পর্যটনের অপার সম্ভাবনার হাতছানি সন্দ্বীপে

0

কেফায়েতুল্লাহ কায়সার :

সুজলা সুফলা শষ্য শ্যামলা অপরূপ সৌন্দর্যের প্রাকৃতিক এক নৈসর্গিক লীলা ভূমি সন্দ্বীপ। চারদিকে জল মাঝখানে স্থল। এ ধরণের জায়গা পর্যটন কেন্দ্রের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও পর্যটকদের জন্য বেশ আকর্ষণীয়।
সন্দ্বীপের দীর্ঘাপাড় ইউনিয়নের কথায় যদি বলি সেখানে দেখা যায় বর্ষার পর অনেকে বেড়াতে আসে এখানে। খোলা মেলা কেওড়া বাগানের এই নান্দনিক স্পট দিন দিন স্থানীয় পর্যটকদের নিকট দারুণ উপভোগ্য ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। শীত মৌসুমে প্রতিদিন সেখানে অসংখ্য ভ্রমণ পিপাসু মানুষের আনাগোনায় মুখরিত হয়ে উঠে এই উপকূলীয় এলাকা। বিশেষ করে খোলা মেলা জায়গা, সারি সারি গাছ সবুজ কেওড়া বাগান আর সমুদ্র সৈকত যেকোন মানুষেরই নজর কাড়ে। সাথে সাথে সরকারীভাবে নির্মিত একতলাবিশিষ্ট ১৮টি বিল্ডিংও দারুন সাজিয়েছে এলাকাকে।
শীতের মৌসুমে ভ্রমণ প্রিয় সন্দ্বীপীদের বেশ পছন্দের জায়গা এটি। সন্দ্বীপের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল শ্রেণি পেশার মানুষ পিকনিকসহ কাজের ফাঁকে একটু সময় পেলেই ছুটে যান দ্বীপের এ পর্যটন স্পটে। হাজার ক্লান্তির মাঝে সেখানে যেন খুজে পান এক গুচ্ছ শান্তির পরশ।
সাগরের পাশে চির সবুজ, বিস্তৃত জায়গা গবাদি পশু, সারি সারি গাছ-গাছালি ও সবুজ বাগান দারুণ সাজিয়েছে এ স্পটকে। এখানে প্রায় ৯০টা কলোনী আছে। প্রায় দুই হাজার পরিবার ও ১১০০ ভোটার রয়েছে। সরকারীভাবে ১৮ টি একতলা বিশিষ্ট বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়েছে এখানে। যেখানে ৫টি করে পরিবার বসবাস করছে। এ ঘরগুলো এক সাথে দেখলে মনে হয় এগুলো অত্র স্পটের কিছুটা মান বাড়িয়েছে। তাই এসব দেখে বেশ মজা পায় স্থানীয় পর্যটকরা। সন্দ্বীপের অন্যতম এ পর্যটন কেন্দ্রে পরিকল্পিত পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে।
পর্যটনের হাতছানি দেয়া এই নান্দনিক স্পটে দুই বছর আগে একটি বিদেশি এনজিও এসেছিল। এটাকে পরিকল্পিত পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরের জন্য। তাদের একটি গ্রুপ সরেজমিনে পরিদর্শন করেছিল এই এলাকা। মিটিংও করেছিল এই এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের সকল সদস্যদের সাথে। তখন জানিয়েছিল এই এলাকায় পর্যটন কেন্দ্র করার ব্যাপারে তাদের নানা উদ্যোগের কথা।
পর্যটন কেন্দ্র নিয়ে উন্নয়নের কাজ করার কথাছিল ২০১৭ সাল থেকে। তবে এ নিয়ে সেখানে এখনো কোন উন্নয়ন কাজ শুরু হয়নি। আর এ বিষয়ে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের দপ্তরে অফিসিয়াল কোন চিঠি দিয়ে সরকারী কোন দপ্তর থেকে আদৌ জানানো হয়নি।
এদিকে সন্দ্বীপের মাঝামাঝি সেনেরহাট সংলগ্ন এলাকায় প্রয়াত শিল্পপতি এম নুরুল ইসলাম বিস্তৃত এলাকা জুড়ে দীর্ঘ বছর আগে ভ্রমণপ্রিয় সন্দ্বীপীদের জন্য চমৎকার একটি পরিকল্পিপত পর্যটন স্পট করেছেন। সেখানে মাছ, বড় বড় পুকুর, সারি সারি নারিকেল গাছ আর সবুজ প্রকৃতি বেশ চোখ ধাঁধানো। সন্দ্বীপে সর্বপ্রথম প্রাকৃতিক পরিবেশের বিনোদন স্পট ছিল এটি। এখানে শীতের মৌসুমে নানা পেশার মানুষ পিকনিক এর আয়োজন করে থাকে।
অন্যদিকে ঐতিহ্যের সেই সন্দ্বীপ টাউনসহ সন্দ্বীপের পশ্চিমাংশ ভেঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলেও পুনরায় ভূমি জেগে উঠায় ইতিমধ্যে সেই এলাকার স্বপ্নহারা মানুষগুলো আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে অত্র এলাকাকে কেন্দ্র করে।
২০১৬ সালে সন্দ্বীপের পশ্চিমে সমুদ্র সৈকতে নভেম্বর মাসে শীত মৌসুমে ‘সন্দ্বীপ বীচ এন্ড রেস্টুরেন্ট’ নামে পরিকল্পিতভাবে একটি চমৎকার বিনোদন স্পট করেছিলেন পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাইনুদ্দিন মাহী। প্রায় দশ লক্ষ টাকা খরচ করে গড়ে তুলেছিলেন এই পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকতো এটি । দিনের চেয়েও সন্ধ্যার এ বীচকে লাল নীল রঙিন বাতিতে বেশ দারুণ দেখাতো এটাকে। রাতের আলোতে আরেক অন্যরকম বিনোদন কেন্দ্র মনে হত এই বীচকে।
খড়কুটো দিয়ে প্রায় ২০ টি ছোট ছোট ঘর তৈরী করেছিল মাইনুদ্দিন সেখানে। বিনোদন প্রিয় বিভিন্ন পেশার মানুষ উপভোগ করেছিল এই পর্যটন স্পটকে বেশ। পুরাদিন খুব একটা মানুষের আনাগোনা চোখে না পড়লেও বিকালের দিকে ভ্রমণপ্রেমীরা বেশ ভিড় জমাতো এখানে।
নির্মিত ছোট ছোট ঘরগুলোতে আড্ডা ও খাওয়া-দাওয়া করতো বীচে আসা পর্যটকরা। আনন্দ ভ্রমণ কিংবা পিকনিক স্পটের বিকল্প হিসেবেও স্থানীয় পর্যটকরা বেছে নিয়েছিল ব্যাক্তি উদ্যোগের এই পর্যটন কেন্দ্রকে। ভ্রমণ পিপাসু স্থানীয় পর্যটকরা প্রতিনিয়ত চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বীচ এর মত এখানে এসে বেশ ভিড় জমাতো। হাজার হাজার স্থানীয় পর্যকের আনাগোনায় মুখরিত ছিল এই সন্দ্বীপ সী বীচ।
শীত মৌসুমে বেশ জমজমাট থাকলেও বর্ষা মৌসুমে প্রাকৃতিক কারণে লন্ড ভন্ড হয়ে যায় এই বীচ। বীচের মালিক কাউন্সিলর মাইনুদ্দিন এবার শীতে পুনরায় বীচটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করবেন বলে জানান।
এদিকে ৮০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ৭৫০ ফুট দৈর্ঘ্য আর ১১ ফুট প্রস্থ পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ড এ সদ্য নির্মিত দৃষ্টিনন্দন সন্দ্বীপের এই প্রথম মেরিন ড্রাইভ সড়কটি এলাকায় চমৎকার পর্যটন কেন্দ্রের জন্য আর একটি মাইল ফলক বলা যায়।
অন্যদিকে বর্তমানে সন্দ্বীপের চারদিকে ব্লক দিয়ে স্থায়ী বেড়িবাঁধের জন্য ২১৩ কোটি টাকা ও কুমিরা-গুপ্তছড়া নৌ-রুটে সী-ল্যান্ড স্টেশনসহ আর একটি জেটি নির্মাণের জন্য কিছুদিন আগে ৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। আর শীঘ্রই এই নৌ-রুটে আসবে নতুন জাহাজ। এদিকে সাব মেরিন কেবলের মাধ্যমে মূল ভু-খন্ডের বিদ্যুতের সাথে বিদ্যুতের আলোতে আলোকিত হতে যাচ্ছে সন্দ্বীপ। এসব যথাযথ বাস্তবায়ন হলে পর্যটনের আরেক নব দিগন্তর সূচনা ঘটবে সন্দ্বীপে।
এক সময় চট্টগ্রামের তৎকালীন সিটি মেয়র এ বি এম মইিউদ্দিন চৌধুরী বলেছিলেন তিনি সন্দ্বীপেকে সিঙ্গাপুরে রূপান্তর করবেন। আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সন্দ্বীপ সফরে গিয়ে সন্দ্বীপের পশ্চিমে ইকনোমিক জোন করার ঘোষণা দেন। এসব বাস্তবায়ন হলে চারদিকে পানি বেষ্টিত এ দ্বীপে রয়েছে পরিকল্পিত পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের অপার সম্ভানা।
তিন হাজার বছর পূর্বে সাগর মাঝে জেগে উঠা নান্দনিক এ দ্বীপে বিদেশীদের আনাগোনা ছিল বেশ। বিদেশি শিপ ও বিদেশিরা প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশের এ দ্বীপে অবস্থান করত দিনের পর দিন। ইতিহাস সুত্রে জানা যায় বিভিন্ন দেশের কিছু নাগরিক এ দ্বীপকে এত পছন্দ করত যার ফলে তারা এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিল।
সব মিলে পর্যটন স্পটের অপার সম্ভাবনাময় সন্দ্বীপের দীর্ঘাপড়া ইউনিয়ন ও সন্দ্বীপের পশ্চিমে সরকারী বা বেসরকারী উদ্যোগে সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে ভালো মানের থাকা-খাওয়ার হোটেল, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ ও বিনোদন কেন্দ্র স্থাপনসহ স্থায়ী পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিলে সাগর বেষ্টিত এ এলাকায় দেশি বিদেশী পর্যটকদের ভ্রমণের পছন্দের জায়গা হতে পারে সন্দ্বীপ। একই সাথে এই এলাকা ও এই পর্যটন খাত থেকে সরকার বিশাল অংকের রাজস্ব পেতে পারে। দেশ বিদেশে এ দ্বীপের পরিচিতি সহ আরো উন্নত হতে পারে ঐতিহ্যবাহী দ্বীপ সন্দ্বীপ।

সাব্বির// এসএমএইচ//১২ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং ২৮শে ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Share.

Comments are closed.