দুই দিনের ভারী বর্ষণে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের আশঙ্কা: ফের নগরীর নিম্নাঞ্চল জলমগ্ন

চট্টগ্রাম ব্যূরো:

গত রবিবার সকাল থেকে গতকাল সোমবার দুপুর পর্যন্ত দুদিন ধরে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় বন্দর নগরী চট্টগ্রাম ফের জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। মাঝারী থেকে ভারী বৃষ্টি কারণে একদিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অন্য দিকে নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ধসের আশঙ্কা ও দেখা দিয়েছে। এতে পাহাড়ের পাদদেশে বাসবাসকারী নিম্ম আয়ের মানুষরা মৃত্যূ ঝুকির আতঙ্কে রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয় সুত্রে জানাগেছে ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসে দুর্ঘটনা ঠেকাতে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় গত রবিবার সকাল থেকে নগরীর বাটালি হিল, মিয়ার পাহাড়. একে খান ও আমিনজুট মিল এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মাইকিং করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির রহমান সানি জানান, প্রশাসনের নির্দেশনায় মাইকিং করে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরতদের সরে যেতে বলা হয়েছে। যেহেতু ভারী বর্ষণ হচ্ছে, সেহেতু পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। যেকোন দুর্ঘটনা ঠেকাতে আগাম প্রস্ততি হিসেবে তাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে।’
সুত্রমতে নগরীর লালখান বাজার, মতিঝর্না, হামজারবাগ নবীনগর পাহাড়, বার্মা কলোনি পাহাড়, এনায়েত বাজার জামতলা বস্তি, পলোগ্রাউন্ড পাহাড়, বাটালী হিল, জিলাপী পাহাড়, নাসিরাবাদ পাহাড়, এ কে খান পাহাড়, চন্দ্রনগর পাহাড়, রউফাবাদ পাহাড়, কুসুমবাগ, জালালাবাদ, সেনানিবাস, বায়েজিদ বোস্তামী, বন গবেষনাগারের পেছনে, খুলশী, ষোলশহর, ফৌজদারহাট, কুমিরাসহ বিভিন্ন এলাকায় চট্টগ্রামের অধিকাংশ পাহাড়ে বৈধ কিংবা অবৈধভাবে শতাধিক বস্তি গড়ে উঠেছে। এসব এলাকায় প্রায় ৩ লাখ লোক বাস করে বলে বিভিন্ন সংস্থার জরিপে জানা গেছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জানান, চট্টগ্রাম নগরীর ছোট-বড় ১৩টি পাহাড় চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ইতোমধ্যে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করে পানি ও বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।
বার বার মাইকিং করে তাদেরকে সরে যাবার জন্য নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড় ধসসহ যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে জেলা প্রশাসন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সসহ স্বেচ্ছাসেবী ও উদ্ধারকর্মীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. মমিনুর রশিদ জানান, চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজারের মতিঝর্ণা এলাকার পাহাড়সমূহকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়েছে। কিছুদিন পূর্বে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে অবৈধ বসতি স্থাপন করা বসবাসকারীদের সরিয়ে নিয়েছিল জেলা প্রশাসন। কিন্তু অভিযানের পর আবারও সেখানে ফিরে এসেছে অধিকাংশ লোকজন। প্রশাসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী নগরীর ১৩টি ঝুঁকিপুর্ণ পাহাড় ও টিলার মধ্যে ১১টিতে সবচেয়ে বেশি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে।
লালখান বাজারের মতিঝর্ণা এবং বাঘঘোনা এলাকা ছাড়াও পাহাড়তলীর একে খান শিল্প গোষ্ঠীর পাহাড়, লেকসিটি পাহাড়, কৈবল্যধাম বিশ্বকলোনি, আকবর শাহ আবাসিক এলাকার পাহাড়, সিটি করপোরেশনের পাহাড়, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট একাডেমি পাহাড়, জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটি সংলগ্ন পাহাড়, বাটালি হিল পাহাড়, এবং নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা সংলগ্ন পাহাড় ও ফয়’স লেক পাহাড়ে প্রায় সাড়ে ৪ শত পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে।
প্রসঙ্গত, বিগত ১০ বছরে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার পাহাড় ধসে অন্তত দুই শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। শুধু ২০০৭ সালের ২১ জুন নগরীর সেনানিবাস সংলগ্ন কাইচ্ছা গোনাসহ সাতটি এলাকায় পাহাড় ধস ও জলাবদ্ধতায় ১২৭ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি আরও উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর ও ঘণীভূত হয়ে মৌসুমে নিম্নচাপে রূপ নিয়েছে। নিম্নচাপটি আরও উত্তর, উত্তর-পূর্ব দিক থেকে অগ্রসর হয়ে গত রবিবার দিনগত মধ্যরাতের দিকে সন্দীপের ওপর দিয়ে বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম করেছে।
এদিকে সাগরে অবস্থানরত নিম্নচাপের প্রভাবে গত রবিবার সকাল থেকে গতকাল বিকাল পর্যন্ত ভারী বর্ষণ হয়েছে চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায়। এতে নগরের নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ। সরজমিনে দেখাগেছে, নগরীর প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, ২ নম্বর গেট, হালিশহরসহ প্রায় এলাকা মধ্যরাতে পানিতে তলিয়ে ছিল।
গতকাল দুপুরে বৃষ্টির চাপ আরও বেড়ে যাওয়ায় নগরের নিম্নাঞ্চল হাঁটু থেকে কোমর সমান পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনায় পড়তে হয় ঈদের বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতাদের। বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার কারণে তীব্র যানজটেরও সৃষ্টি হয়।
নগরের চকবাজার বাজারের দোকানদার নাসির উদ্দিন জানান, ভারী বর্ষণে পুরো চকবাজার এলাকা ডুবে যায়। সন্ধ্যার দিকে হাঁটু সমান পানি হলেও রাত ৮টার পর কোমর পরিমাণ পানি জমে যায়।
লাগাতার বৃষ্টিতে বাকলিয়া, আগ্রাবাদ, হালিশহর এলাকায় বেশিরভাগ বাসার নিচ তলা তলিয়ে যায়। ফলে এসব এলাকার বাসিন্দাদেরকে নিদারুণ দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
বাদুরতলা এলাকার গৃহিনী হেলেনা বেগম মানবকন্ঠকে বলেন, নিচ পানি ওঠে যাওয়ায় খাট পানিতে ডুবে যায়। সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। কাপড়সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আলমারির উপর রাখতে হয়েছে।
রাত দেড়টার দিকে লঘুচাপটি সন্দ্বীপের উপকূল দিয়ে চরে যাওয়ার সময় সেখানে প্রচন্ড দমকা হাওয়া বয়ে যায়। এতে অসংখ্য ঘর বাড়ি গাছ পালা ভেঙ্গে গেছে।

সাব্বির// এসএমএইচ//১১ই জুন, ২০১৮ ইং ২৮শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Check Also

বিপদ জয় করে বিজয়ের দেশে ফিরে আসা

জার্নাল ডেস্ক : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’  সাক্ষাৎ বিপদ …

‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি’

জার্নাল ডেস্ক ‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি ‘।    এভাবেই নিজের হতাশার কথা  জানিয়েছেন বসনিয়ায় আটকে …