নিউট্রিনো এক রহস্যময় কণা

-হাসান আহমদ

এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে  অনেক  রহস্যময় অজানা পদার্থ রয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম হল নিউট্রিনো। এই কণাকে ভুতুড়ে কণা ghost particle বলে ও অভিহিত করা হয়। এই কণা স্রোতের  মত অবিরাম গতিতে বয়ে চলেছে। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি কণার স্রোত আলোর গতিতে ছুটে বেড়ায়। সামনে যত বাধাই আসুক না কেন তা ভেদ করে চলে যায়। পৃথিবীর মতো বিশাল একটা বস্তুু ও এর জন্য কোন বাধাই নয়।

চলার পথে মানুষের শরীর ভেদ করে চলে যায় কিন্তু মানুষ বুঝতে পারেনা। অনুভব করতে ও পারেনা। তা হলে কণাটা আছে, এইটা বুঝব কী করে ? বিজ্ঞানীরাই বা মানবেন কেন ? বিজ্ঞানীরা তো প্রথমে মানতেই চাননি। আবার না মেনে উপায় ও ছিলনা। অথচ সেই কণা নাকি ট্টিলিয়ন ট্টিলিয়ন তৈরি হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে !

এক অবিশ্বাস্য কর্মকাণ্ড। সেই কণার কিছু তৈরি হয়েছে মহাবিশ্ব সৃষ্টির মুহূর্তে- বিগ ব্যাংগের সময়ে, কিছু সৃষ্টি হয়েছে সুপার নোভার বিস্ফোরণ থেকে আবার কিছু পরমাণর তেজস্ক্রিয়তা ক্ষয়ের সময়ে।

মানব দেহে পটাশিয়ামের আইসোটোপের ক্ষয়ের সময়ে ও প্রতি সেকেন্ডে পাচঁ হাজারের ও বেশি এই কণা তৈরি হয়। কিন্তু তাদের ধরা বড়ই কঠিন কাজ। এটি পরমাণুর চেয়ে ও ছোট কণা , যার ভর প্রায় শূন্য এবং বলতে গেলে অন্য কোন কিছুর সঙ্গে এর মিথস্ক্রিয়া ঘটেনা।

এ কারণে এদেরকে নিয়ে গবেষণা করা প্রায় দুঃসাধ্য। এ কণার অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রথম আলোচনা হয় ১৯৩০ সালে। অস্ট্র্রিয়ান বিজ্ঞানী উলফগাং পাাউলি, “পাউলির অপবর্জন নীতি” নামে একটা বিখ্যাত সূত্র আছে পদার্থ বিজ্ঞানে। সূত্রটা তাঁরই আবিস্কার। এই পাউলিই সর্বপ্রথম নিউট্রিনো কণার ভবিষ্যৎ বাণী করেন। তবে এর পিছনে আরেকজনের অবদান আছে। তিনি আরেক পদার্থ বিজ্ঞানী নীলস বোর, থাকতেন ডেনমার্ক রাজধানী কোপেন হেগেনে।

১৯২৯ সাল, বিখ্যাত বনে গেছেন তাঁর পরমানু মডেলের কারণে। বোর একটা পরামর্শ  চেয়ে চিঠি লিখলেন পাউলিকে। পাউলি বোরের চেয়ে ১৫ বছরের ছোট। তাছাড়া ততদিনে নোবেল প্রাাইজ পেয়ে গেছেন বোর। তবু ও ২৯ বছর বয়সী জুনিয়র বিজ্ঞানীর কাছে পরার্মশ কেন? কারন পাউলি স্পষ্ট বক্তা হিসাবে বিখ্যাত।

কোন বিজ্ঞানীর তত্ত্ব ঠিক মনে না হলে সরাসরি বলে ফেলতেন তার বক্তব্য। তাঁর কটুু মন্তব্যের কারণে ভয় পেতেন অনেক নাম করা বিজ্ঞানী ও। এজন্য বোর তাঁর তত্ত্ব পরীক্ষা করতে পাঠিয়েছিলেন পাউলির কাাছে।

পাউলি বোবের ধারনার সাথে একমত হতে পারেননি। জবাবে লিখেছিলেন, “ বিকিরণ বিষয়ে আপনার ধারনা মোটে ও সন্তোষজনক নয়। আপাতত আপনার ধারণা ঘুুমিয়ে থাকুক আর নক্ষত্ররা আলো দিক শান্তিতে—–। বোরের মুখের উপর এমন জবাব দেওয়ার সাহস তখন অনেক ডাক সাইটের বিজ্ঞানীর ও ছিলনা।

কী এমন বলেছিলেন বোর ? আমরা জানি তেজস্ক্রিয় পদার্থসমূহ তিন ধরনের রশ্মি বিকিরণ করে। যেমন আলফা, বিটা ও গামা রশ্মি। আলফা ও গামা রশ্মির ক্ষয়ে কোন সমস্যা দেখা যায়না। ভর- শক্তির নিত্যতা বজায় থাকে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল বিটা রশ্মি বিকিরণের সময়। যে সব পরমাণু বিটা রশ্মি বিকিরণ করে তাদের ক্ষেত্রে ভর- শক্তির নিত্যতা সূত্রের লঙ্গন দেখা গেল।

যেমন ট্টিটিয়ামের কথাই ধরা যাক। ট্টিটিয়াম হলো দুটো প্রোটন ও একটা নিউট্টন যুক্ত হাইড্রোজেনের তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াস। স্বাভাবিক হাইড্রোজেনে শুধুমাত্র একটি প্রোটন থাকে কোন নিউট্টন থাকেনা। ট্টিটিয়াম নিউক্লিয়াসে থাকে দুটি নিউট্টন ও একটি প্রোটন। ট্টিটিয়াম বিটা রশ্মি নিঃসরণ করে হিলিয়াম নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়। আর বিটা রশ্মি ইলেকট্টনের ভর ও বেগ নিয়ে ছিটকে চলে যায়। ফলে কিছুটা কমে যায় ট্টিটিয়ামের ভর- শক্তি। ট্টিটিয়ামের হারানো ভর শক্তি নিউক্লিম থেকে ছুটে বেরিয়ে যাওয়া ইলেকট্টনের ভর শক্তির সমান হওয়া উচিত। কিন্তু হিসাব করে দেখা গেল বিটা রশ্মির ইলেকট্টনের ভর শক্তি কিছুটা কম। তা হলে বাকি ভর শক্তি গেল কোথায় ?

বিজ্ঞানীরা অনেক মাথা খাটিয়ে ও এর সমাধান বের করতে পারেননি। তখন নীলস বোর প্রস্তার করলেন, পরমাণুর অভ্যন্তরে চিরায়ত পদার্থ বিজ্ঞানের অনেক সূত্রই খাটোনা। এ কারনে জম্ম হয়েছিল কোয়ান্টাম মেকানিস্কের। বোবের মতে হারিয়ে যাওযা ভর শক্তির ব্যাখা না পাওয়ার অর্থ ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র কাজ করছেনা এখানে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে আমাদের নিত্যতা সূত্র পরিহার করতে হবে, পারমানবিক বস্তু গুলোর ক্ষেত্রে। আর এই প্রস্তাব টাই তিনি জানিয়েছিলেন পাউলিকে লেখা চিঠিতে।

পাউলি একটু অন্যভাবে ভাবতে শুরু করলেন। ভাবলেন হারানো ভয় টুকু নিশ্চয় অন্য কোন অদৃশ্য কণায় পরিণত হয়। কী সেই কণা ? কণাটার অস্তিত্বই বা ধরা পড়েনা কেন? পাউলি সেই কণার নাম দিলেন নিউট্টিনো যাহার কোন চার্জ নেই।

এই কণাকে ধরার জন্য জাপানে এবং কানাডায় গভীর মাটির নীচে ২টি ডিটেকটর বসানো হয়েছিল। যেখানে মিলছে বয়ে চলা নিউট্টিনোর রূপান্তরের প্রমাণ । এ রহস্য পূর্ণ কণা নিয়ে গবেষণা করে জাপানের তাকাকি কাজিতা ও কানাডার আর্থার ম্যাক ডোনান্ড। এই কণার রহস্য ভেদ আবিস্কারের জন্য ২০১৫ সালে এই দুই বিজ্ঞানীকে নোবেল পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করা হয়।

প্রতিবেদক
সাবেক পরিদর্শক
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক
খাতুনগঞ্জ শাখা।

 

Check Also

ইন্দোনেশিয়ায় ফুটবল মাঠে সংঘর্ষ: নিহত বেড়ে ১৭৪

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ইন্দোনেশিয়ার ফুটবল খেলায় জয়-পরাজয় নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৭৪ জন নিহত হয়েছেন। …

কাউন্সিলর সালেহ আহমদ চৌধুরীর উদ্যোগে ২৪ ঘন্টা নাগরিক সেবা

জার্নাল ডেস্ক নাগরিক সেবা প্রদানে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন ৪১ নং দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর …