শ্বশুরবাড়ি পালানো ৩য় শ্রেণির ছাত্রী শরমিনের অভিভাবকত্ব নিলেন লোহাগাড়া ইউএনও

মনির আহমদ আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম):

শরমিন (১১) ফারাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট খবর এল মাঝবয়সী এক পুরুষের সাথে তার বাবা-মা তার বিয়ে ঠিক করেছে। সে এই বিয়ে থেকে মুক্তি পেতে চায়। তাৎক্ষণিকভাবে ইউএনও বিয়ে ঠেকিয়ে দিলেন শরমিনের বাবা-মা ও বিয়ে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সকলের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে। ওই সময় সতর্ক করেন যেন আইনগত বয়স না হওয়া অবধি মেয়ের বিয়ে না দেয়া হয়। শরমিনের বিয়ের জন্য কেনা কানের দুল জব্দ করে ইউএনও জিম্মায় রাখলেন। ভবিষ্যতে তার শিক্ষা খরচ মেটাতে পঞ্চাশ হাজার টাকা পোস্ট অফিসে ডিপিএস সহ শরমিনকে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য সব ধরনের আশ্বাস প্রদান করেন তিনি। গল্পটা এখানে শেষ হতে পারত। গল্পটা শেষ হয়নি ফারাঙ্গার পঞ্চম শ্রেণির আরেক শিশুর বিয়ে ইউএনও ঠেকাতে গিয়ে। ঐ বিয়ে ঠেকানোর সময় তিনি জানতে পারলেন কঠোর গোপনীয়তায় শরমিনের বিয়ে হয়ে গেছে বান্দরবানের লামার হাছনা ভিটায় তার মামার বাড়িতে। শরমিন এখন তার শ্বশুরবাড়ি মহেশখালীতে থাকে। তার স্বামী পানের বরজে কাজ করে। মানবিক সকল উদ্যোগ গ্রহণ করা সত্ত্বেও ইউএনও মাহবুব আলমের বিয়ে ঠেকাতে না পারায় মনটা ভেঙ্গে পড়ল। তাঁর ব্যর্থতা মেনে নিতে খুব কষ্ট হল। বাল্য বিবাহের আইনটি মোবাইল কোর্টে তফসিলভুক্ত হতে বিলম্ব হওয়ায় এই বিষয়ে কঠোরতা অবলম্বন করতে পারলেন না তিনি। হতাশ মনে বাল্য বিবাহ অনুৎসাহিত করার জন্য ক্যাম্পেইন শুরু করেন পুরো লোহাগাড়া উপজেলার স্কুলে স্কুলে। বিভিন্ন অংশীজনকে বাল্যবিবাহ বিরোধী প্রচারণা চালাতে তিনি অনুরোধ করেন। এছাড়াও উপজেলা শিক্ষা অফিসের সহযোগিতায় শিক্ষার আলো বঞ্চিত ও অভাবে জর্জরিত গ্রাম গুলোতে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে বাল্য বিবাহের কুফল বলে সচেতনতা চালানো শুরু করে দিলেন। শিক্ষা অফিসও শিক্ষকদের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছিল অবিরত। নানা দাপ্তরিক ব্যস্ততায় শরমিনের কথা আস্তে আস্তে ভুলতে বসেছিলেন তিনি। কিন্তু গত কয়েকদিন আগে আচানক একটা ফোনকল তাঁকে ভুলতে দেয়নি শরমিনের কথা।
-হ্যালো স্যার, আমি শরমিন বলছি।
-কোন শরমিন?
– ফারাঙ্গার শরমিন স্যার। ক্লাস থ্রিতে পড়তাম। যার বিয়ে আপনি ভেঙ্গে দিয়েছিলেন।
– তুমি কোথায় এখন, শরমিন?
– আমি শ্বশুরবাড়ি থেকে পালিয়ে আসছি। বাড়ি গেলে আবার আমাকে মহেশখালীতে পাঠিয়ে দিবে। স্যার আমি পড়ালেখা করতে চাই। আমাকে আপনি বাঁচান।
– তুমি কাউকে বলে আমার অফিসে চলে আস।
-স্যার গাড়িতে উঠছি কিন্তু আমার গাড়ি ভাড়া নাই।
– অসুবিধা নাই। তুমি উপজেলা গেইটে নামো। কাউকে দিয়ে তোমার ভাড়া পাঠিয়ে দিচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর শরমিন অফিসে আসলো। দীর্ঘক্ষণ কান্নাকাটি করে বলল, সে পড়তে চায়। সে আশ্রয় চায়। বর্তমানে সে উপজেলা প্রশাসনের জিম্মায় আছে। দুদিন পর তাকে পার্শ্ববর্তী একটা প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন তিনি। সে এখন চতুর্থ শ্রেণির ১ম সাময়িক পরীক্ষা দিচ্ছে। স্কুল ড্রেস পরে যখন সে পরীক্ষা দিতে আসে তখন মনে হয় সে তাঁর মেয়ে। গত ২৪ এপ্রেল মঙ্গলবার শরমিনের পরিবারের লোকজন উঠিয়ে নিতে তার স্কুলের পথে দাঁড়িয়েছিল। সমুহ বিপদ আশংকা করে শরমিন অফিসে চলে আসে এবং এই যাত্রায় সে আবারো বেঁচে যায়। এখন প্রতিদিন ইউএনও’র এক স্টাফ তাকে স্কুলে দিয়ে আসে এবং স্কুল থেকে নিয়ে আসে। এ ব্যাপারে ইউএনও মাহবুব আলম বলেন, তার দুঃস্বপ্ন এবং দুর্বিষহ অতীত ভুলে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে চায়, বড় হয়ে ইউএনও হতে চায়। ইউএনও মাহবুব আলমও চান সে পড়ালেখা করুক। তার পড়ালেখার যাবতীয় খরচ তিনি নিশ্চিত করতে চান। তিনি স্বপ্ন দেখেন সে হয়ে উঠুক একজন দৃষ্টান্ত। তাকে অনুসরণ করে হাজারো শরমিন বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাক। দেশ এগিয়ে দেওয়ার মিছিলে শরমিনও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিক।

Check Also

বিপদ জয় করে বিজয়ের দেশে ফিরে আসা

জার্নাল ডেস্ক : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’  সাক্ষাৎ বিপদ …

‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি’

জার্নাল ডেস্ক ‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি ‘।    এভাবেই নিজের হতাশার কথা  জানিয়েছেন বসনিয়ায় আটকে …