নওগাঁয় বিল মনসুর খাল খননের নামে কোটি টাকা হরিলুট

নওগাঁ প্রতিনিধি:

নওগাঁ সদর উপজেলায় সরকারি ৯শ’ বিঘা আয়তনের বিল মনসুরে খাল/খাড়ী খননে বরেন্দ্র বহুমূখী উন্নয়ন প্রকল্প রিজিওয়ন-১ (বিএমডিএ) ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের যোগসাজসে কোটি টাকা হরিলুুটের অভিযোগ উঠেছে। এলাকার প্রভাশালীদের দখলে থাকা প্রায় ৫শ’ বিঘা জমি দখল মুক্ত উদ্ধারের কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এ নিয়ে এলাকাবাসিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের কাছে দখলে থাকা জমি দখলমুক্ত ও হরিলুট বন্ধ করে সুষ্ঠুভাবে খনন কাজ সম্পন্ন করার দাবি জানানো হয়েছে।

বিএমডিএ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে ভূ-গর্ভস্থ পানির মাধ্যমে সেচ সম্প্রসারণ ও জলাবদ্ধ দূরীকরণ নামে একটি প্রকল্প তৈরি করে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। ওই বছরই প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়। প্রকল্পটি তিনটি বাস্তবায়ন করতে ব্যায় ধরা হয় মোট ২ কোটি ৫৪ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬৫ টাকা।

প্রকল্পগুলো হলো- বগুড়ার সান্তাহারের মো: সোহেল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নওগাঁ সদর এলাকায় গয়াপাড়া থেকে বিলপাকুড়িয়া পর্যন্ত ব্যয় ৭২ লাখ ৬৮ হাজার ৭৩১ টাকা, রাজশাহীর মেসার্স ডামবল এন্টারপ্রাইজ গয়াপাড়া থেকে বিল পাকুড়িয়া পর্যন্ত ব্যয় ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ২৯৯ টাকা এবং রাজশাহীর মো: মতিন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান গয়াপাড়া থেকে নলমারা পর্যন্ত ব্যয় ১ কোটি ১৫ লাখ ৯৬ হাজার ৬৩৫ টাকা কাজ পায়। তিনটি প্রকল্পে কাজের পরিমান মোট ৭ কিলোমিটার।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ওই তিনটি প্রকল্পে তিনটি সাইনবোর্ডে বিল ধরা হয়েছে ১০ হাজার টাকা করে ৩০ হাজার টাকা। স্থান ভেদে বিল খননের প্রস্থতা শূণ্য থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত। প্রয়োজন অনুসারে মাটির উপরিভাগ শূণ্য থেকে প্রস্থতা ২০ মিটার এবং ৪০ মিটার পর্যন্ত। বিলের সাবেক তলদেশ থেকে কমপক্ষে ৩ ফুট থেকে ক্ষেত্র বিশেষে ১২ ফুট গভীর করে খনন করতে হবে। এছাড়া খালের পাড়ে ড্রেসিং ও লেভেলিং এর কাজ যথাযথ ভাবে সম্পন্ন করতে হবে এবং সম্পন্নকৃত অংশে ঘাস লাগাতে হবে। টেন্ডারের মধ্যেমে তিনটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান খননের মধ্যেমে গত বছরের আগষ্ট মাস থেকে খাল/খাড়ী খনন শুরু করে।

স্থানীদের অভিযোগ, ওই তিনটি প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদাররা বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তার যোগসাজশে এক-তৃতীয়াংশে সাব-লীজ দিয়েছে। এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে দুই ভাগ ঠিকাদার ও বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তার ভাগ বাটোয়ার করে নিয়েছে। ওই তিনটি প্রকল্পে কোন সাইন বোর্ড নেই। খাল/খাড়ী খনন মাটির উপরি ভাগে মাত্র ২ ফুট থেকে তিন ফুট পর্যন্ত গভীরতা করা হয়েছে। বিল মনসুরে খাস জমি ৯শ’ বিঘা আয়তনের। খাড়ী খননের সরকারি নিয়ম থাকলেও তা অমান্য করে বিলের ৪শ’ বিঘা জমি চারদিক দিয়ে মাটি ফেলে পুকুর করা হচ্ছে। প্রভাবশালীদের সাথে বিএমডিএ কর্মকর্তাদের যোগসাজসে খালকে পুকুর তৈরী করে লীজের নামে টাকা লুটপাট করার জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। খনন কাজ সম্পন্ন না করেই প্রকল্পের সম্পন্ন হয়েছে দেখিয়ে লুটপাট করা হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।

এলাকাবাসি সূত্রে জানা গেছে, এই বিল থেকে এলাকার প্রায় ১৫টি গ্রামের সাধারণ মানুষ ও মৎস্যজীবীরা মাছ সংগ্রহ করে থাকেন। এই মাছ দিয়ে সাধারণ মানুষরা তাদের আমিষের চাহিদা পূরণ করে থাকেন। এ দিকে এলাকায় বসবাসরত শতশত মৎস্যজীবীরা মাছ সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে পরিবারের খরচ জোগাতেন। দীর্ঘ দিন থকে বিলের চারপাশ দিয়ে ভরাট হওয়া প্রায় ৫শ’ বিঘা জমি এলাকার প্রভাবশালীরা দখলে নেন। বিলটি দখলমুক্ত করার জন্যে এলাকার মৎস্যজীবী ও সাধারন মানুষরা স্থানীয় প্রশাসনকে জানালেও অজ্ঞাত কারণে দখল মুক্ত করতে প্রশাসন উদ্যোগ নেয়নি বলে অভিযোগ করেন।

পাকুড়িয়া গ্রামের মুমিনুল হক, গয়াপাড়া গ্রামের তোরিকুল ইসলাম, কয়াপাড়া গ্রামের কাশেম আকন্দ, জুয়েলসহ অনেকেই বলেন, এই বিলে এলাকার প্রায় ১৫টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ মাছ ধরে বাড়ির আমিষের চাহিদা মেটাতো। পাশাপাশি এলাকার শতশত মৎস্যজীবীরা মাছ ধরে সংসারের খরচ জোগাতেন। বিএমডিএ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালীদের যোগসাজসে বিলে খাল খননের নামে চারশ’ বিঘা জমিতে পুকুর তৈরী করছে। পুকুর তৈরীর মূল উদ্দেশ্য হলো এখন থেকে লীজের নামে টাকা হরিলুট করা। অপর দিকে সাধারন মানুষদের আবাদি জমির পাকাধানের উপর দিয়ে মাটি ফেলে খাল খনন করা হচ্ছে। এতে ৪০/৫০টি গরীব পরিবার সর্বশান্ত হয়েছেন। এছাড়া প্রভাবশালীদের দখলে থাকা প্রায় ৫শ’ বিঘা জমি খনন করছে না।

গায়েরপাড়া গ্রামের সাবু, রেজাইল ইসলাম, মতিউর রহমান বলেন, বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে প্রয়োজন অনুসারে খালের ৩ ফুট থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত গভীর করে খনন কাজ করার কথা। অথচ মাত্র আড়াই থেকে তিন ফুট গভীর করে খনন করা হচ্ছে। এর ফলে সরকারের বরাদ্দ বেশির ভাগ টাকা লুটপাট করে নিচ্ছেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো ও বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। দ্রুত উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে সঠিকভাবে খাল খনন এবং সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার করার দাবি জানান।

এ ব্যাপারে তিন ঠিকারদাদের মধ্যে মো: সোহেল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদার রাজা বলেন, কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। তবে তেমন কোন তথ্য দিতে পারেনি। মো: সোহেল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান থেকে সাব লীজ নেয়া কামরুল হাসান সোহাগ বলেন, কাজ ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে।

রাজশাহীর মোঃ মতিন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার আইয়ুব হোসেন বলেন, বিল মনসুরে কাজ দেখাশুনা করেন তিনি। কাজে কোন রকম অনিয়ম হয়নি। কি পরিমান কাজ হয়েছে অফিশিয়াল ভাবে মাপজোক হয়নি তবে তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বৃষ্টির কারনে কাজ বন্ধ আছে।

রাজশাহীর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ডামবেল এন্টারপ্রাইজের স্বত্তাধিকারী ইকবাল হোসেনের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নওগাঁর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মজিবর রহমান বলেন, বিল মনসুর বিলে খননের কাজ বৃষ্টির কারনে বন্ধ আছে। অপর প্রশ্নে তিনি বলেন, কি পরিমান কাজ হয়েছে মাপজোক করা হয়নি। তবে আনুমানিক ৭০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নওগাঁ সদর উপজেলার সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রয়োজন অনুসারে ৩ ফুট থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত গভীরতা করার নিয়ম। প্রকল্পের প্রায় ৯০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। অপর প্রশ্নে তিনি বলেন, উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এ ব্যাপারে কোন কথা বলা যাবে না।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নওগাঁ জোন-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল হক বলেন, প্রকল্পে কোন অনিয়ম হচ্ছে না। সঠিক ভাবে কাজ সম্পন্ন হচ্ছে।
নওগাঁ জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান বলেন, এ প্রকল্পের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত অনিয়মের অভিযোগ পাইনি। তবে বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সাইফুল//এসএমএইচ//৪ঠা মে২০১৮ ইং ২১শে বৈশাখ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

 

Check Also

বিপদ জয় করে বিজয়ের দেশে ফিরে আসা

জার্নাল ডেস্ক : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’  সাক্ষাৎ বিপদ …

‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি’

জার্নাল ডেস্ক ‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি ‘।    এভাবেই নিজের হতাশার কথা  জানিয়েছেন বসনিয়ায় আটকে …