দুই যুগেও পাহাড়ে ফিরেনি শান্তি,প্রতিনিয়ত গুলিবিনময়ের ঘটনা ঘটছে পাহাড়ে

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি

পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের ২৪ বছর অতিক্রান্ত হলেও পাহাড়ে এখনো শান্তি ফিরে আসেনি। সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির জেএসএস ও ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ইউপিডিএফের মধ্যে অস্ত্র বিরতীর যে চুক্তি হয়েছে তা ভেঙ্গে যাওয়ায় রাঙ্গামাটির দুর্গম এলাকা গুলোতে আবারো অস্তির হয়ে পড়েছে আঞ্চলিক দল দুটো।

গত ৫ দিনে দুই দফা বন্দুক যুদ্ধের ঘটনায় ৯ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সংগঠন গুলোর মুখপাত্র গুলো বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ও হতাহাতের ঘটনার বর্ণনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাড়িয়ে দিয়েছে। অস্থিতিশীল এই পাহাড়ী জনপদ গুলোর সাধারণ মানুষ নিজ নিজ বাড়ী ভিটা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

প্রতিনিয়ত পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম এলাকা গুলোতে আধিপত্য বিস্তারকে নিয়ে চলতে আঞ্চলিক দল গুলোর মহড়া। পার্বত্য অঞ্চলের ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তি চুক্তির স্বাক্ষর হয় সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাথে। কিন্তু সময়ের বিবর্তণে এসে ১ টি দলকে ভেঙ্গে নতুন সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমেক্রেটিক ফ্রন্ট ইউপিডিএফ গঠন হয়। এর পর থেকে ক্রামান্বয়ে পাহাড়ে আরো ৪ টি আঞ্চলিক দল জন্ম নেয় পাহাড়ে। বর্তমানে পাহাড়ে ৬ টি আঞ্চলিক দল প্রতিনিয়ত অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে।

পাহাড়ে আঞ্চলিক দল গুলোর নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে নিরীহ মানুষের উপর প্রভাব পড়ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ পেতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন পাহাড়ের সাধারণ মানুষ।
গত ২৬ আগষ্ট ভোর রাত ৫ টা থেকে রাঙ্গামাটি বাঘাইছড়ি উপজেলার বঙ্গলতলী ইউনিয়নের উত্তর জারুলছড়ি দুলুবনিয়া এলাকায় পাহাড়ি আঞ্চলিক দুই সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও জনসংহতি সমিতি

(জেএসএস) এর মধ্যে ভয়াবহ বন্দুক যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে। এতে উভয় পক্ষই শত শত রাউন্ড গুলি বিনিময় করে। স্থানীয়দের বরাত দিয়ে উভয় পক্ষের ৩ সদস্য নিহতের সংবাদ ছড়িয়ে পরলেও। ঘটনা স্থল দূর্গম হওয়ায় নিরপেক্ষ ভাবে নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তবে ৩ জনের মধ্যে ২ জনের লাশ সংগঠনের সদস্যরা নিয়ে যেতে দেখা গেছে। স্থানীয় গ্রামবাসীরা তা নিশ্চিত করেছে।

এছাড়া গত ২৩ তারিখ সন্ধ্যায় লংগদু উপজেলায় জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে ৬ জন নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লেও ১ জন শ্যামল চাকমার মৃত্যু খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। পাহাড়ের এই সংগঠন গুলো অস্থির হয়ে উঠায় নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে পার্বত্য অঞ্চলের আইন শৃঙ্খলা বানিহী সহ সকল প্রশাসনকে।

এদিকে পাহাড়ে বিবদমান ৬ টি উপজাতীয় সশ্রস্ত্র গ্রুপের মধ্যে ভ্রাত্বঘাতি সংঘাত কখনো পাহাড়ী বাঙালী দাঙ্গায় প্রতিনিয়ত রক্তে লাল হচ্ছে সবুজ পাহাড়। চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে চলছে চুক্তি স্বাক্ষরকারী সংগঠন আওয়ামীলীগ এবং জনসংহতি সমিতির মধ্যে পরস্পর বিরোধী অবস্থান। চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার জন্য চুক্তি পক্ষ জনসংহতি সমিতি সরকারকে দোষারোপ করলেও সরকারীদল বলছে চুক্তি পক্ষের অসহযোগিতার জন্য চুক্তি বাস্তবায়ন ধীরগতিতে এগুচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পর রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলায় গত ২ যুগে একটি সংস্থার পরিসংখ্যানের হিসেবে মতে সেনা সদস্য সহ ১ হাজারের অধিক মানুষ নিহত হয়েছে। অসংখ্যবার গোলাগুলি, অপহরণ, নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে বন্দুক যুদ্ধ হয়েছে। তবে মুল জেএসএস ও ইউপিডিএফের দাবি, অধিকার আদায়ের নামে স্থানীয় প্রশাসনের মদদে সংস্কার গ্রুপগুলো জেএসএস ও ইউপিডিএফ কর্মীদের বাসায় গিয়ে গুলি করে হত্যা করছে। আঞ্চলিক দল গুলোর প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে উপজেলা আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা। জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, কাপ্তাই, বাঘাইছড়ি সহ বিভিন্ন উপজেলায় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের হত্যার মাধ্যমে পাহাড়ের আওয়ামীলীগের রাজনীতির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে আঞ্চলিক দল গুলো।

সবশেষে গত জুলাই মাসে রাঙ্গামাটি বিলাইছড়ি উপজেলার দুর্গম বড়থলিতে আঞ্চলিক বন্দুকযুদ্ধে ৩ জন নিহত হয়েছে শিশু সহ আহত হয়েছে ২ জন। এদিকে গতবছর ১৭ সেপ্টম্বর রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে চিৎমরম ইউনিয়ন পরিষদের আওয়ামীলীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী নেথোয়াই মারমাকে (৫৬), ২৩ নভেম্বর বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে আওয়ামীলীগের সদস্য উথোয়াইনু মারমা (৪২) এবং ৩০ নভেম্বর রাঙামাটির বন্দুকভাঙ্গায় জেএসএস সদস্য আবিস্কারক চাকমাকে (৩৮) গুলি করে হত্যা করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও প্রতিপক্ষের ওপর হামলার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। কখনো ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী কখনো বা বাঙালি অধিবাসীর তরতাজা প্রাণ ক্ষয়ে যাচ্ছে।

১৯৯৭ সনে ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন মুল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ভেঙ্গে প্রথমে পুর্ণস্বায়ত্বশাসনের দাবি আদায়ে গঠিত হয় ইউনাইটেড পিপলস অব ডেমোক্রটিকস ফ্রন্ট ইউপিডিএফ। ২০০৭ সনে ওয়ান এলেভেনের সরকারের সময় জেএসএস ভেঙ্গে গঠিত হয় জেএসজেএস এমএন লারমা গ্রুপ, এর কিছুদিন পর মুল ইউপিডিএফ ভেঙ্গে গঠিত হয় ইউপিডিএফ সংস্কার। এই চারটি গ্রুপের আধিপত্যে বিস্তারের লড়াইয়ে প্রতিনিয়ত প্রাণ যাচ্ছে কারো না কারো। পরে ২০১৮ সালের শেষের দিকে নতুন মগ পার্টি নামে আরেকটি সংগঠনর জন্ম নেন।

অপরদিকে ২০২২ সারে কুকিচিন ন্যাশণাল ফ্রন্ট নামে আরেকটি সংগঠনের জন্ম হয় পাহাড়ে। সংগঠন গুলোর কাছে ভারী ভারী মরনাস্ত্র সহ গোলাবারুদ মজুদ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সুত্র নিশ্চিত করেছে।
এদিকে ১৯৯৭ সনে পার্বত্য চুক্তির আলোকে গঠন করা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, শরণার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্স, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি কমিশন, পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯ (রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯, বান্দরবান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯) এবং এর বিভিন্ন ধারা সমূহের পরিবর্তন, সংশোধন, সংযোজন করা হয়। এর বাইরে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মূল্যায়ন কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহায়তাকারী উপদেষ্টা কমিটি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া চুক্তি অনুযায়ী জেলা পরিষদগুলোতে ৩০টি বিভাগ হস্তান্তর করা হয়।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা বলেন, সরকার পার্বত্য চুক্তি নিয়ে তালবাহনা করার কারণে পার্বত্য শান্তি চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পার্বত্য ভূমি সমস্যা সহ বিভিন্ন, পুলিশ সহ বেশ কিছু চুক্তি এখনো বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না সরকার। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি চুক্তি বাস্তবায়নের সরকারের স্বদ্ধিচ্ছা না থাকার কথা উল্লেখ করেন।

অপরদিকে খাদ্য মন্ত্রনালয় সম্পর্তিক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দীপংকর তালুকদার জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভায় বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। অন্যান্য ধারা গুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াধীন। পার্বত্য অঞ্চলের চুক্তি বাস্তবায়নের মুল কারণ হচ্ছে সরকারকে অসহযোগিতা করা। আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমা চুক্তি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে না।

আমরা কখনো বলি নাই শান্তি চুক্তি পুনাঙ্গ বান্তবায়ন হয়েছে, এটি প্রক্রিয়াধীন বিষয়। দুই যুগেও পার্বত্য চুক্তি পুনাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া অপামাদের জন্য কষ্টের। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক হলেও চুক্তি স্বাক্ষকারীরা চুক্তি বিরোধীদের সাথে হাত মিলিয়েছে। তিনি চুক্তি বাস্তবায়নে সহযোগিতা না করে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। পাহাড়ের শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের নামে তারা সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজী সহ বিভিন্ন অপর্কম করছে। পাহাড়ের প্রতিটি এলাকায় আধিপত্যে বিস্তারের লড়াইয়ে নিরীহ জনগনকে হত্যা করছে।

তারা পাহাড়ে আওয়ামীলীগের রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে দিয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নের নামে আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীকে হত্যা করছে। তিনি বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসাে পাহাড়ে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু আঞ্চলিক দল গুলো উন্নয়ন কাজ গুলোতে চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে উন্নয়ন কাজে বাধা গ্রস্থ করছে বলে অভিযোগ করেন দীপংকর তালুকদার।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশেসিং এমপি জানান, পাহাড়ে সব প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে পাহাড়ে অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে, চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮ ধারা বাস্তবায়ন হয়েছে। অস্ত্র আর হুমকি দিয়ে চুক্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করতে হবে। পাহাড়ে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে, কারণ সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজি উন্নয়নের পথে বড় অন্তরায়।

Check Also

চন্দনাইশে ইয়াবা ট্যাবলেটসহ আটক ১

জার্নাল ডেস্ক চন্দনাইশে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ইয়াবাপাচারকারী এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। …

প্যারিস ফ্যাশন উইকে দীপিকার বাজিমাত

বিনোদন ডেস্ক এ বছর প্যারিস ফ্যাশন সপ্তাহের তৃতীয় দিনে বাজিমাত করেছেন দীপিকা পাড়ুকোন। ‘লুই ভিতোঁ’র …