কুমিল্লায় বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে ধান , ভোগান্তিতে কৃষক

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি :

বৈশাখের শেষদিকে এসে কুমিল্লায় শুরু হয়েছে ‘শ্রাবণধারা’। আর গত কিছুদিনের এ হাকলা ও ভারী-ধারায় পানিতে তলিয়ে যাওয়া মাঠের ধান নিয়ে মহাভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকেরা।বোরো ধান কেটে বাড়ি আনতে তিনগুণ পরিশ্রমের পরও সোনালী ফসল ঘরে তুলতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে জেলার কয়েকটি উপজেলার কৃষককে।এছাড়া বৃষ্টির কারণে আগে কেটে রাখা ধানও মাড়াই করে শুকাতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে কৃষক-কাষাণীদের। চোখের সামনেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কষ্ট করে সৃজিত হাজার হাজার একর জমির ধান। ফলে কৃষকের বুকে জমছে চাপা আর্তনাদ; চোখে-মুখে ফসল হারানোর শঙ্কার ছাপ।কুমিল্লা সদর উপজেলার কয়েকটি গ্রাম ছাড়াও, বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া, দেবীদ্বার উপজেলার কিছু ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, জমিতে ফলা সোনালী ধান ঘরে তুলতে গিয়ে তারা পাচ্ছেন না শ্রমিক। মাঠের ভেজা ধান কেটে বাড়ি তুলতে পরিশ্রম করতে হয় তিনগুণেরও বেশি। ফলে রংপুর, ময়মনসিংহ, গাইবান্দা, জামালপরু ও দিনাজপুর অঞ্চল থেকে কাজের সন্ধানে কুমিল্লায় আসা শ্রমিকরাও ধানকাটার কাজের প্রতি অনিহা দেখাচ্ছেন।এছাড়া গত কিছুদিনে বজ্রপাতে কয়েকজন শ্রমিকের মৃত্যুর খবরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে তাদের মাঝে। তারপরও যে ক’জন শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে- দাম দিতে হচ্ছে দ্বিগুণের বেশি।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৯টা-৫টায় কাজ করা এসব শ্রমিককে তিনবেলা খাওয়ানোর পরও দৈনিক পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে ৮শ’ থেকে হাজার টাকা। অথচ দুইমণ ধান বিক্রি করলেও আসে না এক হাজার টাকা। কুমিল্লার বাজারে একমণ ধান বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৪ শ’ থেকে ৫ শ টাকায়।কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাঠে এখনো তিনভাগের একভাগ ধান কাটা বাকি রয়েছে। সরকারি হিসেবে যা ৫০ হাজার হেক্টরেরও বেশি।জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কুমিল্লায় এ বছর বোরোর আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৪৫৭ হেক্টর জমিতে। যা ছিলো লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর বেশি। তেমনিভাবে ফলনও ছাড়িয়ে গেছে লক্ষ্যমাত্রা। হেক্টর প্রতি ধান উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪.৯ টন।অথচ গত কয়েকদিনে মাঠ ঘুরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ফলন ভালো হলেও এ কয়দিনের বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় অধিকাংশ জমির ধান মাটির সাথে লেপ্টে গেছে। আর ভারী বৃষ্টিতে পানি জমে যাওয়ায় অনেক জমির ফসলই তলিয়ে গেছে। ফলে একদিকে যেমন ছড়া থেকে ধান ঝরে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে; তেমনি পানিতে তলিয়ে মাটিতে লেপ্টে থাকা এসব ধান কেটে বাড়ি নিয়ে যেতে পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে- গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। যদিও সৃজিত ফসলের পুরোটা আর থাকছে না ধানগাছের ছড়ায়।কুমিল্লা সদর উপজেলার কালখারপাড় এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সড়কের পাশে পানি জমে থাকা জমিতে সারি সারি ভাসছে ধানের আঁটি। অথচ ধানগাছের আগার ছড়ায় সে পরিমাণ ধান চোখে পড়ছে না।একই জায়গায় পরদিন গিয়ে দেখা যায়, জমির পাশের আলের উপর আঁটিগুলো তুলে রাখা হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে সেগুলো আর সরানো যাচ্ছে না।আরেকটু সামনে তাকাতেই নজরে আসে অঝোর বৃষ্টিতে ফসলের মাঠে ভিজতে ভিজতেই ধান কাটছেন বেশ কয়েকজন কৃষক-শ্রমিক। পানি জমে ডুবতে থাকা ধান বাড়ি নেয়ার ভোগান্তির মাঝে শুরু হওয়া এ বৃষ্টিতাদের ফেলে দিয়েছে মহা বিপাকে। আর বৃষ্টিতে ভিজে-নেয়ে সোনালী ধান ঘরে তুলতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন কৃষক-শ্রমিক একসাথে। পাশেই উঁচু জমিতে জড়ো করা ধানের আঁটি তুলতে তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছেন এক কৃষাণী।কথা হয় জমির মালিক কৃষক আবদুল হালিমের সাথে। হতাশা জমানো কণ্ঠে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি জানালেন, গেল কয়েকদিন থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে ভোগান্তি নেমে এসেছে কৃষকদের মাঝেতিনি জানালেন, এখনো যাদের জমিতে ধান রয়েছে- তাদের পুরোটাই চলে যাচ্ছে ‘লসের খাতায়।’ তারপরও ভোগান্তি সয়ে এ ফসল ঘরে তোলার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন-‘মায়া লাগে, কতো কষ্ট করেছি এ ফসল ফলাতে! এখন লাভ-লস হিসেবের সময় নেই-ভালোবাসার ফসল ঘরে তোলাতেই শান্তি-স্বস্তি।’কই চিত্র দেখা গেছে, বুড়িচং উপজেলার রাজাপুর ও বাকশিমুল ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে। অনেক গ্রামে এখনো অর্ধেকেরও বেশি ফসল রয়ে গেছে কাটা-মাড়াই ও শুকানোর বাকি। তারা চেয়ে আছেন প্রকৃতির উপর। যদি আকাশের মেঘ কেটে সোনালী সূর্য হাসে; তবে সামান্য হলেও ভোগান্তি কমবে তাদের। সৃজিত ফসলে লাভ না হোক; অন্তত হিসেবের খাতায় লসের অঙ্ক কষতে হবে না কুমিল্লার এসব প্রান্তিক কৃষককে

সাইফুল //এসএমএইচ// ১০ই মে, ২০১৮ ইং ২৭শে বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Check Also

বিপদ জয় করে বিজয়ের দেশে ফিরে আসা

জার্নাল ডেস্ক : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’  সাক্ষাৎ বিপদ …

‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি’

জার্নাল ডেস্ক ‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি ‘।    এভাবেই নিজের হতাশার কথা  জানিয়েছেন বসনিয়ায় আটকে …