বিমানবন্দরে যাত্রীর ছদ্মবেশে থাকতো অজ্ঞানপার্টি

জার্নাল ডেস্ক

বিমানবন্দর এলাকার বিভিন্ন বাস কাউন্টারের সামনে হাতে পাসপোর্ট ও লাগেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো চক্রটির সদস্যরা। বিদেশ থেকে আসা কাউকে দেখলেই তার কাছে গিয়ে বলতেন কোনো জেলায় যাবেন। বিষয়টি জানার পরই সেই ব্যক্তিকে বলা হতো আমরাও সেই জেলায় যাব কিন্তু আমাদের একজন আসার কথা থাকলেও না আসায় একটি টিকিট বেশি রয়েছে। ভুক্তভোগী তাদের কথাগুলো সরলভাবে বিশ্বাস করতেন। পরে যাত্রাপথে কৌশলে ভুক্তভোগীকে অজ্ঞান করে তার মালামাল লটে নিতো চক্রের সদস্যরা।

প্রবাসফেরত যাত্রীর ছদ্মবেশ ধারণ করে এভাবেই ১৫ বছর ধরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসা প্রায় তিন শতাধিক প্রবাসীকে কৌশলে অজ্ঞান করে সর্বস্ব লুট করে নিয়েছে চক্রটি।

চক্রটির মূলহোতা আমিরসহ চারজন গতরাতে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হলে তাদের থেকে এসব তথ্য জানতে পারে এলিট ফোর্সটি। শনিবার রাতে রাজধানীর বিমানবন্দর ও কদমতলী থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করার সময় তাদের থেকে লুটকৃত স্বর্ণ, মোবাইল এবং অজ্ঞান করতে ব্যবহৃত উপকরণও জব্দ করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- চক্রটির মূলহোতা আমির হোসেন (৫২), তার সহযোগী লিটন মিয়া ওরফে মিল্টন (৪৮), আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে পারভেজ (৩৫) এবং জাকির হোসেন (৪০)। তাদের মধ্যে চক্রটির মূলহোতা আমিরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১৫টির বেশি মামলা রয়েছে।‌‌‌‌‌

গ্রেপ্তারদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে রোববার কারওয়ান বাজারের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয় র‌্যাবের পক্ষ থেকে। সেখানে কথা বলেন এলিট ফোর্সটির মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

খন্দকার আল মঈন বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অজ্ঞানপার্টি চক্রের তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। এসব চক্রের সদস্যদের নেশাজাতীয় দ্রব্যের বিষক্রিয়ায় অনেকের মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে। অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ও ব্যাংকসহ ব্যস্ততম বিভিন্ন স্থানে সাধারণ যাত্রী বা ব্যাংকে আসা গ্রাহকদের টার্গেট করতো।

তিনি জানান, গত ২ সেপ্টেম্বর কুয়েত প্রবাসী এক ব্যক্তি শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছালে আগে থেকে ওঁত পেতে থাকা অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা তাকে টার্গেট করে ও ঢাকা থেকে বগুড়া যাওয়ার পথে ওই প্রবাসীকে অজ্ঞান করে সর্বস্ব লুটে নেয়।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী বাদী হয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। বিষয়টি বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচিত হয়। ফলশ্রুতিতে র‌্যাব গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ায় এবং বিমানবন্দরসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানের সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক বলেন, গত ২ সেপ্টেম্বর ভোরে কুয়েত প্রবাসী জনৈক ভুক্তভোগী হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। এরপর চক্রটির একজন সদস্য বিমানবন্দর থেকে জনৈক প্রবাসীকে অনুসরণ করতে থাকে। ভুক্তভোগী উত্তরবঙ্গে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আজিমপুর বাস স্ট্যান্ডে এসে পৌঁছায় এবং উত্তরবঙ্গগামী বাস কাউন্টারে টিকেট কাটতে গেলে কাউন্টারে আগে থেকে প্রবাসী যাত্রীর ছদ্মবেশ নিয়ে থাকা গ্রেফতার আমির হোসেন ভুক্তভোগীকে জানায়, তার কাছে একটি অতিরিক্ত বাসের টিকেট রয়েছে। আগে থেকে সাজিয়ে রাখা একটি লাগেজ ও কিছু কুয়েতি দিনার দেখিয়ে তিনি ভুক্তভোগীকে আশ্বস্ত করেন যে তিনি (আমির) নিজেও একজন প্রবাসী।

ভুক্তভোগী ব্যক্তি আমির হোসেনকে সরল মনে বিশ্বাসে তার কাছ থেকে টিকেট কিনে পাশের সিটে বসে বগুড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। কিছুক্ষণ পরে আমির হোসেন তাকে চেতনানাশক ওষুধ মেশানো বিস্কুট খেতে দেয়। বিস্কুট খাওয়ার কিছুক্ষণ পরে অজ্ঞান হয়ে যায় এবং চক্রটি ভিকটিমের সব মালামাল ও সম্পদ লুট করে নিয়ে পথে নেমে যায়। পরে বাসের সুপারভাইজার ভুক্তভোগীকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করেন।

গ্রেপ্তাররা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানান, তারা সংঘবদ্ধ অজ্ঞানপার্টি চক্রের সদস্য। এ চক্রের সদস্য সংখ্যা ৮-১০ জন। তারা বিভিন্ন পেশার আড়ালে গত ১৫ বছর ধরে পারস্পরিক যোগসাজসে রাজধানীর বিমানবন্দর টার্মিনালে ওঁত পেতে থেকে বিদেশফের যাত্রীদের টার্গেট করতো। টার্মিনালে হাতে পাসপোর্ট ও লাগেজ নিয়ে প্রবাসফেরত যাত্রীর ছদ্মবেশ ধারণ করতো।

কমান্ডার বলেন, এটি মূলত তাদের একটি কৌশল। পরবর্তী সময়ে এ চক্রটি এমন প্রবাসী যাত্রীদের টার্গেট করতো, যার জন্য অপেক্ষমান কোনো আত্মীয়-স্বজন বা গাড়ি নেই। তারা কৌশলে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে চক্রের অন্য সদস্যদের তাদের কাছের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতো। পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগীর সঙ্গে একই এলাকার ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়ে তাদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করতো। চক্রের সদস্যরা সবাই একসঙ্গে বাসের টিকিট কেটে যাত্রা শুরু করতো। ভ্রমণের সময় তারা টার্গেট ব্যক্তিকে কৌশলে চেতনানাশক ওষুধ মিশ্রিত বিস্কুট খাইয়ে অচেতন করতো। ভুক্তভোগী ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে গেলে তার কাছে থাকা যাবতীয় মালামাল নিয়ে চক্রের সদস্যরা কোনো একটি স্টেশনে নেমে যেতো।

গ্রেপ্তারদের পরিচয়:

চক্রের মূলহোতা আমির হোসেন। ‌তিনি বিমানবন্দর এলাকায় একটি ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করেন। মূলত এই পেশার আড়ালে তিনি এমন প্রতারণা করেন। দুই তিন দিন পরপর প্রবাসীদের টার্গেট করে তিনি ও তার চক্রের সদস্যরা এসব কাজ করতেন।

‌‌‌‌‌‌‌‌‌গত ১৫ বছর ধরে এভাবে প্রবাসীদের সঙ্গে প্রতারণা করে তাদের স্বর্ণালঙ্কার টাকা-পয়সা লুট করে আসছিল আমির ও তার চক্র সদস্যরা। কয়েক বছর ধরে ৩০০ এর অধিক ব্যক্তির সঙ্গে প্রতারণা করে তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র লুটে নিয়েছে তারা। চক্রটি সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে কারাগারে গেলেও জামিনে বেরিয়ে এসে একই কাজে জড়িয়ে পড়ে।

গ্রেপ্তার লিটন তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করার পর ছেড়ে দেয়। পরে মাইক্রোচালকের পেশার আড়ালে দীর্ঘ ৩/৪ বছর ধরে আমিরের অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছে। ইতোপূর্বে একাধিকবার একই ধরণের মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন। বিভিন্ন সময় চক্রটি কৌশলে প্রবাসী যাত্রীদের মাইক্রোবাসে পরিবহন করে সর্বস্ব লুট করে নেয়। তখন মাইক্রোবাস চালনোর দায়িত্বে থাকে লিটন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময় বিমানবন্দর থেকে যাত্রীদের অনুসরণের কাজ করতেন।

গ্রেপ্তার আবু বক্কর ওরফে পারভেজ ৮/৯ বছর বিভিন্ন জুয়েলারি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। পরবর্তীতে ৬/৭ বছর পূর্বে নিজেই রাজধানীর শ্যামপুরে জুয়েলারির দোকান করেন। দোকানের আড়ালে ২/৩ বছর ধরে চক্রটির লুটকৃত স্বর্ণ গ্রহণ, রুপ পরিবর্তন ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

গ্রেপ্তারকৃত জাকির হোসেন ছাপাখানার ঠিকাদার হিসেবে কাজ করেন। গত ৩/৪ বছর পূর্বে আমিরের মাধ্যমে এই চক্রে যোগ দেয়। তিনি লুটকৃত স্বর্ণালঙ্কার ও অন্যান্য মালামাল রাজধানীর বিভিন্ন জুয়েলারি দোকানসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

Check Also

টস জিতে ব্যাটিংয়ে আয়ারল্যান্ড

ক্রীড়া ডেস্ক সুপার টুয়েলভে নিজেদের প্রথম ম্যাচে আজ মাঠে নেমেছে শ্রীলঙ্কা ও আয়ারল্যান্ড। প্রথম রাউন্ডের …

করোনায় একজনের মৃত্যু, শনাক্ত ১২৪

জার্নাল ডেস্ক দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ১২৪ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। মোট শনাক্ত রোগীর …