পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজিতে চট্টগ্রামের সাগরিকা বিসিক অঞ্চল এখন অঘোষিত ট্রাক পার্কিং

0

সাব্বির আহমেদ,চট্টগ্রাম:

পুলিশ ও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজিতে চট্টগ্রামের সাগরিকায় অবস্থিত বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) অঞ্চল এখন অঘোষিত ট্রাক ও বাসের পার্কিংয়ে পরিণত হয়েছে। শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন ফ্যাক্টরির প্রবেশ মুখ, চলাচলের রাস্তা সব দখল করে নিয়েছে এসব ট্রাক ও বাস। এছাড়াও আছে ফুটপাতের উপর অবৈধ টং দোকান ও গ্যারেজ। ফলে নিরাপত্তা শঙ্কায় ভুগছে এ শিল্পাঞ্চলে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এছাড়া এ ধরণের হ-য-ব-র-ল অবস্থার কারণে বিদেশি বিনিয়োগও মুখ থুবড়ে পড়ছে।
সূত্র জানায়, ৩১ দশমিক ৫ এককের বৃহৎ জায়গা নিয়ে সাগরিকার বিসিক শিল্পাঞ্চল গঠিত। এ শিল্পাঞ্চলে রয়েছে প্রায় তিনশ’ কোম্পানির ফ্যাক্টরি। তবে যাতায়াত ব্যবস্থার অসুবিধা, সড়কে ট্রাক-বাসের অবৈধ পার্কিং ও বখাটেদের অত্যাচারে অনেক ফ্যাক্টরিই বন্ধ হয়ে গেছে। আরো অনেক ফ্যাক্টরি তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়ার পথে আছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাহাড়তলী থানা পুলিশ ও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোরশেদ আক্তার চৌধুরীর নাম ভাঙ্গিয়ে স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসী পার্কিয়ে থাকা ট্রাক ও বাসগুলো থেকে নিয়মিত চাঁদা নেয়। রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা টং দোকানগুলো থেকেও নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হয়। ফলে শিল্পাঞ্চলের ফ্যাক্টরি মালিকদের শত তৎপরতা সত্ত্বেও এগুলো উচ্ছেদ করা যায়নি। এছাড়া ওই অঞ্চলের সিটি করপোরেশন মোড়ে সিটি করপোরেশনের নষ্ট ট্রাক ও গাড়ি মেরামত করা হয় রাস্তার ওপরেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, অলংকার মোড় হতে শুরু করে জহুর আহমদ চৌধুরী আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে ট্রাকের দীর্ঘ সারি। কোথাও কোথাও ট্রাকগুলো তিন স্তর হয়ে চলাচলের পথই বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে যানজট লেগে যাচ্ছে রাস্তায়। এছাড়া বিটাক মোড় থেকে সাগরিকা গরুর বাজার পর্যন্ত রাস্তায়ও একই অবস্থা। বাস, লেগুনা, ট্রাক রাস্তার পাশে সারি করে রাখা হয়েছে। তার সাথে আবার আছে টং দোকান। এ দোকানগুলোতে নিয়মিত বখাটেদের আড্ডা বসে। ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে আসা নারী শ্রমিকরা প্রায়ই এসব বখাটেদের ইভ টিজিং ও যৌন হয়রানির শিকার হয়। নারী শ্রমিকদের অভিযোগ, পুলিশকে অনেক বলার পরেও এসবের কোন সুরাহা হয়নি। এছাড়া দোকানগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়া হয়েছে অবৈধভাবে। বিভিন্ন ফ্যাক্টরির বৈধ লাইন থেকে ছোট তার দিয়ে অবৈধ সংযোগ টানা হয়েছে দোকানগুলোতে। ফলে ওই বিদ্যুতের বিলও গিয়ে পড়ছে সংশ্লিষ্ট ফ্যাক্টরির কাঁধে। পিডিবি মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও অভিযোগ আছে পিডিবি’র কিছু অসাধু কর্মকর্তা মাসোহারার বিনিময়ে এ সংযোগ দিয়েছে। ফলে অভিযান চালানোর পর আবারও নতুন করে সংযোগ দেয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাহাড়তলী থানা পুলিশ এই পুরো এলাকা থেকে মাসে অর্ধ লক্ষ টাকার চাঁদা তোলে। সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক, বাস ও টং দোকানগুলো থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হয়। এছাড়া স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোরশেদ আক্তার চৌধুরীর ছত্রছায়ায় ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের নাম ভাঙিয়ে কতিপয় সন্ত্রাসীরা নিয়মিত মাসোহারা নেয়। ফলে এখানকার অবস্থার কোন উন্নতি হচ্ছে না।
জানতে চাইলে পাহাড়তলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম পুলিশের চাঁদা নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বিডিজার্নালকে বলেন, পুলিশের চাঁদা নেয়ার কথাটি সঠিক নয়। পুলিশ কেন চাঁদা নেবে।
এরপর তিনি বলেন, রাস্তার উপরে ট্রাক-বাস থাকলে সমস্যা কি? এতে কি কারো ক্ষতি হচ্ছে? তবে কেউ যদি অভিযোগ করে তাহলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। আমরা এ ব্যাপারে এখনো অভিযোগ পাইনি।
জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের ১১ নং দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. মোরশেদ আকতার চৌধুরী বিডিজার্নালকে বলেন, আমার নাম ভাঙিয়ে কেউ চাঁদা নিচ্ছে কিনা আমার জানা নেই। তবে আমি নিজে অনেকবার ওখান থেকে অবৈধ দোকান ও বাজার উচ্ছেদ করেছি। আমার প্রতিপক্ষরা আমার বদনাম করার জন্য এসব কথা ছড়াচ্ছে। এরপর তিনি এ প্রতিবেদকে তার অফিসে এসে দেখা করতে বলেন।
জানতে চাইলে বিসিক সাগরিকা অঞ্চলের সভাপতি ও লুব-রেফ (বাংলাদেশ) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুফ বিডিজার্নালকে বলেন, অনেক বছর ধরেই সাগরিকা বিসিক অঞ্চলে এ অরাজকতা চলছে। প্রশাসনকে অনেকবার বলার পরেও তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো তারা এসব অবৈধ পার্কিং ও দোকান থেকে মোটা অংকের মাসোহারা নিচ্ছে। আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েও বিষয়টা জানিয়েছি। একটি শিল্পাঞ্চলে কিভাবে এরকম পরিবেশ থাকে সেটা আমার বোধগম্য হয়। এসবের কারণে এখানে বিদেশিরা বিনিয়োগ করে না। অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সরকারেরও অনেক ক্ষতি হচ্ছে। তাই প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করছি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে যেন দ্রুতই এ বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি দেয়া হয়।

সাব্বির// এসএমএইচ//৫ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং ২১শে ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Share.

Comments are closed.