চট্টগ্রামে হারিয়ে গেছে ১৮ হাজার জলাধার

নাহিদ সেকান্দার:

২০০৬-০৭ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) সর্বশেষ জরিপ মতে চট্টগ্রামে চার হাজার ৫২৩টি পুকুর থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে আছে মাত্র হাজারখানেক। গত একযুগে পুকুর কমে দাঁড়িয়েছে এ সংখ্যায়। আর পুকুরের পানির অভাবে ক্রমেই বাড়ছে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি। চট্টগ্রামে গত ৩৪ বছরে হারিয়ে গেছে প্রায় ১৮ হাজার জলাধার।

তাছাড়াও এ জলাধারার অভাবে অগ্নিকান্ডের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না বললে চলে। যার একটি সর্বশেষ উদাহরণ হলো গত ২৪শে জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ থানার মির্জাপুল ডেকোরেশন গলির একটি বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পানির অভাবে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বস্তির ৩০০ ঘর। ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে কোটি টাকারও বেশি।

অভিযোগ আছে, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও জলাধার সংরক্ষনে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাই দায়ী। ফলে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় অসাধু ব্যক্তিরা নগরীর পুকুর, দীঘি ও জলাধার ভরাট করছে। আইন অমান্য করে ভরাট করা জায়গায় স্থাপনাও নির্মাণ করেছে। অনেক স্থানে নির্মাণ কাজ চালাচ্ছে। ফলে বর্তমানে নগরী প্রায় জলাধার শূন্য হয়ে পড়ছে।

২০০৬-০৭ সালের সর্বশেষ জরিপে নগরে পাওয়া যায় চার হাজার ৫২৩টি জলাধার। এর পর কোনো জরিপ চালানো হয়নি। ১৯৫২ সালের নির্মাণ আইন মেনে চলি। সে অনুযায়ী যা করার করে থাকি। দলিলে যদি পুকুর কিংবা জলাধার না থাকে তাহলে কিছু করার সুযোগ নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার পুকুর, দীঘি ও জলাশয় ছিল। ১৯৯১ সালে তা দুই হাজারে এসে ঠেকে। ১৯৯১ সালে জেলা মৎস্য বিভাগের জরিপ অনুযায়ী চট্টগ্রামে দীঘি বা জলাধারের সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার ২৫০টি। কিন্তু বর্তমানে আছে ১ হাজারেরও কম। তবে বর্তমানে কি পরিমাণ জলাশয় আছে এর কোনো সঠিক চিত্র সংশ্লিষ্ট কোন বিভাগের কাছেই নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন , প্রায় ১৫ হাজার জলাধার দখল ও ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনাসহ বহুতল ভবন। তবে দীর্ঘ ১৩ বছরে নগরীতে কী পরিমাণ জলাধার নিশ্চিহ্ন হয়েছে তার সঠিক তথ্য কারো কাছে নেই। প্রতিনিয়ত দীঘি ভরাট ও জলাশয় ধ্বংসের কারণে নগরীতে পানির উৎস কমে যাওয়ায় আগুন নেভানোর কাজ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডে দিন দিন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। পুকুর ভরাটের আগে ফায়ার সার্ভিস থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়ার নিয়ম থাকলেও কেউ তা নেন না বললেই চলে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের পরিচিত অধিকাংশ জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। এগুলো দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন। এক শ্রেণীর ভূমিদস্যুরাও নগরী ও গ্রামের অবশিষ্ট পুকুর ও জলাশয় ভরাটে তৎপর রয়েছে।

বিভিন্ন গবেষণা পত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে চট্টগ্রামে এক সময় যেসব দিঘী ছিল- দেওয়ান গৌরী শংকর দীঘি, লালদীঘি, হামজার দীঘি, টেক চাঁদের দীঘি, আমীর খাঁর দীঘি, শিব খাঁর দীঘি, হাজারীর দীঘি, এতিম শাহের দীঘি, খঞ্জর দীঘি, রানীর দীঘি, নুনু খাঁর দীঘি, শিব লালের দীঘি, মাজাবির দীঘি, মৌলভী পুকুর, আগ্রাবাদ ঢেবা, ভেলুয়ার দীঘি, জোড়া দীঘি এবং কমলদহ দীঘি।

এর মধ্যে ভরাট হয়ে গেছে আন্দরকিল্লার রাজা পুকুর, দেওয়ান বাজারের দেওয়ানজি পুকুর, নন্দনকানন রথের পুকুর, চান্দগাঁও মৌলভী পুকুর, ফিরিঙ্গি বাজার ধাম্ম পুকুর, বহদ্দারহাট এলাকার মাইল্যার পুকুর, চকবাজারের কমলদহ দীঘি, কাট্টলী সিডিএ এলাকার পদ্মপুকুর, উত্তর কাট্টলীর চৌধুরীর দীঘি।

ক্রমান্বয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে চান্দগাঁওয়ের মুন্সিপুকুর, আশকার দীঘি, আগ্রাবাদ ঢেবার দীঘিসহ নগরীর অসংখ্য পুকুর ও দীঘি। আশকারদীঘি ও ঢেবার দিঘীর অভ্যন্তরে ক্রমান্বয়ে ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে বস্তি। সে সাথে চকবাজার কে বি আমান আলী রোডের বড় মিয়া মসজিদ শত বছরের পুরনো। মসজিদের লাগোয়া রয়েছে অংশীদারী মালিকানার প্রায় ৫ কানি আয়তনের বিশাল দীঘি। মসজিদের পাশে হওয়ায় বড় মিয়া মসজিদ পুকুর নামে পরিচিত পুকুরটি মসজিদের সম্প্রসারণের নামে ভরাট করছে মসজিদ কমিটি। শ্রমিকরা বালি দিয়ে পুকুর ভরাটের কাজ করছে।

এছাড়া কোন জলাশয় বা পুকুর ভরাটের আগে ফায়ার সার্ভিসের অনাপত্তিপত্র নেওয়ার বিষয়ে জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ এ উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু তাও কেউ মানছেন না। আইন প্রয়োগেও তৎপর নয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরিবেশ অধিদপ্তরও নিয়মিত পানি পরীক্ষা করে তাদের দায়িত্ব শেষ করে।

এ প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স চট্টগ্রামের উপ-সহকারী পরিচালক মো.ফরিদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘’নগরীতে পানির উৎস কমে যাওয়ার কারণে আগুন নেভানোর কাজ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। দিন দিন ক্ষয়ক্ষতির পরিমান বাড়ছে। পুকুর ভরাটের আগে অনুমতি পত্র কেউ নেন না। আমাদের কাছে অভিযোগ আসলে আমরা তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি। এখন যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নেয় আমাদের কি করার আছে। আমাদের তো আর ফোর্স নেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো। ’

তাছাড়াও এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো মহানগরের পরিচালক মো: নুরল্লাহ নুরী বলেন, জলাধার ভরাটের বিষয়ে আমরা প্রচুর মামলা করেছি। অধিদপ্তরের আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সবরকম ব্যবস্থা করে থাকি। তবে আমাদের নজরে আসা সাপেক্ষে।

তিনি আরো বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ২০১০ (সংশোধিত) অনুযায়ী যেকোনো ধরনের জলাশয় ভরাট করা নিষিদ্ধ। পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ দূষণ, জলাশয় ভরাট করাসহ সব ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়মূলক কাজের বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছে। জলাশয় ভরাট করাসহ পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কাজের বিরুদ্ধে যেকোনো ব্যক্তি মামলা দায়ের করতে পারবে।

Check Also

বিপদ জয় করে বিজয়ের দেশে ফিরে আসা

জার্নাল ডেস্ক : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’  সাক্ষাৎ বিপদ …

‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি’

জার্নাল ডেস্ক ‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি ‘।    এভাবেই নিজের হতাশার কথা  জানিয়েছেন বসনিয়ায় আটকে …