রোহিঙ্গাদের নিয়ে আতঙ্কে কক্সবাজারের বাসিন্দারা

0

অনলাইন ডেস্ক

কক্সবাজারের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আয়েশা বেগম গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। ১০ ফুট বাই ৮ ফুটের একটি ঘরে তিনি থাকছেন তার পাঁচ সদস্যের পরিবারটিকে নিয়ে। সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেবার খবরে তিনি উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন। কেননা তিনি আর মিয়ানমারে ফিরতে চান না, আজীবন বাংলাদেশেই থেকে যেতে চান।

আয়েশা বেগম বলেন, ‘আঁরা ন যাইয়ুম। তোয়ারা আরারে মারি হালাইলে মারি হালাও (আমরা যাবনা, তোমরা আমাদেরকে মেরে ফেলতে চাইলে মেরে ফেল)।’

এ নিয়ে তার সাফ জবাব, মিয়ানমারে তাদের তো কিছু নাই, তাহলে কেন তারা সেখানে যাবেন?

কেবল আয়েশা বেগমই নন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের সবার বক্তব্য একই রকম। তাদের দাবি একটাই, মিয়ানমারে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হলেই তারা সেখানে ফিরতে রাজি আছে। তাছাড়া সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাদের খুব একটা মাথাব্যথা নেই।

অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের এই মনোভাবের কারণে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশিরা, বিশেষ করে কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দারা। কেননা এইসব শরণার্থীদের কারণে তারা অর্থনৈতিকসহ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

দু’বছর আগে রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল তখন উখিয়া-টেকনাফের মানুষ রোহিঙ্গাদের সাদরে গ্রহণ করেছিলো। নিজেদের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিল শরণার্থীদের জন্য। কেননা মিয়ানমার সেনাদের নির্যাতনের ফলে আগত এসব রোহিঙ্গাদের প্রতি তারা ছিলা প্রচণ্ড সহানুভূতিশীল। অনেকে তো বাড়ির উঠোন, এমনকি নিজেদের ঘরে পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের থাকতে দিয়েছিল।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গেছে, কক্সবাজারের স্থানীয়দের মনে রোহিঙ্গাদের প্রতি ছিটেফোঁটাও সহানুভূতি নেই। বরং তারা এতটাই বিরক্ত যে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ ছেড়ে গেলেই তারা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে।

কুতুপালং লম্বাশিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা আয়েশা সিদ্দিকা আক্ষেপ করে বললেন, রোহিঙ্গা বসতি তাদের জীবনকে শেষ করে দিচ্ছে।

তার ভাষায়, ‘এখন সব জায়গায় বাড়িঘর হয়ে গেছে। আমরা আগে যেখানে ক্ষেত খামার করে খেতাম, ওসব জায়গাতেও রোহিঙ্গাদের ঘর উঠছে। আমরা গরু-ছাগলও পালতে পারতেছি না। ক্ষেত-খামারও করতে পারতেছি না। এ এক অসহ্য যন্ত্রণা।’

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে আদৌ ফিরে যাবেন কিনা সেটি নিয়েও তার সন্দেহ আছে।

কেবল রোহিঙ্গা বসতি নয়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা নিয়েও বাংলাদেশিরা উদ্বিগ্ন। ক্যাম্পের ভেতরে খুনোখুনির ঘটনা যেমন বেড়েছে, তেমনি রোহিঙ্গাদের দ্বারা বাংলাদেশিদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে।

এ নিয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আশরাফুল আফসার বলেন, মানবতাকে রক্ষার জন্য রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সময় যত গড়িয়ে যাচ্ছে স্থানীয় মানুষের মাঝে উদ্বেগ তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি জানান, কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষ চাচ্ছে রোহিঙ্গারা যেন দ্রুত তাদের দেশে ফিরে যায় এবং এখানকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত থাকে।

নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও কোনো চিন্তা নাই রোহিঙ্গারা

কিন্তু দুই বছর পার হলেও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাবার কোন লক্ষণ নেই। এরই মধ্যে দুই দফা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মনে করছে, এ সংকট সহজে দূর হবার নয়।

কক্সবাজারে কর্মরত ফেডারেশন অব ইন্টারন্যাশনাল রেডক্রস এন্ড রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির উর্ধ্বতন কর্মকর্তা মারিয়া ল্যারিও বলেন, তারা এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছেন।

রোহিঙ্গা সংকট গত দুই বছরে জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মোটেও চিন্তা করছেন না। তাদের যত চিন্তা বর্তমান সময়কে ঘিরে। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের কারণে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আতঙ্কে স্থানীয় বাংলাদেশিরা।

সাব্বির=২৬শে আগস্ট, ২০১৯ ইং ১১ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Share.

Comments are closed.