চট্টগ্রামে বেপরোয়া বিএমএ নেতারা চিকিৎসা সেবা মারাত্বক ভাবে ব্যাহত: জিম্মি সাধারণ মানুষ

সাব্বির আহমেদ,চট্টগ্রাম:

বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন(বিএমএ)নেতারা কি করেন এ প্রশ্ন এখন সকলের মূখে মূখে। আসলে তারা কি রোগীর চিকিৎসা সেবা দেন নাকি নেতাগিরি করেন? চিকিৎসা সেবার মহানব্রত নিয়ে তারা এ পেশায় আসলেও এখন এ সংগঠনে যোগ দিয়ে চিকিৎসকদের অনৈতিক কাজে সহযোগিতা দিচ্ছেন। জড়িয়ে পড়ছেন চিকিৎসা সেবার নামে ব্যবসা, টেন্ডারবাজি, ঠিকাদারীতে। কোন চিকিৎসক অন্যায় করলে ভুল চিকিৎসা দিলে এবং অবহেলা করে পার পেতে বা জবাবদিহিতার মূখোমুখি হলে অন্যায় ভাবে আন্দোলনের হুমকি দিয়ে তাদেরকে রক্ষা করছেন। যেখানে তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন সেখানে এখন অন্যায়কে পশ্রয় দিচ্ছেন। আবার অনেক চিকিৎসক এ সংগঠনের ব্যানারে এসে জড়িয়ে পড়ছেন নানা অপরাধে। এসব কারণে বিএমএ এখন পেশাজীবিদের আদর্শিক সংগঠনের পরিবর্তে দালালির সংগঠনে পরিনত হয়েছে। দিন দিন সাধারণ মানুষের আস্থা হারাচ্ছে এ সংগঠনটি।
চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজের অভিমত অর্থলোভী কিছু চিকিৎসক ও নেতার কারণে চট্টগ্রামের চিকিৎসা ব্যবস্থায় চলছে চরম নৈরাজ্য। সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্বসাশিত হাসপাতাল সহ সবখানে বিরাজ করছে নাজুক অবস্থা। যাদের কারণে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ রোগীরা।
সম্প্রতি সময়ে চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে ডাক্তারের অবহেলায় ও ভুল চিকিৎসায় সাংবাদিক কন্যা রাফিদা খান রাইফার মৃত্যূ ঘটনায় বিএমএ নেতাদের উদ্যোত্তপূর্ণ আচরন নিয়ে সাধারণ মানুষ আতংকিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে রাইফার মৃত্যূকে ঘিরে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে চট্টগ্রামে। ভুল চিকিৎসায় জড়িত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা করায় ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত চিকিৎসক সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ)র শীর্ষ নেতাদের রোষানলে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও।
ভুল চিকিৎসার দায়ে অভিযুক্ত চিকিৎসক ও দুই নার্সকে পুলিশ আটক করলেও বিএমএর শীর্ষ নেতারা চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেয়ার হুমকিসহ উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের ফোনের চাপে চিকিৎসক ও নার্সদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ।
সিএমপি’র চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, গত শুক্রবার রাতে সাংবাদিক রুবেল খানের শিশুকন্যা রাইফার মৃত্যূর পর থানায় মামলা করেন রুবেল খান। এ মামলায় নগরীর ম্যাক্স হাসপাতালের চিকিৎসক দেবাশীষ,নার্স শিউলি ও সুপারভাইজার মাকসুদুল হক ভুঁইয়াকে আটক করে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ভুল চিকিৎসায় শিশু রাইফার মৃত্যুর সত্যতা স্বীকারও করেন আটক চিকিৎসক ও নার্সরা। কিন্তু চিকিৎসক সংগঠন বিএমএর চট্টগ্রামের শীর্ষ কয়েকজন নেতা থানায় এসে আটক চিকিৎসক ও নার্সদের না ছাড়লে সকাল থেকে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেন। এমনকি প্রভাবশালী ব্যক্তির ফোনেও আসে তাদের ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ। ফলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে আটক চিকিৎসক ও নার্সদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। আর এ নিয়ে বিক্ষোভ করেন সাংবাদিকরা।
এর মাঝে ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটি শনিবার রাতে ম্যাক্স হাসপাতালে আসেন। ওই সময় সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে তদন্ত কমিটির বৈঠক চলাকালে বিএমএ নেতা মনোয়ারুল হক শামীম উদ্যতাপূর্ণ আচরণ করেন। ফলে বৈঠক বয়কট করে সাংবাদিক নেতারা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচিতে নামেন। ৩রা জুলাই মঙ্গলবার বিকালে নগরীর শহীদ মিনার চত্বরে রাইফা হত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের সবকটি সাংবাদিক সংগঠন সম্মিলিতভাবে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।
এদিকে তদন্ত কমিটিকে প্রভাবিত করতে ম্যাক্স হাসপাতালের সামনে বিএমএ নেতারাও সমাবেশ করেন। এতে বিএমএ নেতারা চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থার নিলে কঠোর হস্তে দমনের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দেন। এ সময় তারা প্রয়োজনে সাংবাদিকদের চিকিৎসা বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেন। সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএমএ নেতা মনোয়ারুল হক শামীম, ডা. ফয়সল ইকবাল প্রমুখ।
এর আগে ২০০৬ সালের অক্টোবরে সিএসসিআর হাসপাতালে ডা. রিদওয়ানা কাউসার তুষারের বাচ্চা প্রসব হয়। জন্ম গ্রহণ করার দুই ঘণ্টার মধ্যে বাচ্চাটিকে মৃত ঘোষণা করে ডেথ সার্টিফিকেট দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মৃত্যূ সনদ দিয়ে একটি প্যাকেটে করে ওই নবজাতককে দেয়া হয় মা ডা. রিদওয়ানা কাউসার তুষারের কাছে। প্যাকেট খুলে বাচ্চার মুখ দেখেই বিস্মিত হন তিনি। তিনি দেখতে পান বাচ্চা নড়াচড়া করছে। বিষয়টি দ্রুত হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসকদের জানান। কিন্তু তারা তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। এ অবস্থায় ডা. রিদওয়ানা কাউসার তুষার নিজেই বাচ্চাকে নিয়ে যখন চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালে। হাসপাতালের ওয়ার্মারে দেয়ার পর শরীর স্বাভাবিক হয়। তারপর সেখান থেকে নগরীর ম্যাক্স হাসপাতালে ওই বাচ্চাকে ভর্তি করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নবজাতককে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। অভিযোগ উঠে, ওই বাচ্চাটি মৃত্যূর পেছনে ম্যাক্স হাসপাতালের গাফেলতি ছিল। তবে বিএমএর শীর্ষ নেতাদের চাপের মুখে আর মুখ খোলেননি চিকিৎসক দম্পতি।
এর মাঝে গত ২০১১ সালের দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গর্ভকালীন চিকিৎসা নিতে এসে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যূবরণ করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুুল ইসলাম বিএসসির এক নিকটাত্মীয়। এ নিয়ে সংম্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা করা হলে বিএমএর নেতারা পুরো চট্টগ্রামে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেন। এর এক বছর পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় আরও এক নারীর মৃত্যূর ঘটনায় স্বজনরা ওই চিকিৎসককে মারধর করলে তার প্রতিবাদে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে আন্দোলনে নামেন বিএমএ নেতারা। ওই সময় হাজার হাজার রোগী চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত হয়ে নিদারুণ কষ্ট পায়।
এছাড়া গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রোগীকে দেখতে গিয়ে নারী চিকিৎসকের গাফিলতির প্রতিবাদ করায় বিএমএর শীর্ষ নেতাদের হাতে হেনস্তার শিকার হন চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যানর এহসানুল হক হায়দার বাবুল। ওই নারী চিকিৎসকের শ্লীলতাহানীর অভিযোগ এনে বাবুলকে আটক করে চরমভাবে অপমান করেন চিকিৎসকরা। পরে বিএমএ নেতাদের ইচ্ছা মোতাবেক মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান তিনি। এদিকে রাইফা মৃত্যূর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। তদন্ত কমিটির প্রধান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ম্যাক্স হাসপাতালে শুধু চিকিৎসা সেবায় অনিয়ম আছে তা নয়, হাসপাতাল পরিচালনায়ও ক্রুটি রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিএমডিসির কোনো অনুমোদন ছাড়াই চলছে হাসপাতালটি।

সাব্বির// এসএমএইচ//৯ই জুলাই, ২০১৮ ইং ২৫শে আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Check Also

বিপদ জয় করে বিজয়ের দেশে ফিরে আসা

জার্নাল ডেস্ক : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’  সাক্ষাৎ বিপদ …

‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি’

জার্নাল ডেস্ক ‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি ‘।    এভাবেই নিজের হতাশার কথা  জানিয়েছেন বসনিয়ায় আটকে …