বন্দর নগরী চট্টগ্রাম : সমৃদ্ধি ও সম্ভাবনা

এম এম খালেদ, চট্টগ্রাম

বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। দেশের অর্থনেতিক সমৃদ্ধির স্বপ্নদ্বার। চট্টগ্রামকে দেশের লাইফ লাইন বললেও অত্যুক্তি হবে না।

কারণ চট্টগ্রাম বাঁচলে দেশ বাঁচবে। অর্থনীতির সমস্ত পাইপলাইনগুলো চট্টগ্রামকে ঘিরেই রচিত। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তাই চট্টগ্রামের ভাগ্যোন্নয়নের দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন নিজ হাতেই।

চট্টগ্রামের জীবন যাত্রা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিপুল অঙ্কের অর্থ অনুমোদন দিয়েছেন। মূলত তিনি নিজেই অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করছেন চট্টগ্রামের জন্য। বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামকে ঘিরেই আজকের এ আয়োজন।

চট্টগ্রাম বন্দর : দেশের সিংহভাগ আমদানি রপ্তানি হয়ে তাকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে উপার্জিত অর্থ দেশের চাহিদার একটি বড় অংশের যোগানদাতা । অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের অর্থনেতিক চাকাকে সচল রাখার পাশাপাশি দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখছে চট্টগ্রাম বন্দর। ভারতের সেভেন সিস্টার খ্যাত পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো চট্টগ্রামকে বন্দরকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। এতে ভারতের যেমন অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে তেমনি বাংলাদেশও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে।চট্টগ্রাম হয়ে ওঠছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সিল্ক রোড। অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ব্যবসা বাণিজ্যে চট্টগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। চীন ভারত জাপান বাংলাদেশের গুরুত্বপুর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার হয়ে ওঠেছে। এর অন্যতম কারণ বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনার স্বপ্নদ্বার বন্দর নগরী চট্টগ্রাম।

ব্লু ইকোনমি : বঙ্গোপসাগরের এক বিশাল অংশ জুড়ে আছে চট্টগ্রামের সাথে। মৎস্য সম্পদ আহরণ ও রপ্তানি করে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। সমুদ্রের ওপর আমাদের বৈধ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেক আগেই। বিশ্বের দরবারে আমাদের কতৃত্ব আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি যোগ্যতর দেশ হিসেবে।

ইপিজেড : রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল রয়েছে বেশ কয়েকটি। সিইপিজেড, কর্ণফুলি ইপিজেড ও কেইপিজেড। মিরসরাইয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে অর্থনেতিক জোন। এ সব কারখানায় সম্পৃক্ত রয়েছে এ অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠি। এদের অধিকাংশই নারী। যারা তাদের শ্রম দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক শক্তিকে গতিশীল রেখেছে। এ কারখানাগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দেশের বেকারত্ব দূর করেছে অনেকাংশে।

বাণিজ্যিক হাব

ভৌগলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম বিশ্বের অন্যতম গতিশীল ও বেগবান দুইটি অর্থনৈতিক অঞ্চল যথা সার্ক্ (SAARC) এবং আসিয়ান (ASEAN)-এর সংযোগ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের অফুরান সম্ভাবনা বিদ্যমান। অধিকন্তু, প্রস্তাবিত ট্রান্স এশিয়ান হাইওয়ে এবং রেলওয়ে’র সাথে চট্টগ্রামের সরাসরি সংযোগ বিদ্যমান। ফলে, ভবিষ্যতে চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক সমুদ্র, বিমান, রেল ও সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে যেটা SAARC এবং ASEANঅঞ্চলসহ বিশ্বের অন্যান্য অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাথে ব্যবসা-কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাবে।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

চট্টগ্রাম আমাদের দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী এবং এর মধ্য দিয়েই সঞ্চালিত হয় দেশের অর্থনৈতিক জীবনীশক্তি। দেশের সর্বমোট রপ্তানী বাণিজ্যের প্রায় ৭৫ ভাগ সংঘটিত হয় চট্টগ্রামের উপর দিয়ে। অন্যদিকে আমদানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ হার ৮০ ভাগ। রাজস্ব আয়েও চট্টগ্রামের ভুমিকা অপরিসীম। আমাদের মোট রাজস্ব আয়ের শতকরা ৬০ ভাগ আসে চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে।

 বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র, চট্টগ্রাম

বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র ধারণাটি বহির্বিশ্বে ব্যপক জনপ্রিয়। এটা অনেকটা ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মত যেখানে একই ভবনের ভিতরে সব ধরনের ব্যবসায়িক সুবিধা সরবরাহ করা হয় যার মাধ্যমে একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয়। প্রথম বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স অঙ্গরাজ্যে ১৯৪৩ সালে। বর্তমান বিশ্বের ১০০ টি দেশে প্রায় ৩০০ টি এরকম বাণিজ্য কেন্দ্র বিদ্যমান।

দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ দেশীয় অর্থনীতির বিকাশে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে দেশের প্রথম বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে ‘বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র’প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর প্রাথমিক শর্ত হিসাবে দ্য ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এসোসিয়েশন(ডব্লিউটিসিএ) থেকে সদস্য পদ গ্রহণ করেছে দুই লাখ ডলার ব্যয় যা প্রতিবছর নবায়ন করতে হবে দশ হাজার ডলার ফি এর বিনিময়ে। বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র নির্মিত হবে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক অঞ্চলে যার নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪১.৭৩ কোটি টাকা। ২১-তলা বিশিষ্ট ভবনে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধাই বিদ্যমান থাকবে।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন

 ফ্লাইওভার : চট্টগ্রাম নগরীতে যোগাযোগ সুবিধার উন্নয়নে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠছে ফ্লাইওভার। এ ফ্লাইওভার বিমানবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এতে দ্রুত গতিতে বিমানবন্দর যেতে আর কোন বাধা থাকবে না।

কর্ণফুলি টানেল : নির্মিয়মান কর্ণফুলি টানেলের কাজ প্রায় অর্ধেক শেষ হয়েছে। টানেলের কাজ সমাপ্ত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাথে যুগান্তকারী যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের বিমানবন্দর আসতে আর বেগ পেতে হবে না। দক্ষিণ চট্টগ্রামের অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাবে।

ওয়াটার বাস : কর্ণফুলি নদীতে চালু করা হয়েছে ওয়াটার বাস। সদরঘাট থেকে অতি সহজেই নদী পথে বিমানবন্দর পৌঁছানো যাবে। এতে সময় বেশি প্রয়োজন হয় না।

মেরিন ড্রাইভ রোড : চট্টগ্রাম শহরের বাইরে বঙ্গোপসাগরের তীর ধরে নির্মিত হয়েছে মেরিন ড্রাইভ রোড। ফৌজদারহাট   থেকে  বিমান বন্দর আসতে সময় নেয় মাত্র ১০ মিনিট।

বায়েজিদ সংযোগ সড়ক : বায়েজিদ থেকে ঢাকা ট্রাঙ্ক রোডের সাথে যুক্ত হয়েছে এ সড়কটি। এতে ঘুর পথে ঢাকা গামী গাড়িগুলোকে আর ট্রাঙ্ক রোডে  ওঠতে হবে না। সরাসরি যাওয়া যাবে। এতে দূরত্ব কমার পাশাপাশি যানজট ও সময় দুটোই বাঁচানো যাবে।

রেল লাইন : চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন নির্মিত হচ্ছে। প্রকল্পটি শেষ হলে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠবে।

 

 

 

Check Also

‘স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে প্রয়োজন স্মার্ট পরিবহন’

জার্নাল ডেস্ক পৃথিবী এগিয়ে চলছে, আমরা পিছিয়ে থাকতে পারি না বলে মন্তব্য করে সড়ক পরিবহন …

ঘূর্ণিঝড়ের শঙ্কা, সমুদ্রবন্দরে স্থানীয় সতর্ক সংকেত

জার্নাল ডেস্ক বঙ্গোপসাগরে দমকা ও ঝোড়ো হাওয়ার গতিবেগ বাড়ছে। সৃষ্ট নিম্নচাপটি আরও শক্তিশালী হয়ে গভীর …