চট্টগ্রাম সমুদ্র তীরবর্তী বঙ্গোপসাগরে বেপরোয়া জলদস্যূরা,আতংকে বোট মালিক ও জেলে পরিবার

সাব্বির আহমেদ,চট্টগ্রাম:

চট্টগ্রাম জেলার বঙ্গোপসাগর উপকূলের সন্বীপ, কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও সোনাদিয়া চ্যানেলের গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা রত ফিশিং ট্র্রলারে উদ্বেগ জনক হারে বেড়ে গেছে জলদস্যূদের তৎপরতা। ইলিশ ধরার মৌসুমকে কেন্দ্র করে জলদস্যুরা বেপরোয়া হয়ে উঠায় বোট মালিক ও জেলে পরিবারে আতংক বিরাজ করছে। সাগরে মাছ ধরার উপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে চলতি মাসের শুরুতে সাগরে গিয়ে জেলেরা জল দস্যূদের কবলে পড়ছেন। জলদস্যূরা অর্তর্কিত হামলা চালিয়ে জেলেদের জিম্মি করে মাছ সহ বোট নিয়ে চলে যাচ্ছে অজ্ঞাত স্থানে। সেখান থেকে মালিকদের খবর দিয়ে টাকা আদায় করছে।
জেলেদের সূত্রে জানাগেছে বঙ্গোপসাগরে এসব চ্যানেলে জলদস্যূরা মাছধরা ট্রলারে জেলেদের জিম্মি করে বোট প্রতি দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আদায় করছে। জেলেদের জীবন বাঁচাতে ও বোট ফিরে পেতে মালিকরা ডাকাতদের কাছে হাতে হাতে, কখনো মোবাইল ব্যাংকিং চ্যানেলে নগদ অর্থ পাঠাচ্ছেন। জেলেরা প্রতিনিয়ত ডাকাতদের হাতে নির্যাতনের শিকার হলেও ভয়ে বোট মালিকরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ডাকাতির অভিযোগ করছেন না।
জেলেরা জানান, চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাশঁখালী, সন্দ্বীপ, মহেশখালী, সোনাদিয়া, কুতুবদিয়া সহ বঙ্গোপসাগরের গভীর চ্যানেলে বিভিন্ন এলাকা থেকে জড়ো হওয়া জলদস্যূদের উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ায় সাগরের জেলেরা চরমভাবে আতংকে রয়েছে। যে কোন মুহুর্তে ঘটে যেতে পারে অপ্রতিকর ঘটনা।
গত ২৮ জুলাই দুপুর ২টার দিকে বঙ্গোপসাগরে ১৬ বিউ নামক স্থানে ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের এক ব্যক্তির মালিকানাধিন এফ, বি আল মদিনা নামক ফিশিং ট্রলারে জলদস্যূরা হামলা চালিয়ে ৫জনকে গুলিবিদ্ধও প্রায় ২০জনকে পিঠিয়ে আহত করেছে। আহত করার পর জেলেদের জিম্মি করে ফিশিং ট্রলারের সব সরঞ্জমাদি লুট এবং ২লক্ষ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছে। ঠিক এ ভাবে প্রতিনিয়ত বঙ্গোপসাগরে ঘটেই যাচ্ছে নানান ঘটনা। তারা বর্তমানে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
জেলেরা আরো জানান, নিয়মিত মাসোহারা দিতে অপারগ হলে পরবর্তিতে এই ট্রলার সাগরে আর মাছ ধরার জন্য যেতে পারেনা। তাদের অবাধ্য হওয়া কোন ফিশিং ট্রলার সাগরে মাছ শিকারে গেলে ট্র্রলারের ইঞ্জিন, জাল, আহরনকৃত মাছ, তৈল, বরফ, ব্যাটরী,টর্সলাইট ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি লুট করে নিয়ে যায়। মাঝে মাঝে খালি ট্রলারটি ফুটো করে সাগরে ডুবিয়ে দেয়।
ক্ষতিগ্রস্ত বোট মালিকরা জানান, বোট ও জেলেদের মুক্ত করতে কুতুবদিয়ার ধুরং বাজারে গিয়ে হাতে হাতে কিংবা কোনো বিকাশ একাউন্টে টাকা পাঠাতে হয়। ধুরং ও লেমশিখালি ডাকাতদের শক্ত ঘাঁটি। প্রশাসন ডাকাতদের নির্মূলে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলেও মনে করছেন বোট মালিকরা।
চট্টগ্রম ফিশিং বোট মালিক সভাপতি নুর হোসেন বলেন,সাগরে ইলিশ ধরার মৌসুমেই ফিশিং ট্রলারগুলো বেশির ভাগ ডাকাতের কবলে পড়ে। তাদের অভিযোগ চট্টগ্রামের আনোয়ারা ,বাশখালী ও কুতুবদিয়ার ৪টি প্রধান ডাকাত গ্রুপ সাগরে সক্রিয়। এদের অনেকগুলো শাখা গ্রুপ রয়েছে। এরা স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ‘বাহিনী’ হিসেবেও পরিচিত। এছাড়া মহেশখালী, সোনাদিয়ার ডাকাত গ্রুপগুলো বেশ সক্রিয়। তিনি বলেন প্রতি মাসে জেলা আইন শৃংখলা কমিটির সভায় এ ব্যাপাওে কথা হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়না।
মহেশখালী উপজেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আবু বক্কর ছিদ্দিক জানান, সাগরে জলদস্যুতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের জেলে পরিবার গুলো চরম ভাবে আতংকে দিনাতিপাত করছে তাই জলদস্যুতা বন্ধে কোস্টগার্ড সহ প্রশাসনের সার্বিক সহযোগীতা কামনা করছি কেননা মহেশখালীর বেশীর ভাগ লোকজন ফিশিং এর উপর নির্ভর করে।
জলদস্যুদের কবলে পড়া কুতুবদিয়ার এফ,বি মায়ের দোয়া ট্রলারের জেলে জামাল ফিরে এসে বলেন, তার সাথে জসিম উদ্দিন, মোসলেম উদ্দিন, শাহাব উদ্দিন, ওসমান গনি, মোঃ শওকত, ফজল করিম, জমির উদ্দিনের ট্রলারসহ ১২টি ট্রলার ও দেড় শতাধিক জেলেকে জিম্মি করে রাখে ডাকাত দল। সবাইকে মহেশখালী দ্বীপের ঘড়িভাঙা, সোনাদিয়া, জারীপাড়া খালের প্যারাবনের ভিতরে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করেছে তারা। গত এক সপ্তাহে জলদস্যুরা ১২টি ট্রলার থেকে জাল, মাছ, ডিজেলসহ প্রায় অর্ধ কোটি টাকার মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে। এ সময় জলদস্যুদের মারধরে নুর কালাম (২৮) আলম (২৫) আলাউদ্দিন (৩৯) সোহাগ মিয়াসহ(৩৪) ১৬ জন জেলে গুরুতর আহত হন। গত শনিবার ডাকাত দলের কবলে পড়া ফিশিং ট্রলারগুলোতে থাকা আহত জেলেদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে ট্রলার মালিক আফাজ উদ্দিন জানান।
কুতুবদিয়া ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন জানান, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত কুতুবদিয়া উপকূলের তালিকাভূক্ত অর্ধশত জলদস্যুকে আটক করেন কুতুবদিয়া থানা পুলিশ। বর্তমানে তাদের অনেকে মুক্তি পেয়ে আবারো সংঘঠিত হয়েছেন। তারা মহেশখালী, বাশঁখালী, পেকুয়া, আনোয়ারা, হাতিয়া, রায়পুর, লক্ষীপুর ও ভোলা উপকূলের তালিকাভূক্ত জলদস্যুদের সাথে হাত মিলিয়ে দলবদ্ধ হয়েছেন। বাঁশখালী ও মহেশখালী উপকূলের গহিন জঙ্গলে অবস্থান নিয়ে সুযোগ বুঝে কয়েকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে ট্রলারে হামলা চালাচ্ছেন তারা।
চট্টগ্রাম ফিশিং বোট মালিক সমিতির অফিস সেক্রেটারী সাব্বির আহমদ বলেন, প্রায় প্রতিদিনই মহেষখালী-কুতুবদিয়া চ্যানেলে ফিশিং ট্রলারে ডাকাতি হচ্ছে। কুতুবদিয়ার উত্তর ধুরুং, মহেষখালী ও বাঁশখালী এলাকার সংজ্ঞবদ্ধ একটি সক্রিয় ডাকাত গ্রুপ বঙ্গোপসাগরের চ্যানেলে প্রতিনিয়ত ডাকাতি করে যাচ্ছে। প্রশাসনের নিরবতার সূযোগে তারা দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন গত একমাসে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা রত অন্তত ৪০টি ফিসিং বোট ডাকাতির শিকার হয়েছে। জলদ্যূরা বোট মালিকদের ফোন করে মুক্তিপণের টাকা দাবি করে। কোস্টগার্ড-র‌্যাবকে জানালে মাঝিমাল্লাদের হত্যা করারও হুমকি দেয় তারা। তিনি বলেন জলদস্যূরা অর্তকিত হানা দিয়ে বোটের মাজি মাল্লাদের জিম্মী করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। সেখান থেকে মালিকদের কাছে ফোন করে ১লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তি পন আদায় করে। পরে মাছ না মেরেই বোট গুলো ডাঙ্গায় ফেরৎ আসে। এতে প্রতি বোটে মালিকের দুই লাখ টাকার বেশী ক্ষতি হয়। কারন তারা সাগরে যাওয়ার সময় মাজি মাল্লাদের খাদ্য, ওষুধ, তৈল,বরফ এসব নিয়ে সাগরে যায়। আবার অনেককে দিতে হয় পরিবারের জন্য অগ্রিম টাকা। এরকম ২০০-২৫০ বোট চট্টগ্রামওে ফিসারী ঘাট থেকে সাগরে মাছ ধরতে যায়। তিনি আরো বলেন জলদস্যূরা সাগরে ডাকাতি করলেও থাকে ডাঙ্গায়। তারা কারো না কারো আত্বীয়্ জনপ্রতিনিধিরা চাইলে সকলের সমন্ধয়ের মাধ্যমে তাদের দমন করতে পারে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎসজীবি জেলে সমিতি কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি আশরাফ আলী বলেন বঙ্গোপসাগরের সোনাদিয়া চ্যানেলের ১০ বিউ থেকে দুই দিন আগে ১৮ মাজি মাল্লা সহ চকরিয়ার কামাল বহদ্দারের একটি ফিশিং বোট জল দস্যূরা অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। তাদেও এখনো কোন খোজ খবর নেই।
এদিকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎসজীবি জেলে সমিতি চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি শ্রী কৃঞ্চ ধর জলদাশ জানান সাগরে যে ভাবে জলদস্যূদের তৎপরতা বেড়ে গেছে তাতে মনে হয় কোন জেলেরই নিরাপত্তা নেই। সাগরে প্রতিনিয়ত ডাকাতি হলেও সংশ্লিষ্ট কোতোয়ালী, কর্ণফূলী, বাকলিয়া ও পতেঙ্গা থানা, কুতুবদিয়া থানা ডাকাতির মামলা নিতে চায়না। তিনি নৌবাহিনী ও কোষ্ট গার্ডের নিয়মিত টহল জোরদার করার আহব্বান জানান।
এ ব্যাপারে কুতুবদিয়া থানার অফিসার ইঁনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ দিদারুল ফেরদাউস বলেন, কুতুবদিয়া উপকূলের তালিকাভুক্ত শতাধিক জলদস্যুকে আটক করা হয়েছে। বতর্মানে অন্যান্য উপকূলের জলদস্যুরা জড়ো হয়ে ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে ডাকাতি করছেন। এ ব্যাপারে কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর সহায়তা প্রয়োজন।
আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুলাল মাহমুদ জানান সাগরে ডাকাতি রোধে আনোয়ারা উপকুলে প্রতিদিন অভিযান চালানো হচ্ছে। এর ফলে জলদস্যূদের তৎপরতা অনেকাটা কমে গেছে। বেশ কয়েকজন জলদস্যূদের গ্রেফতারকরা হয়েছে। কিন্তু বোট মালিকরা এ ব্যাপারে এগিয়ে না আসায় প্রশাসনও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।
বাংলাদেশ জাতীয় মৎসজীবি সমতিরি উপ মহা-ব্যবস্থাপক আমির হোসেন বলেন সাগরে জেলেদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আমরা সবসময় প্রশাসন, নৌবাহিনী, কোষ্টগার্ডকে অবহিত করে আসছি। আমার চেষ্টা চালাচ্ছি জলদস্যূদেও কবল থেকে জেলেদের রক্ষা করতে।
এব্যাপারে কোষ্টগার্ড পূর্বজোন জানান সাগরে মাছ ধরা রত ট্রলারে জেলেদের নিরাপত্তায় সার্বক্ষনিক টহল জোরদার রয়েছে।

সাব্বির// এসএমএইচ//১৭ই আগস্ট, ২০১৮ ইং ২রা ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Check Also

বিপদ জয় করে বিজয়ের দেশে ফিরে আসা

জার্নাল ডেস্ক : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’  সাক্ষাৎ বিপদ …

‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি’

জার্নাল ডেস্ক ‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি ‘।    এভাবেই নিজের হতাশার কথা  জানিয়েছেন বসনিয়ায় আটকে …