বিপদ জয় করে বিজয়ের দেশে ফিরে আসা

জার্নাল ডেস্ক :

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’  সাক্ষাৎ বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে বৈরুত থেকে  ভালভাবেই ফিরে এসেছে। প্রাণে বেঁচেছেন জাহাজের ২২ থেকে ২৫ জন নৌবাহিনীর সদস্য। সেদিনের একটু খণ্ড চিত্র তাদের বর্ণনা থেকেই শোনা যাক।

‘এ বছরের ৪ আগস্ট। তখন বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৪টা কী ৫টা। আমাদের জাহাজ থেকে কিছু দূরে আমি হঠাৎ করে একটা আগুন দেখতে পাই। একটু আগে জাহাজ জেটিতে ভিড়েছে। তাই আগুন দেখে জাহাজে থাকা একটা সাইকেলে চেপে সেখানে কী ঘটেছে দেখতে যাই। এটা কিসের আগুন, এই আগুনে আমাদের জাহাজের কোনও ক্ষতি হবে কিনা এসব বিষয় খতিয়ে দেখতেই  যাই। তবে সুবিধার মনে হচ্ছিল না। দেখে ফিরে আসতে আসতেই আগুনের তেজ বাড়তে থাকে। জাহাজে পৌঁছাতেও পারিনি, তার আগেই হঠাৎ ভয়াবহ বিস্ফোরণ! কিচ্ছু বোঝাতে পারবো না সে বিস্ফোরণটা কেমন! শুধু বুঝতে পারলাম আমি উড়ে যাচ্ছি। সাইকেল কোথায় গেছে আমি জানি না। শুধু মনে হচ্ছিল, এটি আমার জীবনের শেষ দিন।’

পরপর দুইবার ঘটা ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গিয়েছিল ১৫০ কিলোমিটার দূরের সাইপ্রাসেও। এই শব্দে ধসে পড়ে শহরের অনেক বাড়ি-ঘর, প্রাণহানি ঘটে শতাধিক মানুষের। অথচ এর আড়াইশ থেকে তিনশ মিটারের মধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ বিজয়ে থাকা  নৌবাহিনীর সদস্যরা অলৌকিকভাবে বেঁচে যান সেদিন। আড়াই মাস পর দেশে ফিরে সেই ঘটনারই বর্ণনা দিয়েছেন কমডোর জয়নুল আবেদিন, লেবাননে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে যাওয়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘বিজয়’ এর অধিনায়ক তিনি।

গত ৪ আগস্ট বৈরুত বন্দরের ওই বিস্ফোরণের ঘটনায় জাহাজে থাকা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ২২ থেকে ২৫ জন সদস্য আহত হন। জয়নুল আবেদিনও আহতদের একজন।

জয়নুল আবেদিন বলেন,‘বিস্ফোরণে চারদিকে একটি স্থাপনাও ছিল না। ১০ মাইল দূরেও ভবন ধসে পড়েছে। ১৫০ কিলোমিটার দূরে সাইপ্রাস, সেখানেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। অথচ আমরা বিস্ফোরণ যেখানে ঘটেছে তার থেকে মাত্র আড়াইশ থেকে তিনশ মিটার দূরে ছিলাম। আমাদের বিজয় জাহাজটি অবকাঠামোগত দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল বলে আমরা বেঁচে গেছি। না হলে, জাহাজটি দুমড়ে মুচড়ে যেতো। আমরা কেউ হয়তো বেঁচে থাকতাম না। অত্যন্ত ভয়াবহ অবস্থা ছিল। কারো হাত থেকে রক্ত ঝরছে, কারো পা, কারও মাথা থেকে রক্ত ঝরছে। জাহাজের পুরো ডেকে তখন রক্ত আর রক্ত…।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার পর বড় বড় ঢেউ এসে ধাক্কা দিতে থাকে। ঢেউয়ের তোড়ে আমাদের জাহাজ একবার সামনে যায়, আবার পেছনে নিয়ে যাচ্ছে। তখন আমরা চিন্তায় পড়ে গেলাম জাহাজ যদি গিয়ে জেটিতে আঘাত করে তখন জাহাজও ধ্বংস হবে, জেটিও ধ্বংস হবে। ওই অবস্থায় তাড়াতাড়ি আমরা সবাই মিলে রশি পাস করলাম। এরপর আমরা গাড়ি, হেলিকপ্টারের জন্য দৌড়াদৌড়ি শুরু করলাম। ইউএন হেড কোয়ার্টারে যোগাযোগ করলাম। কেউ কোনও গাড়ি পাঠাতে পারছে না।

গাড়ি আসতে যখন দেরি হচ্ছে তখন খুব চিন্তা হচ্ছিল যে, আল্লাহ না করুক যারা আহত হয়েছেন তাদের মধ্যে যদি কেউ মারা যায়! কারণ, আমাদের মধ্যে গুরুতর আহতও ছিল। গাড়ি আসতে দেরি হচ্ছে কারণ, বিস্ফোরণে কয়েক মাইল পর্যন্ত রাস্তা ব্লক হয়ে গেছে। তাই রাস্তা ক্লিয়ার না করে কেউ আসতে পারছে না। পরে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে করতে রাতে ১২টার দিকে আমরা হাসপাতালে গিয়েছি।’

বিস্ফোরণে জাহাজের কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের জাহাজটির অবকাঠামোগত অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জাহাজের রাডারের অ্যান্টেনা ভেঙে পড়েছে। অ্যালাইনমেন নষ্ট হয়েছে। যেসব যন্ত্রপাতি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এগুলোর অধিকাংশ ছিল ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি এবং এগুলো খুব সফস্টিকেটেড যন্ত্রপাতি ছিল। তাই এগুলো মেরামত করা খুব দরকার ছিল। পরে আমরা সেগুলো তুরস্কের সহযোগিতায় ঠিকঠাক করে ১০ হাজার কিলোমিটার সমুদ্র পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম এসে পৌঁছেছি।’

এত কিছুর পরও এই শান্তিরক্ষা মিশন সফল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করে আমাদের অনেক অভিজ্ঞতা লাভ হয়েছে।

এই শান্তিরক্ষা মিশনে আমরা বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছি। বিশেষ করে জার্মানি, গ্রিস, ব্রাজিল, তুরস্কের মতো দেশের নৌবাহিনীর সঙ্গে কাজ করে আমরা অনেক অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।

এছাড়াও আমরা লেবাননের নৌবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। লেবাননে আমাদের এক লাখ ৮০ হাজার প্রবাসী রয়েছে। যাদের অনেকে সুচিকিৎসা নেওয়ার মতো অবস্থাতেই ছিল না। আমরা নিয়মিত তাদেরকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়েছি। এইসব কাজ-কর্মের মধ্যদিয়ে বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিডিজা৩৬৫/আহা

 

Check Also

‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি’

জার্নাল ডেস্ক ‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি ‘।    এভাবেই নিজের হতাশার কথা  জানিয়েছেন বসনিয়ায় আটকে …

নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায় মামলা, গ্রেফতার ১

জার্নাল ডেস্কঃ সংসদ সদস্য হাজি সেলিমের গাড়ি থেকে বের হয়ে নৌবাহিনীর এক কর্মকতাকে মারধরের ঘটনায় …