার বছর বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের কাছ থেকে কি চাওয়া আপনার?


জাবি উপাচার্য: 
আগামী চার বছরের নতুন চ্যালেঞ্জগুলো শিক্ষক শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাথে নিয়ে মোকাবেলা করতে চাই। এজন্য সবার সহযোগিতার পাশাপাশি গণমাধ্যমের সহায়তা কামনা করছি।

বিডিজার্নাল365 ডট  কম : আপনার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা। ভাল থাকবেন।

জাবি উপাচার্য: আপনিও ভালো থাকবেন।

Share.

Comments are closed.