পরিবারের মানসিক চাপ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে তাসফিয়া : পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান তাসফিয়ার পরিবারের

0

সাব্বির আহমেদ,চট্টগ্রাম:

পরিবারের মানসিক চাপ সইতে না পেরে চট্টগ্রাম নগরীর সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী তাসফিয়া আমিন পতেঙ্গার নেভালে কর্ণফুলী নদীতে নেমে আত্মহত্যা করেছে বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। রবিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) নগর গোয়েন্দা পুলিশ গত সাড়ে চার মাসের চুলচেরা তদন্ত শেষে আদালতে এমন প্রতিবেদনই জমা দিয়েছে। তবে পুলিশের এ তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে তাসফিয়ার পরিবার। তাসফিয়া হত্যা মামলায় ‘তাসফিয়া আত্মহত্যা করেছে’ মর্মে দাখিল করা এ প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বাদীর আইনজীবী এডভোকেট চন্দন দাশ।
নগর গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার আসিফ মহিউদ্দিন জানান, পতেঙ্গার কর্ণফুলী নদীর পাড় থেকে উদ্ধার হওয়া স্কুলছাত্রী তাসফিয়া আমিনের লাশ উদ্ধারের পর থেকে বিষয়টি নিয়ে চুলচেরা তদন্ত করা হয়। তদন্তে হত্যার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। কর্ণফুলীর পানিতে নেমে সে আত্মহত্যা করে।
তিনি আরও জানান, প্রত্যক্ষদর্শী ৬ জনসহ ১৬ জন সাক্ষীর কাছ থেকে তথ্য ও জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। এছাড়া তাসফিয়ার ময়নাতদন্তের ভিসেরা রিপোর্টে তাকে ধর্ষণ, শারীরিক বিষক্রিয়া ও হত্যার উপযোগী কোন আঘাতের তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে আদনানের সাথে পরিচয় হয় জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা আসিফ মহিউদ্দিন বলেন, ঘটনার এক মাস আগে আদনানের সাথে প্রেমের সম্পর্ক হয় তাসফিয়ার। বিষয়টি তার পরিবার মেনে নেয়নি। একপর্যায়ে বাবা-মা তার কাছ থেকে মোবাইলের সিম নিয়ে ফেলে। আদনানের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখতে তারা চাপ তৈরী করেন তাসফিয়ার ওপর। কিন্তু গোপনে তাসফিয়া আদনানের সাথে সম্পর্ক রাখে। গত ১ মে আদনান ও তাসফিয়ার প্রেমের এক মাস পূর্তি হয়। তারা সেদিন বিকেলে নগরের গোলপাহাড় মোড়ের চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্টে দেখা করতে যায়। বিকেলে ঘরে মেয়েকে না দেখে তাসফিয়ার বন্ধু শওকত মিরাজকে কল করেন তাসফিয়ার মা নায়মা খাতুন।
তিনি শওকতকে পূর্বানুমানের উপর ভিত্তি করে বলেন, ‘আমি জানি তাসফিয়া আদনানের সাথেই আছে। তুমি তাকে এক্ষুণি বাসায় ফিরতে বলো।’ তাসফিয়ার মায়ের এ খবর বন্ধু মিরাজ পৌঁছে দেয় আদনানের ফোনে। আদনান বিষয়টি তাসফিয়াকে জানায়। এরপর তাসফিয়া আতঙ্কিত হয়ে পড়লে অর্ডার করা খাবার না খেয়েই বেরিয়ে পড়ে তারা।
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, মায়ের ভয়ে তাসফিয়া আর বাসায় যায়নি। পতেঙ্গায় নদীর তীরের নেভাল এলাকায় একা চলে যায় সে। রাত আটটায় সেখানে তাকে ছয়জন স্থানীয় ব্যক্তি হতাশাগ্রস্থ অবস্থায় দেখতে পায়। সাড়ে আটটায় স্থানীয়রা তাকে নদীতে নামতে দেখে। এর কিছুক্ষণ পর তারা চিৎকারের শব্দ শুনতে পায়। অনেকে নদীতে তাকে খোঁজাখুঁজিও করে। কিন্তু রাতে তাকে পাওয়া যায়নি। সকালে নদীর পাড়ে থাকা পাথরের উপর তার লাশ পড়ে থাকতে দেখে তারা। মোট ১৬ স্বাক্ষীর জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে আসে।
সিআইডি চট্টগ্রাম জোনের বিশেষ পুলিশ সুপার ড. নাজমুল করিম জানান, তাসফিয়ার মৃত্যুর ঘটনাটি যেহেতু অত্যন্ত আলোচিত ও স্পর্শকাতর, তাই তার ভিসেরা পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বোর্ড গঠন করা হয়। বিশেষজ্ঞ কমিটি ভিসেরা রিপোর্টটি তৈরি করে। এতে ধর্ষণের কোন আলামত পাওয়া যায়নি।
এদিকে, তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন তার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু কারা কেন হত্যা করেছে সে বিষয়ে কোন তথ্য তাসফিয়ার পরিবার পুলিশকে জানাতে পারেনি । ৫ মে তাসফিয়ার বাবা চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তাসফিয়া হত্যাকা-ে তৃতীয় কোন পক্ষের ইন্ধন আছে বলে অভিযোগ তুলেছিলেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পুলিশের দেয়া এ তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে তাসফিয়ার পরিবার। তারা এ প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি প্রতিবেদন দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তাসফিয়া হত্যা মামলার বাদীর আইনজীবী এডভোকেট চন্দন দাশ মানবকণ্ঠকে বলেন, আমরা এখনো তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাইনি। পেলে বিস্তারিত জেনে আদালতের দ্বারস্থ হবো।
তিনি আরো জানান, তদন্তে কী এসেছে না দেখে বলা ঠিক হবে না। তবে আমরা এ প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি প্রতিবেদন দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
প্রসঙ্গত, গত ২ মে সকালে কর্ণফুলী নদীর পতেঙ্গার ১৮ নম্বর ঘাটে পাথরের ওপর উপুড় হয়ে থাকা অবস্থায় তাসফিয়ার লাশ পাওয়া যায়। ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে একই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র আদনানের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয় বলে পরিবারের ভাষ্য। লাশ উদ্ধারের আগেরদিন বিকালে আদনানের সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়ে নিখোঁজ হন তাসফিয়া। আদনান ও তাসফিয়া নগরীর গোলপাহাড় মোড়ে ‘চায়না গ্রিল’ নামে একটি রেস্টুরেন্টে খাবার খান। পরে সেখান থেকে বেরিয়ে দুজনে দুটি অটোরিকশায় উঠে চলে যান বলে সেখানকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে জানিয়েছিলো পুলিশ। তাসফিয়ার লাশ উদ্ধারের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদনানকে থানায় ডেকে আনা হয়। পরে তাসফিয়ার বাবা মামলা করলে তাকে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর হামজার বাগ এলাকার ‘সন্ত্রাসী’ ফিরোজ ও তাসফিয়ার বন্ধু আদনান মির্জাসহ ছয়জনকে এজাহারভুক্ত আসামি করে মামলা দায়ের করেন তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন।

সাব্বির// এসএমএইচ//১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং ২রা আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Share.

Comments are closed.