তাসফিয়া হত্যাকান্ড :ময়না তদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় পুলিশ

চট্টগ্রাম ব্যূরো:

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত থেকে উদ্ধার হওয়া সানশাইন স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী তাসফিয়া আমিনের হত্যাকান্ড নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। জানা গেছে, তাসফিয়া আমিনকে হত্যার আগে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন করা হয়েছে। তবে এ হত্যাকান্ডের কূল-কিনারা করতে পারছে না পুলিশ। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে গত বৃহস্পতিবার সকালে তাসফিয়ার লাশের ময়না তদন্ত হয়।
এ ঘটনায় তাসফিয়ার বন্ধু আদনান মির্জাও মুখ খুলছে না। বৃহস্পতিবার সকালে আদনানকে প্রধান আসামি করে মামলা করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়ার আবেদন জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে তাসফিয়ার বাবা মামলায় ছয়জনের নাম উল্লেখসহ আরও ৫-৬ জন নাম না জানা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় আদনানকে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হল- সোহাইল (১৬), শওকত মিরাজ (১৬), আসিফ মিজান (২৩), ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম (২৪) ও ফিরোজ (৩০)। তাদের মধ্যে ফিরোজ নগরীর শীর্ষ সন্ত্রাসী।
তার বিরুদ্ধে পাঁচলাইশসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। কয়েক মাস আগে সে অস্ত্রসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে শেভরন নামে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডাকাতি মামলা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু সালেম মোহাম্মদ নোমানের আদালতে আদনানকে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। আদালত রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানির জন্য রোববার দিন ধার্য করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এর আগে আদনানকে গত বুধবার রাতে খুলশির জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটির ‘রয়েল পার্ক’ ভবন থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আদনানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি জব্দ করা হয়েছে। আদনান পুলিশকে জানায়, তাসফিয়াকে বাসা থেকে ফোনে ডেকে নিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে গিয়েছিল। আবার বাসায় ফেরার জন্য তাকে সে অটোরিকশাও ঠিক করে দিয়েছিল। এরপর কি হয়েছে তা সে জানে না।
কিন্তু পুলিশ ও তাসফিয়ার পরিবার আদনানের এমন বক্তব্য বিশ্বাস করতে পারছে না। পরিবারের অভিযোগ, বন্ধুত্ব ও প্রেমের নামে তাসফিয়ার সঙ্গে প্রতারণা করেছে আদনান। পরিকল্পিতভাবে তাকে সন্ত্রাসী গ্রুপের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন ও হত্যার পর লাশ পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে ফেলে দেয়া হয়েছে।
সিএমপির কর্ণফুলী জোনের সহকারী কমিশনার জাহেদুল ইসলাম জানান, আদনানের কাছ থেকে জানা গেছে, তার সঙ্গে তাসফিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল।
ঘটনার দিন অনেক রাত পর্যন্ত তাসফিয়ার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আদনান ছিল। এছাড়াও সমুদ্র সৈকত এলাকায় তাসফিয়াকে একা পাথরের ওপর বসা দেখেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এসব তথ্য এখন আমরা ‘ক্রস চেক’ করে দেখছি।
তাসফিয়ার বাবা মো. আমিন বলেন, ‘আমার ফুটফুটে মেয়েকে আদনান পূর্বপরিকল্পনা করে খুন করেছে। আমার মেয়ের কোনো দোষ নেই। আদনানের সঙ্গে নগরীর একাধিক অপরাধী চক্রের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। আমার মেয়েকে ডেকে নিয়ে সে তাদের হাতে তুলে দিয়েছে।’ তাসফিয়াকে গণধর্ষণের পর হত্যা করেছে পাষন্ডরা। ধর্ষণ শেষে হত্যা করে লাশটি ফেলে দেয়া হয় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের উপকূলে। এমনটাই দাবি করেছেন তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন।
তিনি বলেন, বুধবার রাতে আদনানের কয়েকজন বন্ধু তাকে থানায় যেতে বাধা দেয়। এ সময় তারা ফিরোজ নামে তাদের এক ‘বড়ভাইয়ের’ কাছে নিয়ে যায়। ফিরোজ তাকে জানায়, আপনার মেয়ে ১ ঘণ্টার মধ্যে আপনার বাসায় চলে যাবে। আপনি বাসায় চলে যান। তখন তিনি থানায় না গিয়ে বাসায় চলে যান। আদনান ও তার সহযোগীরা এসব করেছে। জড়িতদের গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেন সন্তানহারা হতভাগ্য এই বাবা।
জানা গেছে, ঘটনার দিন যে রেস্টুরেন্টে তারা গিয়েছিল সেই রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তাসফিয়াকে তুলে দেয় আদনান।
এ সময় ওই অটোরিকশায় আরও দুই ছেলে আগে থেকেই বসা ছিল। তারা কারা। তাদের ধরতে পারলে হত্যা রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হবে। এছাড়া পরিবারের প্রশ্ন চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্ট থেকে তাসফিয়ার বাসা হাঁটা দূরত্বে।
এ দূরত্বে যাওয়ার জন্য সিএনজি অটোরিকশার প্রয়োজন পড়ে না। হেঁটে অথবা বড় জোর রিকশা নিয়ে যাওয়া যায়। অথচ আদনান বলছে তাসফিয়াকে রেস্টুরেন্ট থেকে নামার পর বাসায় যাওয়ার জন্য অটোরিকশায় তুলে দিয়েছে সে।
আদনান-তাসফিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ভালোভাবে নেয়নি তাসফিয়ার পরিবার। তাই আদনানকে ডেকে শাসায় তারা। আর এটাকে ভালোভাবে নেয়নি আদনানও।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, শাসানোর ‘প্রতিশোধ’ নিতেই তাসফিয়াকে নিজের গ্রুপের সদস্যদের হাতে তুলে দেয় আদনান।
সূত্রটি আরও জানায়, তাসফিয়াকে যে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে দেয় আদনান সেই অটোরিকশার পেছনেই ছিল দুটি মোটরসাইকেলে চার যুবক। এ চার যুবক আদনানের পরিচালিত ‘রিচ কিডস গ্রুপে’র সদস্য।
উল্লেখ্য, গত বুধবার সকালে পতেঙ্গায় অজ্ঞাত তরুণীর লাশ উদ্ধার হওয়ার খবর পাওয়ার পর তাসফিয়ার বাবা-চাচারা পতেঙ্গা থানায় যান। সেখানে গিয়েই তারা দেখতে পান তাসফিয়ার লাশ। সকালে সৈকতের ১৮ নম্বর ব্রিজের উত্তরপাশে পাথরের ওপর তরুণীর মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। তারা পুলিশকে খবর দেয়।
তাসফিয়া আমিনদের গ্রামের বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফের ডেইলপাড়া এলাকায়। তার পরিবার নগরীর ওআর নিজাম আবাসিক এলাকার তিন নম্বর সড়কের কেআরএস ভবনে থাকে।
তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন জানান,‘আমার ফুটফুটে মেয়েটারে কিভাবে মেরে দিলো! আমি আগেই জানতাম ছেলেটা সুবিধার না। তাই শাসন করেছিলাম আমার মেয়ের সাথে মিশতে। আর সেই আমার মেয়েরে এতো নির্যাতিত হয়ে মরতে হলো। না জানি কি কি ঘটেছিলো আমার মেয়ের সাথে। আমার ছোট্ট মেয়েটা সেটা কিভাবে সহ্য করেছে। আমার মেয়েটা আর নেই আমাদের মধ্যে। বাবা হিসেবে এখন আমি মনে করি, মেয়েটারে সঠিক বিচার পাইয়ে দিতে হবে। আর নয়তো দুনিয়ার সকল বাবারা অপরাধী হয়ে থাকবে তাসপিয়ার কাছে।’‘আমার মেয়েটারে আমি ফোন দিয়ে বাসায় আসতে বলি সেদিন সন্ধায়। কিভাবে জানবো, মেয়ে আমার লাশ হয়ে ফিরবে।’ বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তাসফিয়ার মা নাইমা।
এদিকে গত বুধবার তাসফিয়ার লাশ উদ্ধারের পর সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেছেন সিএমপি পতেঙ্গা থানার উপপরিদর্শক আনোয়ার। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই কিশোরীর পিঠ, বুক ও স্পর্শকাতর অঙ্গসহ সব স্থানেই দেখা গেছে ভয়াবহ নির্যাতনের ছাপ। নিহতের হাতের ও পায়েরনখগুলো উপড়ানো ও নীল বর্ণের ছিল। তাসফিয়া আমিনকে হত্যার আগে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন করা হয়েছে। তার সারা শরীরে মারধরের চিহ্ন রয়েছে। ডান চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে। বাম চোখেও ছিল মারাত্মক জখম। নাক, ঠোঁট ও মুখমন্ডল ছিল থেঁতলানো ও রক্তাক্ত। দুই হাঁটুর নিচে ছিল কালো দাগ। হত্যার আগে তাকে টানা-হেঁচড়াও করা হয়েছে। তবে এ হত্যাকান্ডের কূল-কিনারা করতে পারছে না পুলিশ।
এদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাসফিয়ার ময়না তদন্তে অংশ নেন ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সুমন মুর্শিদীর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি টিম। দীর্ঘ এক ঘণ্টা সময় নিয়ে ময়নাতদন্ত শেষে দুপুর দেড়টায় তারা লাশকাটা ঘর থেকে বের হন।
এ বিষয়ে জানতে তিনি বলেন, ‘ভিসেরা ও সিআইডি রিপোর্ট পাওয়ার আগে কিছু বলা যাচ্ছে না। এই দুই রিপোর্ট পাওয়ার পরই বিস্তারিত জানানো যাবে।’রিচকিডস গ্যাং কি বা কারা রয়েছে এর শীর্ষে?
পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কাশেম ভূইয়া বলেন, আদনান মির্জাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে আদালতে। ওসি আরো জানান, বুধবার দিনগত মধ্যরাতে নগরীর দক্ষিণ খুলশীর জালালাবাদ আবাসিক এলাকা থেকে আদনান মির্জাকে আটক করা হয়। জব্দ করা হয়েছে মোবাইল ফোন সেট। তার মোবাইলের কললিস্ট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য অ্যাপসের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদানের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অন্যান্য আসামীদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তবে ময়না তদন্তের রিপোর্ট পাওয়া গেলে সব জানাযাবে।
এদিকে, গ্যাংস্টার ‘রিচ কিডস’-এর চার যুবক, দুই বড় ভাই ও অটোরিকশার চালককে নিয়ে চলছে নানান গুঞ্জন। তাসফিয়া হত্যাকান্ডের দিন এরাই মূলত আদনানের সহযোগী হিসেবে এগিয়ে আসে বলে ধারণা করেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, শাসানোর ‘প্রতিশোধ’ নিতেই তাসফিয়াকে নিজের গ্রুপের সদস্যদের হাতে তুলে দেয় আদনান।
মঙ্গলবার রাত ১০টায় আদনানকে আটকের পর পরই তাসফিয়াদের বাসায় হাজির হন পুলিশের তালিকাভুক্ত চিহ্নিত সন্ত্রাসী দুই বড়ভাই ফিরোজ ও আকরাম। আদনানকে ছেড়ে দিতে সময় বেঁধে দেন তারা।
বুধবার সন্ধ্যায় আদনান গ্রেফতার হওয়ার পর পরই সেই দুই বড়ভাইও এখন নিরুদ্দেশ। ধোঁয়াশায় রয়ে গেছে ‘চায়না গ্রিল’ রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে তাসফিয়াকে নিয়ে যাওয়া সেই অটোরিকশা এবং এর চালকের বিষয়টি।
এদিকে নগরীর পাঁচলাইশস্থ সানশাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সাফিয়া গাজী রহমান বলেন ‘স্কুলছাত্রী তাসফিয়া আমিনের অস্বাভাবিক মৃত্যূ মেনে নেওয়া কঠিন। গত জানুয়ারী মাসে সে আমাদের স্কুলে নবম শ্রেণীতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়। অল্পদিনেই সকলের মাঝে পরিচিতি লাভ করে। সে ছিল শিক্ষকদের বাধ্য ছাত্রী। এ ধরনের ঘটনা কল্পনারও অতীত। দেশের আর কোনো মেয়েকে ওর ভাগ্য বরণ করতে দেব না। এর জন্য সবার সহযোগিতা চাই।’
তিনি বলেন, তাসফিয়ার ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। আমরা অনেক কষ্ট পেয়েছি। মানববন্ধন করেছি প্রার্থনা করেছি। আমার একটি স্টুডেন্ট হারালাম।
স্কুলের নিয়ম-কানুন তুলে ধরে অধ্যক্ষ বলেন, আমাদের রুটিন আছে। শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং করার জন্য মনোবিজ্ঞানী আসেন লন্ডন থেকে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চারটি কাউন্সেলিং হয়েছে। তাসফিয়া আমিনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তিরদাবি জানান তিনি।
এদিকে তাসফিয়া হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পতেঙ্গা থানার এস আই আনোয়ার হোসেনের সাথে মোটোফোনে বারবার যোগাযোগ করা হলে ও তিনি ফোন রিসিভ না করাতে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।###

Check Also

বিপদ জয় করে বিজয়ের দেশে ফিরে আসা

জার্নাল ডেস্ক : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’  সাক্ষাৎ বিপদ …

‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি’

জার্নাল ডেস্ক ‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি ‘।    এভাবেই নিজের হতাশার কথা  জানিয়েছেন বসনিয়ায় আটকে …