চকরিয়ায় মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গন ঝুঁকিতে সড়কসহ অসংখ্য স্থাপনা

0

আবদুল মজিদ,চকরিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা:

কক্সবাজারের চকরিয়া দিয়ে প্রবাহিত মাতামুহুরী নদীর দৈর্ঘ্য ২৮৬ কিলোমিটার। পার্বত্য বান্দরবান জেলার আলীকদম থেকে শুরু হয়ে কক্সবাজারের সাগর পর্যন্ত মাতামুহুরী নদীর দৈর্ঘ্য ২৮৬ কিলোমিটার হলেও চকরিয়া উপজেলার মাঝ দিয়ে গেছে প্রায় শত কিলোমিটার নদীর অংশ। এই নদী কারো জন্য আশীর্বাদ হলেও আবার অনেকের জন্য অভিশপ্ত হয়ে উঠেছে। উজান থেকে নেমে আসা পলি মাটি ও বালি জমে ভরাট হয়ে গেছে মাতামুহুরী নদীর একাধিক অংশ। প্রবাহমান নদীতে এখন শুষ্ক মৌসুমে নৌ চলাচল করার কোন সুযোগ নাই। অথচ প্রায় দুই যুগ পূর্বেও ট্রলারসহ নানা নৌযান পণ্য নিয়ে চকরিয়া হয়ে লামা-আলীকদম পর্যন্ত যেতো। সেই নদী তলদেশের সামান্য অংশ দিয়ে ছড়াখালের মতো পানি চলাচল করলেও বৃহদাংশে চর জেগে খেলার মাঠ ও ফসলি জমিতে রূপ নিয়েছে।
জানাগেছে, লামা ও আলীকদম উপজেলা বনাঞ্চলের বৃক্ষরাজি কাটার পাশাপাশি গোড়ালিও উত্তোলন করে ফেলায় এবং নিয়মিত পাহাড় কেটে পাথর উত্তোলন করায় ছোট-বড় পাহাড় গুলোর মাটি বৃষ্টির পানির সাথে ভেসে এসে মাতামুহুরীর তলদেশ ভরাট হয়ে যায়। এতে মাতামুহুরী নদীর দু’কূল ভাঙ্গছে হরদমে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা ভাঙ্গনের কবলে পড়ে যায়। মাত্র দুই যুগেই এই নদীর ভাঙ্গনে অন্তত ১৫ হাজার বসতভিটে বিলীন হয়েছে। চকরিয়ার পুরনো চিরিংগা বাজার, তৎসংলগ্ন মামা-ভাগিনার মাজার, কবরস্থানের আংশিক, পুরনো থানা ও হাসপাতালের ভিটে তলিয়ে গেছে নদীতে। কৈয়ারবিল, লক্ষ্যারচর,সুরাজপুর-মানিকপুর, বেতুয়াবাজার, সীতারখিল, ছোট ভেওলা, লক্ষ্যারচর, সাহারবিল, কাকারা, মানিকপুর, ফাঁসিয়াখালী ঘুনিয়া, পৌরসভার কোচপাড়া, দিগরপানখালী, কাজির পাড়া, উত্তর কাহারিয়াঘোনা খোন্দকারপাড়াসহ বেশ কিছু অংশ ভাঙ্গন ঝুঁকিতে রয়েছে। এই নদীতে পাহাড়ি ঢল নেমে পলি পড়ায় আবাদি জমিতে ভালো ফলন হলেও ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে হাজার হাজার পরিবার। এই ভাঙ্গন থেকে রক্ষা পেতে ১৯৯১ সাল থেকে চকরিয়ার মানুষ সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে মাতামুহুরী নদীতে ড্রেজিং করার জন্য। তাদের বক্তব্য, সাত থেকে দশ ফিট গভীর ড্রেজিং করলে এবং নদীর আঁকা-বাঁকা অংশ সোজাকরণের পাশাপাশি কিছু কিছু অংশে বাঁধ ও ব্লক দেয়া হলে ভাঙন অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
আরো জানা যায়, চকরিয়া-বদরখালী-মহেশখালী সড়কের উত্তরপাশে বাটাখালী সেতু সংলগ্ন সাহারবিলের শীলপাড়ার অবস্থান। বাটাখালী সেতু থেকে ইটবিছানো সড়ক দিয়ে উত্তরে গেলে সাহারবিল আনওয়ারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা। সড়কটি দিয়ে ৫০ মিটার উত্তরে গেলেই সড়কের আর চিহ্ন নেই। সড়কের এই অংশটি (৫০০ মিটার) পাশের মাতামুহুরী নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নদীর পাশেই গাছের তক্তা দিয়ে সাঁকো বানিয়ে মানুষ পার হচ্ছে। এখনও নদীর গর্ভে নারিকেল গাছ, বসতঘরের চালা ও সড়কের কিছু স্মৃতি চিহ্ন ভেসে রয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে মাতামুহুরী গ্রাস করতে পারে আরও কিছু বসতঘর। এসব ঘরের আঙিনা ইতিমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। শীলপাড়ার দুলাল সুশীল, সাধন সুশীল, তপন সুশীল, মানিক সুশীল, সচিন্দ্র সুশীল, যদু সুশীল, রাখাল সুশীল, সুবল সুশীল, রতন সুশীল, বিধান সুশীল, হৃদয় শীলের বসতঘর গত বর্ষায় মাতামুহুরী নদীর ভাঙনে বিলীন হয়েছে। তাদের সবার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। বসতঘর হারা হৃদয় শীল বলেন, দেশে এতো নেতা, এতো প্রশাসন, এতো জনপ্রতিনিধি, দু:খের সময় কাউকেই পাইনি। বসতঘর হারিয়ে এখন অন্যের আঙ্গিনায় থাকি। কেউ কোনোদিন একটু দেখতেও আসলো না, খবরও নিলো না। সচিন্দ্র সুশীল (৫৫) বলেন, গত দশ বছরে অন্তত একশত বসত ঘর, দুটি মন্দির ও চলাচলের একমাত্র সড়কটি মাতামুহুরীর গর্ভে বিলীন হয়েছে। উদ্ধাস্তু হয়েছে বহু মানুষ। এখন লোকজন বসত-বাড়ির উঠানের ওপর দিয়ে হাঁটছে।
চকরিয়া আনওয়ারুল উলুম কামিল মাদরাসার ফাজিলের (ডিগ্রী) প্রভাষক আফম ইকবাল হাসান বলেন, প্রতিদিন শীলপাড়া সড়কটি দিয়ে মাদ্রাসায় আসা যাওয়া করতে খুব কষ্ট হয়। গাড়ি চলে না। প্রতিদিন হেঁটে আসা যাওয়া করতে হয়। বৃষ্টি হলে হেঁটেও যাওয়া যায় না।
লক্ষ্যারচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তাফা কাইছার বলেন, বর্তমানে তার ইউনিয়নের হাজিপাড়া পয়েন্টে ৩৩ হাজার ভোল্ডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড দুইশত মিটার এলাকায় পাথরের ব্লক বসানোর কাজ করছেন। কিন্তু প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক সংকটের অজুহাতে পাউবো আয়তন ছোট করেছে। এ অবস্থার কারনে বর্তমানে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের একেবারে পাশে স্থানীয় হাজিপাড়াস্থ পুরানো মসজিদ, গুরুত্বপুর্ণ একাধিক গ্রামীণ সড়ক, ফসলী জমি, স্কুল, মাদ্রাসাসহ হাজারো জনবসতি ভাঙ্গনের কবলে পড়ে নদীতে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
কাকারা ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ শওকত ওসমান বলেন, মাঝেরফাঁড়ি অংশে বেড়িবাঁধ দেয়ায় ঢলের ক্ষতি থেকে চলতি বর্ষায় কাকারার অনেক বাসিন্দা রক্ষা পেয়েছে। দিঘির নিকটবর্তী হাজিয়ান সড়কের সেতু পয়েন্টে একটি স্লুইস গেট বসানোর পাশাপাশি আরো ৫-৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ দেয়া হলে এবং ওই বাঁধের কিনারে নদী অংশে ব্লক ফেলা হলে বন্যা ও ভাঙন থেকে লাখো মানুষ রক্ষা পাবে।
সাহারবিল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আলহাজ মহসিন বাবুল বলেন, শীলপাড়ার মানুষের আর্তনাদের কথা লিখিতভাবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে জানানোর পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা সরেজমিনে ঘুরে গেছেন। এলাকার মানুষ ভাঙনরোধে স্থায়ী সমাধান চায়। এজন্য বড় প্রকল্প নিয়ে জিও ব্যাগ বা ব্লক দিয়ে কাজ করতে হবে।
ফাঁসিয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী বলেন, দিগরপানখালী এলাকায় বেড়িবাঁধ দেয়া হলেও তা টেকসই করে রাখতে আরো ব্লক এবং মাটি দিতে হবে। পাশপাশি নির্মিত বাঁধের দৈর্ঘ্য আরো বাড়াতে হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের চকরিয়া শাখা কর্মকর্তা তারেক বিন সগীর বলেন, লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের হাজিপাড়া পয়েন্টে মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গন প্রতিরোধে বর্তমানে দুইশত মিটার পাথরের ব্লকদ্বারা টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। আমরা প্রকল্পের শুরুতে মসজিদ এলাকাটি সম্পৃক্ত করতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু অর্থবরাদ্দ পর্যাপ্ত না হওয়ায় শূধুমাত্র বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এলাকাটি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। তারপরও মসজিদ এলাকাটি রক্ষার্থে জরুরী প্রকল্পের আওতায় একশত মিটার এলাকাজুড়ে নতুনভাবে জিও ব্যাগ বসানোর জন্য টাকা বরাদ্দ চেয়ে ইতোমধ্যে পাউবোর উপর মহলে পরিপত্র পাঠানো হয়েছে। অর্থবরাদ্দ নিশ্চিত হলে সেখানে কাজ শুরু করা হবে।
চকরিয়া পৌরসভার মেয়র আলমগীর চৌধুরী বলেন, পৌরসভার কোচপাড়া, কাজিরপাড়া, আবদুল বারীপাড়া, উত্তর কাহারিয়াঘোনা খোন্দকার পাড়া, দিগরপানখালীসহ পৌরসভার বেশ কিছু অংশ মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। ইতিমধ্যে পাউবোর অধীনে দিগরপানখালী এলাকায় ব্লকের কাজ চলছে। অন্যান্য ভাঙ্গন থেকে বসতী রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে বরাদ্ধ পেলে খুবশীঘ্রই কাজ শুরু হবে বলে জানান।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, সরেজমিনে শীলপাড়া এলাকায় মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গন পরিদর্শন করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই পজিটিভ কিছু একটা হবে।
চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ জাফর আলম বলেন, মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গনে তীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক তান্ডব চলছে। বর্তমানে লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের হাজিপাড়া জামে মসজিদ পয়েন্টটি অন্যতম। এলাকাটি আমি পরিদর্শন করেছি। পাউবো চাইলে মসজিদের পাশে চলমান প্রকল্পের আওতায় মসজিদটি রক্ষায় সম্পুরক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে। তাতে মসজিদটি নদীর ভাঙ্গন থেকে রক্ষা পাবে। হাজারো ধর্মপ্রাণ মানুষ আগের মতো নিরাপদ পরিবেশে ইবাদত বন্দেগী করতে পারবে।
চকরিয়া-পেকুয়া আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, চকরিয়ার মাতুমুহুরী নদীর ভাঙ্গন থেকে রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে প্রায় ৫শত কোটি টাকার একাধিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পে নদী তীরবর্তী ব্লক স্থাপন, নদী খনন, টেকসই বাধ নির্মাণসহ নদী শাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি অচিরেই এসব কাজ শুরু হবে বলে জানান।

সাব্বির// এসএমএইচ//১৪ই অক্টোবর, ২০১৮ ইং ২৯শে আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Share.

Comments are closed.