চাকসু নির্বাচনে ছাত্র-ছাত্রীদের অভিমত ঘুণে ধরেছে চাকসুর আসবাবপত্র

0

চট্টগ্রাম ব্যুরো :
চট্টগ্রাম শহর থেকে ২২ কিলোমিটার উত্তরে হাটহাজারীতে ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার ৫২ বছরের ইতিহাসে নানান আয়োজনের মধ্যে অন্যতম ছিলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)।
শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক শৃঙ্খলা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কথা চিন্তা করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই তৎকালীন সময় গঠন করা হয়েছিলো চাকসু।প্রতিষ্ঠার পর থেকে মাত্র ছয়বারের মতো চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চার বছরের মাথায় ১৯৭০ সালে সর্বপ্রথম চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রথম ভিপি নির্বাচিত হন শহীদ আবদুর রব ও জিএস হন মোহাম্মদ ইব্রাহিম। এরপর ১৯৭২, ১৯৭৪, ১৯৭৯, ১৯৮১,এবং সর্বশেষ ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারীতে চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ ভিপি নির্বাচিত হন নাজিম উদ্দিন ( জাতীয় ছাত্রলীগ )ও জিএস হন আজিম উদ্দিন (গণতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট) এবং এজিএস হন মাহবুব রহমান শামীম (ছাত্রদল)। এরপর থেকে গত ২৯ বছরে আর কোনো নির্বাচন হয়নি। নাজিম উদ্দিন এখনো চাকসুর ভিপি হিসেবে পরিচিত।
তবে দীর্ঘদিন চাকসুর কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তৎকালীন সময়ে নির্মিত চাকসু ভবনটি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিকট ক্যান্টিন হিসেবেই বেশি পরিচিত। তাছাড়া পরিচর্যার অভাবে ‘চাকসু ভবন’ লেখাটিও অনেকটা মুছে গেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ-১৯৭৩ এর ২২ নং ধারা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০১ সদস্য বিশিষ্ট সিনেটে পদাধিকারবলে ৫ জন ছাত্র প্রতিনিধি থাকবে। নির্বাচন না হওয়ায় গত ২৮ বছর সিনেটে শিক্ষার্থীদের কোনো প্রতিনিধি নেই। যার ফলে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবী উত্থাপন এবং আদায়ের চাকাও অচল হয়ে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চাপিয়ে দেওয়া যেকোনো নীতিমালা মাথা পেতে নিতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সেক্টরের নির্বাচন প্রক্রিয়া অব্যহত থাকলেও দীর্ঘ ২৮ বছর অধরাই থেকে গেছে চাকসু নির্বাচন। ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সম্প্রীতি এবং নেতৃত্বের সম্ভাবনা। এমনকি সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হারিয়েছে বলেও মনে করেন অনেকে। ছাত্র সংসদের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা তাদের বিভিন্ন দাবি আদায়ে সোচ্চার ছিলো। এমনকি মত প্রকাশের সুযোগও ছিলো সবার। সেটা এখন আর নেই, এমন মন্তব্য ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের।চাকসু নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনগুলোর একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বললে তারা নির্বাচনের বিষয়ে প্রশাসনের অসহযোগিতার কথা জানান।
চবি ছাত্রলীগ এর বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি আলমগীর টিপু মানবকন্ঠকে বলেন, চাকসু নির্বাচনের বিষয়ে চবি প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ না থাকায় শিক্ষার্থীরা তাদের মতামত প্রকাশে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চাকসু নির্বাচনের দাবিতে ইতোপূর্বেও আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেছি। ক্যাম্পাসের সহাবস্থানের বিষয়ে তিনি জানান, জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসী সংগঠন ছাড়া সবার জন্য সহাবস্থানের ব্যবস্থা করবো আমরা। শাটলট্রেনে ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে কোন প্রকার হয়রানির শিকার না হয় সে দিকে ছাত্রলীগ পাশে ছিল এবং পাশে থাকবে।
চবি ছাত্রলীগ এর বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বি সুজন মানবকন্ঠকে বলেন ‘ সুষ্ঠ পরিবেশের মধ্য দিয়ে চাকসু নির্বাচনের দাবি জানায় ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের আট দফা দাবির মধ্যে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে।সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে নিয়ে চাকসু নির্বাচনের দাবি জানায়। চাকসু নির্বাচন নিয়ে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছিল। প্রশাসন বলেছে ডাকসু নির্বাচনের পরপরি চাকসু নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হবে। তবে, প্রশাসন যদি কথা না রাখে তাহলে সকল ছাত্র-ছাত্রীদেরকে সাথে নিয়ে আদালত পর্যন্ত অগ্রসর হতে পিছপা হব না।

চবি ছাত্রদল সভাপতি খোরশেদ আলম মানবকন্ঠকে বলেন, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান তৈরির জন্য চাকসু নির্বাচনের বিকল্প নেই। তাছাড়া চাকসু নির্বাচন না হওয়ায় ক্যাম্পাসের নিরাপদ পরিবেশ নেই। গণতন্ত্র সেখানে বিলীন, সুষ্ঠ পরিবেশ প্রয়োজন। আমরা চাই ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত করে অতিসত্বর চাকসু নির্বাচন দেয়া হোক।
তিনি মানবকন্ঠকে আরো বলেন ‘পূর্বের ন্যায় সকল ছাত্র সংগঠনগুলো এক হলে চাকসু নির্বাচনের জন্য কোন বাধা থাকবেনা।’

চবি ছাত্র ইউনিয়ন এর সভাপতি ধীষণ প্রদিপ চাকমা বলেন,, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী চাকসু নির্বাচন চায়। সবাই নিজের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা চায়। ক্যাম্পাসের অস্থিতিশীল হবে কিনা? জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দ্বারা মনোনীত প্রতিনিধিরা ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করে তাদের নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হতে দিবে না। সার্বিক বিষয় বিবেচনায় চাকসু নির্বাচন প্রয়োজন।
সর্বশেষ অনুষ্ঠিত চাকসু (৬ষ্ঠ কেবিনেট) নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাক্তণ ছাত্র, বর্তমান চাকসু কেন্দ্রের পরিচালক শাহেদ বীন ছাদিক মানবকন্ঠকে বলেন ‘চাকসু নির্বাচন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মৌলিক অধিকার আদায়ের অন্যতম পন্থা। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে তাদের মৌলিক অধিকারগুলো হতে বঞ্চিত না হয় সেক্ষেত্রে চাকসু নির্বাচন প্রয়োজন। তবে পূর্বেকার মতো চাকসু নির্বাচন হওয়ার পরিবেশ ক্যাম্পাসে এখন নেয়। ১৯৯০ সালের দিকে সর্বশেষ চাকসু নির্বাচনের সময়ে সকল দলের অংশগ্রহণ (বিরোধীদলীয় শক্তি জামায়ত শিবির) বাদে বিপক্ষীয় দল জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা এক হয়ে সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে চাকসু নির্বাচন সফল করতে সফল হয়।
তিনি মানবকন্ঠকে আরো বলেন ‘ বর্তমান পরিস্থিতিতে চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া কিছুটা জটিল। কারণ, সকল সংগঠন একসাথে নির্বাচন অংশগ্রহণের বিষয়টি অনিশ্চিত।এক্ষেত্রে প্রশাসন যদি চায় তাহলে সকল দল এবং সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণে চাকসু নির্বাচন অসম্ভব নয়।’

তৎকালীন ৬ষ্ঠ কেবিনেট ১৯৯০ সালে সর্বশেষ চাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা প্রাক্তণ ছাত্র , বর্তমান চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় অফিসার সমিতির সভাপতি জনাব এ.কে.এম মাহফুজুল হক (খোকন) মানবকন্ঠকে বলেন ‘ নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে চাকসু নির্বাচন সুষ্ঠভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কোন বাধাকেই আমরা প্রশয় দেয়নি। জামায়াত-শিবির ছিল সাধারণ ছাত্র পরিষদের বিপক্ষ প্যানেল। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে নির্বাচিত নেতাদের জয়যুক্ত করা হয় ।উৎসবমুখর পরিবেশে ক্যাম্পাসে মিছিল করা হয়।’
চাকসু নির্বাচন নিয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী জাফর আলম , রাকিবউল্লাহ , সাগরকান্তি দে এবং ১ম বর্ষের ছাত্র আসিফ সমন্বিতভাবে মানবকন্ঠকে বলেন ‘ আমরা চাকসু নির্বাচন চায়, চাকসু নির্বাচন নিয়ে আমরা আশাবাদী। তবে চাকসু নির্বাচন যাতে নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। চাকসু নির্বাচন হলে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের মৌলিক অধিকারগুলো হতে আর বঞ্চিত হবেনা।’ দাবি নিয়ে প্রশাসনের দ্বারগড়ায় যেতে সক্ষম হবে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ।’
চাকসু নির্বাচনের বিষয়ে চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড.ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী মানবকন্ঠকে বলেন ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচন সবার সমন্বিত প্রয়াসে সম্ভব। সবাই এগিয়ে আসলে আমরা নিবার্চন দিতে শতভাগ প্রস্তুত। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, ‘চাকসু থাকলে যে কাজগুলো হত, এখনো সেই কাজগুলো হচ্ছে। বিগত সাড়ে তিন বছরে শিক্ষার যে সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরী হয়েছে, সেটা আমরা স্থবির করতে চাই না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনগুলো বিভিন্ন গ্রুপ, উপ-গ্রুপে বিভক্ত হয়ে নিজেরাই অধিকাংশ সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তাই এই নিবার্চনের সুষ্ঠু পরিবেশ কল্পনাতীত। তবে ছাত্র সংগঠনগুলো যদি নিবার্চনকে ঘিরে ক্যাম্পাসের স্থিতিশীল পরিবেশ নষ্ট হবে না। এই মর্মে লিখিত স্ট্যাম্প জমা দিতে পারে। তবেই প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে চবি প্রশাসন চাকসু নিবার্চন দেবে।
চাকসু নির্বাচন যাতে নিরাপত্তার বেষ্টনির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। কোন প্রকার নিরাপত্তা ছাড়াই চাকসু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। চাকসু নির্বাচন আমাদের অধিকার তবে তা যেন সুষ্ঠভাবে অনুষ্ঠিত হয় সে দাবি জানান সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ।

চট্টগ্রাম ব্যুরো
শাওন আজহার

Share.

Comments are closed.