যানবাহনের ফিটনেস ও চালকের লাইসেন্স পেতে চট্টগ্রাম বিআরটিএ কার্যালয়ে মালিক-চালকদের ভীড়

চট্টগ্রাম ব্যুরো:

চট্টগ্রামের বালুছড়াস্থ বিআরটিএ’র আঞ্চলিক কার্যালয়ে গত দু’দিন ধরে যানবাহন সংশ্লিষ্ট মালিক-চালকদের প্রচন্ড ভীড় লেগেছে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এ ভীড় লেগেই আছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে করা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে বিআরটিএ চট্টগ্রাম কার্যালয়ে। অনেকটা চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে মালিক এবং চালকরা এখন বিআরটিএ অফিসে ধরনা দিচ্ছে বলে অনেকের অভিমত।
গত রোববার সপ্তাহের প্রথম দিন থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিআরটিএ কার্যালয়ে মালিক-চালকদের প্রচুর ভিড় দেখাগেছে। তবে দালালদের দৌরাত্ম্যও কম নয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর গাড়ির মালিক- চালকরা বিআরটিএ মূখী হয়। একারনে কাজের চাপ সামলাতে বিআরটিএ চট্টগ্রাম সার্কেলের সকল কর্মকর্তার সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করেছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সকাল ৯ টা থেকে রাত ৯টা অফিস করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, এতদিন ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে বিপুল সংখ্যক চালক গাড়ি চালালেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ।
কর্মকর্তারা জানান, এ কার্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রশিক্ষণের কারণে বিদেশে থাকায় চলতি বছরের শুরু থেকে ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা যায়নি। গত এক বছরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মাত্র দুই চালকের কাছে ভুয়া লাইসেন্স থাকার প্রমাণ পেয়েছে বিআরটিএ। নিবন্ধন শাখার কাজ স্বাভাবিক থাকলেও গাড়ির ফিটনেস, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও মালিকানা বদলি শাখায় কাজের চাপ বেড়েছে দ্বিগুণ।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিআরটিএ কার্যালয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স করার জন্য মেট্রো ও জেলা শাখায় গড়ে প্রতিদিন আবেদন করেন ৭০ থেকে ৮০টি। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরুর পর গত রোববার আবেদন করেছেন ১১৫ জন। কর্মকর্তারা জানান, ১৯৯০ সাল থেকে গতকাল পর্যন্ত বিআরটিএ চট্টগ্রাম সার্কেলের মেট্রো শাখা এক লাখ ১৫ হাজার ৩০৪টি এবং জেলা শাখা ৭৮ হাজার ৭০৯টি ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে।
গতকাল দুপুরে পাহাড়তলী থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে এসেছেন মো. আল- আমিন। তিনি বলেন, ‘ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা আমাদের শিক্ষা দিয়েছে যে, লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো অপরাধ।’ সীতাকুন্ড থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স’র আবেদন করেছেন সাইফুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘সকাল দশটায় এসেছি। বেলা ১টায় শিক্ষানবীশ লাইসেন্স’র জন্য ব্যাংকে টাকা জমা করতে পেরেছি। ‘শিক্ষানবীশ লাইসেন্স’র জন্য সর্বসাকুল্যে সরকার নির্ধারিত খরচ ৫০০ টাকা। কিন্তু এক দালাল এ জন্য এক হাজার টাকা দাবি করেছেন। তাই নিজেই সবকাজ সম্পন্ন করে লাইনে দাঁড়িয়েছি। সময় লেগেছে তিন ঘণ্টা। দালালকে দিলে হয়তো সময় লাগত বড়জোর এক ঘণ্টা।
বিআরটিএ জানায়, ২০১৭ সালের জুলাই থেকে চলতি বছর জুলাই পর্যন্ত জেলা এলাকায় বিআরটিএ সাতটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। এসময় বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ৫৮টি মামলা হয়। এর মধ্যে গাড়ির ফিটনেস না থাকায় ২০টি, ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্সে গাড়ি চালনার অপরাধে ২টি, ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় ১৮টি এবং অন্যান্য অপরাধে ১৮টি মামলা দায়ের হয়।
সূত্রটি জানায়, বিআরটিএ কার্যালয়ে নিয়োজিত নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট প্রশান্ত কুমার হালদার গত ৮ মাস ধরে বিদেশে রয়েছেন।
বিআরটিএ চট্টগ্রাম সার্কেল ১ এর সহকারী পরিচালক (প্রকৌশলী) তৌহিদুল হোসেন জানান, সিডিউল অনুযায়ী প্রতিমাসে পাঁচটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা রয়েছে। কিন’ দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকায় রিকুইজিশন দিয়েও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেটদের পাওয়া যায় না। পাশাপাশি বিআরটিএ’র পর্যাপ্ত জনবলও নেই।
ড্রাইভিং লাইসেন্স শাখার সহকারী পরিচালক ওসমান সরওয়ার আলম জানান, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরুর পর বিআরটিএ’র প্রতিটি দপ্তরে ২০-২৫ শতাংশ কাজ বেড়েছে। গত ৩ জুলাই গাড়ির ফিটনেস আবেদন জমা পড়েছে ১৬৯টি। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে গত রোববার জমা পড়েছে ৪০৯টি আবেদন। এ হিসেবে ছাত্র আন্দোলনের পর কাজের চাপ বেড়েছ দ্বিগুণ।
বিআরটিএ’র এই কর্মকতা জানান, রাস্তায় ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা লাইসেন্স ছাড়া প্রচুর গাড়ি চলছে। এসব দেখার দায়িত্ব আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশের কিছু কর্মকর্তা মাসিক মাসোহারা নেওয়ার বিনিময়ে অনিবন্ধিত সিএনজি অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ক্যটাগরির গাড়ি চালকদের ‘টোকেন’ দেন। এসব গাড়ি রাস্তায় চলছে। দুর্ঘটনা ঘটছে। মানুষ মরছে।’
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) কুসুম দেওয়ান বলেন, ‘আমি শুনেছি কিছু ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক এবং সার্জেন্ট টোকেন দিয়ে রেজিস্ট্রেশনবিহীন যানবাহন রাস্তায় চলার সুযোগ দিচ্ছেন। বিষয়টির তদন্ত হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
গতকাল বেলা ২টার দিকে দেখাগেছে অন্যান্য সময়ে কার্যালয়ের সামনের মাঠ খালি দেখা গেলেও গতকালের চিত্র ছিল ভিন্ন। বাস-মিনিবাস, সিএনজি অটোরিকশা, কাভার্ড ভ্যান, ট্রাক ও মিনিট্রাকে ভরে গেছে পুরো মাঠ।
লাইসেন্স নবায়ন করতে আসা বন্দরটিলা এলাকার রহমান আলী বলেন, ‘সকাল দশটায় লাইনে দাঁড়িয়েছি। বেলা ১টা বাজলেও টাকা জমা দিতে পারিনি। পরে বাধ্য হয়ে দালালকে ৩০০ টাকা অতিরিক্ত দিয়ে টাকা জমা দিয়েছি।’
বিআরটিএ চট্টগ্রাম সার্কেলের উপপরিচালক শহীদুল্লাহ বলেন, ‘নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরুর পর গ্রাহকদের চাপ প্রচুর বেড়েছে।

সাব্বির// এসএমএইচ//৭ই আগস্ট, ২০১৮ ইং ২৩শে শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Check Also

বিপদ জয় করে বিজয়ের দেশে ফিরে আসা

জার্নাল ডেস্ক : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’  সাক্ষাৎ বিপদ …

‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি’

জার্নাল ডেস্ক ‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি ‘।    এভাবেই নিজের হতাশার কথা  জানিয়েছেন বসনিয়ায় আটকে …