ঈদের স্বর্গীয় আনন্দ সবাইকে ছুঁয়ে যাক

0

মোমুছা খালেদ :

মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলো ঈদ। ঈদকে ঘিরে দেশে-বিদেশে সব মুসলিমের মধ্যেই ব্যাপক প্রস্তুতি পরিলক্ষিত হয়। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর প্রতীক্ষিত ঈদ বয়ে আনে সৌহার্দ্য ও উৎসবের বার্তা। দৃঢ় হয় বন্ধুত্বের বন্ধন। দেশে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু সবার উপস্থিতিতে ঈদের আনন্দ সহস্রগুণ বেড়ে যায়। বিদেশে ব্যস্ততা নিত্যসঙ্গী। এই ব্যস্ততার কারণে এমনকি ঈদের দিনে ঈদ পালন করা অনেক পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয় না। মা-বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদের দিন অতিবাহিত করতে না পারার বেদনা ও শূন্যতাবোধ সব প্রবাসীর মধ্যে বিরাজ করে। তবে এখন ফোন ও ভিডিও কলের যুগ। ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়ে এই প্রযুক্তি প্রবাসে বসবাসরত বাঙালিদের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছে। রয়েছে প্রবাসের মাটিতে প্রবাসীদের হাতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কমিউনিটি সেবামূলক সংগঠন। ব্যক্তিগতভাবে কিংবা সংগঠনের উদ্যোগে প্রতি বছর ঈদকে সামনে রেখে আয়োজিত হয় ঈদমেলা। আয়োজন হয় চাঁদরাত ও নাচগানভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার। এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার মধ্য দিয়ে প্রবাসীরা কিছু সময়ের জন্য হলেও ভুলে থাকার চেষ্টা করেন বাংলাদেশে সপরিবারে ঈদ উদ্‌যাপন করতে না পারার কষ্ট।
বাংলাদেশে ঈদের দিন সরকারি ছুটি থাকলেও প্রবাসী অনেককেই ঈদের দিন কর্মক্ষেত্রে যেতে হয়। নিজের কষ্টার্জিত টাকায় দেশে পরিবার ভালোভাবে ঈদ উদ্‌যাপন করতে পারছে, একজন প্রবাসীর সার্থকতা এখানেই। অবশ্য বর্তমানে আমেরিকায় অভিবাসন নিয়ে বহু বাঙালি আমেরিকার বিভিন্ন সিটিতে সপরিবারে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। নিউইয়র্কেও রয়েছে এমন বহু পরিবার। উৎসব অনুষ্ঠানে এসব পরিবারের উপস্থিতি এক ধরনের দেশীয় আবহ নিয়ে আসে।
নিউইয়র্ক নগরে বর্তমানে প্রচুর বাংলাদেশি বাস করছেন। শুধু নিউইয়র্ক কেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলেই বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিসর বাড়ছে। কমিউনিটির সদস্য সংখ্যা ও এর গুরুত্ব অনুধাবন করে দুই বছর আগে সিটি মেয়রের সিদ্ধান্তে ঈদে স্কুল ছুটি ঘোষণা করা হয়। এর পর কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নিউইয়র্কের প্রায় সব বাঙালিই কর্মক্ষেত্র থেকে ঈদের ছুটি পেয়ে আসছেন। স্কুলে ছুটি থাকার কারণে পুরো পরিবার একসঙ্গে ঈদ উদ্‌যাপন করত পারছে। আমেরিকার কোনো শহরেই এখন আর মসজিদ দুর্লভ নয়। ফলে ঈদের দিনটি স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয় ঈদের জামাত দিয়ে। আবার ঈদের দিনে পার্কিং রেগুলেশন রদ করার হয় বলে এ-দিন বাঙালিদের গাড়িতে করে ঘোরাঘুরি করতে তেমন ঝক্কি পোহাতে হয় না।
রয়েছে ব্যবসারও সুযোগ। প্রতি বছর ঈদ উপলক্ষে বাঙালি ব্যবসায়ীদের বিরাট আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা জ্যামাইকা, জ্যাকসন হাইটস, ব্রুকলিন, ব্রঙ্কস, অ্যাস্টোরিয়া এলাকায় পোশাক, খাবার ও ঘর সাজাবার দোকানগুলোতে প্রচুর বিকি-কিনি হয়। শুধু তা-ই নয় এসব এলাকায় মুক্ত মঞ্চে আয়োজিত হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাঙালি এলাকার দোকান ও বিউটিশপগুলোতে মেহেদি ও সাজসজ্জায় মেতে ওঠে বাঙালি মেয়েরা। প্রযুক্তির কল্যাণে আইপিটিভির মাধ্যমে দেশের লাইভ টিভি এখন ঘরে ঘরে। ফলে দেশীয় হালফ্যাশনের খবরাখবর পাওয়ার পাশাপাশি ঈদের অনুষ্ঠানমালা থেকেও এখন আর বঞ্চিত হতে হয় না প্রবাসীদের। রয়েছে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকাগুলোর ঈদ উপলক্ষে প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যা।
তবে সবকিছু হাতের নাগালে হলেও দেশ ও প্রবাসের ঈদ উদ্‌যাপনের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য এখনো বিদ্যমান। দেশের ঈদের মূল আনন্দই হলো আত্মীয় ও বন্ধুদের সমাগম ও পারস্পরিক আন্তরিকতা। আর ছোটদের সবচেয়ে বড় আনন্দ বড়দের কাছ থেকে পাওয়া ঈদ সেলামি। সেই ঈদ সেলামির প্রাপ্ত টাকা নিয়ে চলতো পছন্দের কেনাকাটার বিভিন্ন পরিকল্পনা। পরিবার-পরিজন নিয়ে ছেলেবেলার সেই ঈদগুলো ছিল মহানন্দের। প্রবাসে নানাবিধ দায়িত্ব ও অর্থ সংকটের কারণে ঈদ কিছুটা যান্ত্রিক হয়ে পড়ে।
প্রতি বছর ঈদের আবির্ভাবে শৈশবের ঈদের দিনগুলোর কাছে ফিরে যাই; ডুবে যাই ফেলে আসা স্মৃতিতে। সেই স্মৃতির পাতা থেকে মুখ তুলে শুধু এটুকুই বলতে চাই, প্রবাসে ও দেশে ঈদের স্বর্গীয় আনন্দ যেন সবাইকে ছুঁয়ে যায়। ঈদ মোবারক।

সাব্বির// এসএমএইচ//১৩ই জুন, ২০১৮ ইং ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Share.

Comments are closed.