ছবি - চিন্ময় চক্রবর্তী

আলো ছড়াচ্ছে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল

নাহিদ সেকান্দর

নগরের আন্দরকিল্লায় অবস্থিত চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল করোনার ক্লান্তি লগ্নের শুধু থেকে এখনো পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেবা দিয়ে যাবেন এমনটা জানিয়েছেন জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার নাথ।

করোনার থাবা যখন চট্টগ্রামে আসে তখন চট্টগ্রামের জেনারেল হাসপাতালি হবে করোনার চিকিৎসার স্থান এমনি নির্দেশ আসে সরকার থেকে। তারই প্রেক্ষিতে শুরুর দিকে ১০০ শয্যার নিয়ে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে করোনা আক্রান্তের সেবা দিয়ে গেলেও পরবর্তীতে আরো ৫০ শয্যা বাড়ানো হয়। নতুন করে স্থাপন করা হয় ১০ শয্যার আইসিইউ। প্রতিনিয়তই সঙ্গী হয়ে থাকে জনবল ও চিকিৎসা উপকরণ যা আক্রান্ত রোগী বাড়ার সাথে সাথে সংকটের দেখা মিলে। হাসপাতালের অবকাঠামো রোগীবান্ধব না হওয়ায় ভোগান্তি পোহাতে হয় রোগী স্বজনদের, পাশাপাশি ডাক্তারদেরও। অথচ চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি করোনাভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসায় আশার আলো দেখাচ্ছে। আক্রান্তদের চিকিৎসায় এ হাসপাতালে প্রস্তুত করা হয় নতুন শয্যা সাথে আইসিইউ স্থাপনও করেছে। ফলে ক্রমে রোগীদের আস্থা ও নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির ওপর।

হাসপাতালসূত্রে জানা যায়, গত ৩ এপ্রিল চট্টগ্রামে প্রথম রোগী করোনা সনাক্ত হলে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা শুরু হয়। ক্লান্তি লগ্নের শুধু থেকে আজ পর্যন্ত মোট করোনা পরীক্ষা হয়েছে ৯৬৮৬ জনের যার মধ্যে মোট কভিড১৯ আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ৮৬০ জন, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬৬৯ জন এবং মৃত্যু সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫৫ জনের । তবে বর্তমানে আইসোলেশনে মোট রোগী ভর্তি আছেন ২১ জন, সে সাথে আইসিইউতে আছেন কোভিড ১৯ আক্রান্ত রোগী মোট ৯ জন।
ইতিমধ্যে কোভিড ১৯ আক্রান্তের সেবা দিতে গিয়ে অাক্রান্ত হয়েছেন মোট ১৮ জন চিকিৎসক, ৩৫জন নার্স ও ১২জন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী । যার মধ্যে ১ জন অাউটসোসিং কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। তাছাড়াও বিদেশগামীর পরীক্ষা হয়েছে ৮৮৭৮ জনের।

অন্যদিকে, আইসোলেশন ওয়ার্ডে সেবা দেওয়ার জন্য চিকিৎসকদের নিয়ে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও মেডিকেল অফিসারদের সমন্বয়ে নয় জনের চারটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি টিম টানা ১০ দিন দায়িত্ব পালন করে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে থাকবে। এরপর ছয় দিন বাসায় থাকবে। একইভাবে ছয় সদস্য করে নার্সেরও চারটি টিম গঠন করা হয়েছে। তারাও ১০ দিন কাজ করে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকছেন। চিকিৎসক-নার্সদের কোয়ারেন্টাইনে সরকারি আঞ্চলিক লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১২ ও বেসরকারি দুটি হোটেলে ৩৭টি কক্ষ বরাদ্দ আছে।

তাছাড়াও করোনার মহামারির সময়ে চট্টগ্রামে অক্সিজেন সংকট দেখা দিলে এক বিরল চিত্রে পরিণত হয় এবং অক্সিজেনের সংকটটা জেনারেল হাসপাতালও উপভোগ করে যার ফলশ্রুতিতে ২৪ জুলাই- অবশেষে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে বসানো হয়েছে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট। প্রায় ৮০ লাখ টাকার সরকারি অর্থায়নে এই প্লান্ট নির্মাণ করা হয়। যার ফলে এখন থেকে নিরবিচ্ছিন্ন অক্সিজেন সেবা পাবেন রোগীরা। এরই মধ্যে অক্সিজেন সাপ্লাইও শুরু হয়েছে।

প্লান্টের অক্সিজেন সরবরাহের জন্য সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইনও স্থাপন করা হয়েছে হাসপাতালে। শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের আর্থিক সহযোগিতায় এই সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন বাসানো হয়। যেখানে ১৩ হাজার লিটার তরল অক্সিজেন ধারণ ক্ষমতা সম্বলিত প্লান্টটি একবার পূর্ণ করলে স্বাভাবিক সময়ে ২-৩ সপ্তাহ নিরবিচ্ছন্নভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করা যাবে। যা গত ২২ জুন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে হাসপাতালে অক্সিজেন প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হয়।

চট্টগ্রামের জেনারেল হাসপাতালের করোনার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার নাথ বলেন, ‘‘আমরা বিদ্যমান জনবল দিয়ে রোগীদের সেবায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে বর্তমানে আমাদের এখানে আইসোলেশনে মোট ২১জন ও আইসিইউতে মোট ৯ জন কোভিড ১৯ আক্রান্ত রোগী ভর্তি আছেন। কিন্তু শুরুর দিকে রোগীর সংখ্যা বেশি থাকলেও বর্তমানে রোগী সংখ্যা কমেছে। তবে শুরুর দিকে আমরা যে দায়িত্বতার সাথে কাজ করে এসেছি, এখনো পর্যন্ত সে দায়িত্বতার সাথে সামনে যাচ্ছি কিন্তু পরবর্তীতে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড নেয় তা তো জানা নেয় তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে আমার প্রস্তুত আছি।

অক্সিজেন সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক আরো বলেন,”অক্সিজেন সংকট দেখা দিলে হিমশিম খেতে হয় তবে সংকট সামনে যতই থাকুক না কেন আমরা রোগীদের এ সংকট অনুভব করতে দেয়নি। সে সময় বিভিন্ন বেসরকারি মানবিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগী আমাদের আর্থিক অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। তাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল যতদ্রুত সম্ভব প্লান্টটি চালু করা। রোগীরা যাতে অক্সিজেন পায়। সে হিসেবে প্লান্টটি চালু করা হয়েছে। তাছাড়াও হাসপাতালে যেসব অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে তা প্রতিদিন তিনবার করে পূর্ণ করতে হতো। এতে মোটা অংকের অর্থ ব্যয় করতে হতো হাসপাতালকে। তবে এ প্লান্ট বসানোর ফলে সরকারের অনেক টাকা সাশ্রয় হবে। তাই আমরা প্লান্ট চালু করলেও হাসপাতালের যেসব সিলিন্ডার রয়েছে তা পূর্ণ করে রাখবো। কোনো কারণে প্লান্টে ত্রুটি ধরা পড়লে রোগীদের যাতে কোনো সমস্যায় পড়তে না হয়।”

তাছাড়াও তিনি এ করুণ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতা, এবং সরকারে দ্রুত কার্যক্রম পরিস্থিতি সামাল দিতে, সে সাথে যারা রোগীদের চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত ডাক্তার,নার্স প্রত্যেকের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ পাশে থাকার জন্য।

Check Also

বিপদ জয় করে বিজয়ের দেশে ফিরে আসা

জার্নাল ডেস্ক : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’  সাক্ষাৎ বিপদ …

‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি’

জার্নাল ডেস্ক ‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি ‘।    এভাবেই নিজের হতাশার কথা  জানিয়েছেন বসনিয়ায় আটকে …