চট্টগ্রামে সফল হচ্ছে না প্রশাসনের অভিযান প্রতিদিনই লাফিয়ে বাড়ছে নিত্যপণ্যের বাজার

চট্টগ্রাম ব্যূরো:

চট্টগ্রামে প্রশাসনের অভিযান ও কঠোর নজরদারী থাকা স্বত্বে নিত্যপণ্যে এবং ইফতারীতে ব্যবহৃত সামগ্রীর বাজার উর্ধ্বমূখী। কোন কিছুতেই অসাধু ব্যবসায়ীদের রোধ করা যাচ্ছেনা। বাজার মূল্য সহনীয় রাখতে প্রশাসনের উদ্যোগে প্রায়ই প্রতিদিনই চলছে অভিযান। এর পর ও একইচিত্র নগরীর সবকটি বাজারে। গত এক সাপ্তাহ ধরে নগরীর বিভিন্ন কাঁচা বাজার ও মুদি দোকানে গিয়ে প্রাসনের কর্মকর্তারা পণ্যের মূল্য তালিকা টাঙানোর নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসনের এমন তাগাদার পরেও মূল্য তালিকা টাঙানো দূরের কথা বরং, নানা অজুহাতে উল্টো বেড়েই যাচ্ছে নিত্যপণ্যের দাম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজান মাস আসলে আরবদেশ গুলোতে পণ্যের দাম ছাড় দেয়া হয়। অথচ আমাদের দেশে বিপরীত।এই মাসেই অসাধু ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের ঠকায় ও পকেট কাটে বেশি। রমজান শুরুর আগে প্রশাসন কিছু কিছু বাজারে অভিযান চালিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাজারের মূল্য পরিস্থিতির উন্নতি হয় না। ব্যবসায়ীরা কখনো বৃষ্টি, কখনো গরম, পন্য সংকট, সরবরাহ কম, আবার ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়া সহ নানা অজুহাত দিয়ে দাম বাড়াচ্ছেন। যেমন, কোনো কারণ ছাড়াই গত তিনদিনের ব্যবধানে পাইকারিতে প্রতিকেজি রসূনের দাম বেড়েছে ৩০ টাকা। আদার দাম বেড়েছে ৪০ টাকা।
নগরের বাজারগুলোতে ইফতার তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্যের দাম ও বেড়েছে। ধনে পাতা কেজিতে ৯০ টাকা, পুঁদিনা পাতা এক আঁটি ৪০, শসা ৭০, ও গাজর ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে । আবার তিনগুণ বেড়েছে কাঁচা মরিচের দাম। গত পাঁচদিনের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ২০ টাকার কাঁচা মরিচ এখন ৬০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারী ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট করে কাঁচা মরিচের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এছাড়া একইভাবে বাড়ছে বেগুনের দাম। গত তিনদিনের মধ্যে বেগুনের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। গতকাল খুচরা বাজারে বেগুন বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকা। অথচ তিনদিন আগে বেগুনের দর ছিলো ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। বাজারে বড় সাইজের এক হালি লেবু ৩০ টাকা, কাগজি লেবু এক হালি ২৫ টাকা ও ক্যাপসিক্যাম কেজিতে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে স্থিতিশীল রয়েছে চুলা, মটর,তেল, চিনি, ডাল ও পেঁয়াজের দাম। গত তিনদিনের ব্যবধানে মানভেদে ছোলার দাম কেজিতে ৬/৭ টাকা বেড়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে নিত্য বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম।
বিক্রেতাদের দাবি, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় দাম বেড়েছে। তবে দেখা গেছে ইফতারে ব্যবহৃত পণ্য ছাড়া বাকি পণ্যের দাম নাগালের মধ্যে রয়েছে। গতকাল সকালে নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজার, কাজিরদেউড়ী ও চকবাজার কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা গেছে এ চিত্র। বিক্রেতারা জানান, সরবরাহ কম হলে বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়বে। কারণ পাইকারী বাজারে যদি বাড়ে তাহলে খুচরা পর্যায়েও প্রভাব পড়ে। কাজির দেউড়ী বাজারে নুরুল আলম নামে এক দোকানী বলেন, ‘পাইকারী থেকে মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়তি বিক্রি করছি। ইফতারে ব্যবহৃত পণ্যের সরবরাহের চেয়ে চাহিদা বাড়ার কারণে দাম বেশি। সরবরাহ বাড়লে দাম কমবে।’
নগরীর ব্যাটারীগলি, রেয়াজউদ্দিন বাজার সহ কয়েকটি মুদির দোকানে গিয়ে দেখা, বর্তমানে মিয়ানমারের ছোলা বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ৭৫ টাকা, অস্ট্রেলিয়ান ছোলা ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই হিসেবে উভয় ক্যাটগরির ছোলাতে কেজিতে দাম বেড়েছে ৬ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে ৩৫ টাকা, রসূন ১০০ টাকা ও আদা বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকা প্রতি কেজি। এছাড়া চিনি ৫৫ টাকা, মশুর ডাল চিকন দানা ৯০ টাকা, মোটা দানা ৬০ টাকা ও খেসারি ডাল বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায়। এছাড়া বোতলজাত রূপাচাদা ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল ১ লিটার ১০৫ টাকা, ২ লিটার ২১০ টাকা, ৩ লিটার ৩১৫ টাকা এবং ৫ লিটার ৫২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জে পাইকারী বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অস্ট্রেলিয়ান ছোলা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬১ টাকা এবং মিয়ানমারের ছোলা ৬২ টাকা। এছাড়া খেসারি ডাল ৪৫ টাকা, মশুর ডাল বড় দানা ৪৮ টাকা ও চিকন দানা বিক্রি হচ্ছে ৭৫ টাকায়। এছাড়া প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৫২ টাকা দরে। এছাড়া পাইকারীতে বর্তমানে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩২ টাকা, রসূন বেড়ে ৭০ টাকা থেকে ১১০ টাকা এবং আদা ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজার করতে আসা ক্রেতা কলিম উল্লাহ বলেন, বাজারে পণ্যের দাম বুঝা বড় দায়! রোজাকে পূঁজি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা যে ভাবে দাম বাড়াচ্ছে তাতে রীতিমত হিমশীম খেতে হচ্ছে। মনে করছিলাম প্রশাসনের অভিযানে একটু কমবে। কিন্তু রোজার ৭ দিন পার হয়ে গেলে ও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। একইভাবে বাড়তির দিকে মুরগি ও মাংসের দাম। বাজারে ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে এখন ১৪৫ টাকা দামে। এছাড়া দেশি মুরগি কেজিতে ৭০ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ৪২০/৪৩০ টাকায়। একইভাবে ছাগলের মাংস ৫০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ টাকায়। গরুর মাংসও বেড়েছে কেজিতে ৫০ টাকা। বর্তমানে হাড়সহ ৫০০ টাকা কেজি এবং হাড়ছাড়া মাংস বিক্রি হচ্ছে ৬০০/৬৫০ টাকা দরে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ক্যাব) নেতাদের দাবি, রমজানকে কেন্দ্র করে অসাধু ব্যবসায়ীরা নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি করছেন। দেশে পেঁয়াজ– রসূনের আমদানি স্বাভাবিক রয়েছে, বুকিং রেটও বাড়েনি, তারপরেও ব্যবসায়ীরা কোনো কারণ ছাড়াই সিন্ডিকেট করে ইচ্ছেমাফিক দাম বাড়িয়ে যাচ্ছেন। প্রাসনকে খুচরা ও পাইকারি বাজরে মনিটরিং জোরদার করতে হবে। না হলে রমজানে কোনোভাবেই নিত্যপণ্যের উর্ধ্বমুখী প্রবণতা ঠেকানো যাবে না।
এছাড়া স্থিতিশীল রয়েছে চালের দাম। বর্তমানে স্বর্ণা সিদ্ধ ৪২ টাকা, পারি পাইজাম ৫০ টাকা, জিরাশাইল সিদ্ধ ৬২ টাকা, মিনিকেট আতপ ৫৪ টাকা, ভারতীয় বেতী ৪০ টাকা, চিনিগুড়া ৮৫ টাকা, নাজিরশাইল আধা সিদ্ধ ৬৮ টাকা, কাটারিভোগ আতপ ৬০/৬৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
রিদুয়ানুল হক নামে এক ক্রেতা জানান, প্রত্যেকটি দোকানে ক্রয় মূল্য ও বিক্রয় মূল্য তালিকা বাধ্যতামূলক করা হলেও এখনো পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা সেটি বাস্তবায়ন করছে না।
চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি সোলায়মান বাদশা বলেন, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা হঠাৎ করে রসূনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। তাই বর্তমানে বাজারে রসূনের সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া মহাসড়কে ওজন নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রভাবে ট্রাকে তিন টন পর্যন্ত পণ্য কম পরিবহন করা হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। দাম বাড়ার এটাও একটা কারণ।
এদিকে গতকাল নগরীর কাজীর দেউরি ও বেটারি গলি কাঁচাবাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাকা মিষ্টি কুমড়া কেজি প্রতি বিক্রি হচ্ছে ২০থেকে ৩০ টাকায়। এছাড়া কাঁচা মিষ্টি কুমড়া ৪০থেকে ৫০ টাকা, কচুর ছড়া ৪০ থেকে ৫০ টাকা, শসা ৭০ টাকা, আলু ৩৫থেকে ৪০ টাকা, তিতা করলা ৪০/৫০ টাকা, চিচিঙ্গা ৪০/৫০ টাকা, বেগুন ৫০/৬০ টাকা, পটল ৪০/৫০ টাকা, ঢেড়স ৩৫/৪০ টাকা, বরবটি ৫০/৬০ টাকা, দেশী টমেটো ৪০/৫০ টাকা, লাউ ৩০/৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কাজীর দেউরির সবজি বিক্রেতা মোহাম্মদ আলম জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে বাজারে সবজি সরবরাহ কমে গেছে। তাই কেজিপ্রতি সবজির দাম ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দামও স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
বেটারি গলি মাছ বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, দেশী শিং মাছ আকারভেদে বিক্রি হচ্ছে ৬০০/৭০০ টাকায়, কই ৪৫০/৫০০ টাকায়, মাগুর ৭০০/৮০০ টাকা, শৈল ৪০০/৫০০ টাকা, কাতাল ৩০০/৩২০ টাকা, রুই ৩৩০/৩৫০ টাকা, বোয়াল ৭০০/৮০০ টাকা, গলদা চিংড়ি আকারভেদে ৭০০/৮০০ টাকা, তেলাপিয়া ১২০/১৮০ টাকা, পাঙ্গাস ১৫০/২০০ টাকা, লইট্টা ১২০/১৮০ টাকা, কই ৩৮০/৪২০ টাকা, কেচকি ২০০/২৫০ টাকা, বাটা মাছ ৪৫০/৫০০ টাকা, কোরাল ৪৫০/৫০০ টাকা, রূপচাঁদা (সাদা) ৮০০/৯০০ টাকা, রূপচাঁদা (কালো) ৪০০/৫০০ টাকা এবং ইলিশ আকারভেদে ৭০০ থেকে হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মাছ বিক্রেতা আবুল কালাম বলেন, মাছের দাম তেমন বাড়েনি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তরাঞ্চল থেকে মাছ কম আসছে। তাই মিঠাপানির কিছু কিছু মাছ কেজিতে ৫০/৬০ টাকা পযন্ত— বেড়ে গেছে। তবে সামুদ্রিক মাছের দাম বাড়েনি।
উল্লেখ্য, গত ৩ মে জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে ব্যবসায়ীদের বৈঠকে জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, রমজানে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্বাভাবিক থাকবে। পণ্যের দাম বাড়বে না। ভেজাল পণ্য পাওয়া গেলে জরিমানা নয়, জেল হবে। এছাড়া গত ৫ মে নিত্যপণ্যের বাজার যাতে স্বাভাবিক থাকে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের সাথে মতবিনিময় করেন। মতবিনিময়ে ব্যবসায়ীরা নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে না বলে মেয়রকে আশস্ত করেন। মেয়র ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে তখন বলেন, নিত্যপণ্যের ক্রয় ও বিক্রয় মূল্য টাঙ্গাতে হবে। এছাড়া দাম বাড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।কিন্তু বাস্তবে কোন সূফল আসছেনা।
এছাড়া গতকাল বিকেলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে নগরীর কাজীর দেউরি বাজারে অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে তিনি দেখতে পান রেয়াজুদ্দিন বাজারের তুলনায় কাজীর দেউরি বাজারে পণ্যের দাম বেশি। এসময় তিনি জরিমানাও করেন তিনি।
অভিযান শেষে তিনি আরো বলেন, গরুর মাংস ও মুরগির দাম যাতে না বাড়ে সেজন্য বিক্রেতাদের সতর্ক করেছি। দাম যাতে সহনশীল থাকে সেটাও বলেছি। কেউ যদি আড়ত থেকে কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করে তাহলে আমরা অ্যাকশনে যাব।

 

Check Also

বিপদ জয় করে বিজয়ের দেশে ফিরে আসা

জার্নাল ডেস্ক : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’  সাক্ষাৎ বিপদ …

‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি’

জার্নাল ডেস্ক ‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি ‘।    এভাবেই নিজের হতাশার কথা  জানিয়েছেন বসনিয়ায় আটকে …