সিডিএ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ওরিয়েন্ট টাওয়ারের নকশা গায়েব!

0

নিজস্ব প্রতিবেদক :

চট্টগ্রামের লালদিঘী মোড়ে নানা অনিয়ম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওরিয়েন্ট টাওয়ার নামের একটি ভবন। ভবনের প্রকৃত মালিকদের নানা হুমকি-ধমকি ও জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে ভবনটি দখল করে রেখেছে এস এম আহমদ হোসেন নামের এক ভূমি দস্যু। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এর কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়ে অবৈধ এ ভবনটি দখল করে রেখেছে আহমদ হোসেন। সিডিএ অনেক আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এ ভবনটি অপসারণের নির্দেশ দিলেও সিডিএ’র কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে উৎকোচ দিয়ে ভবনটির সকল কাগজপত্র সিডিএ থেকে গায়েব করে ফেলেছেন আহমদ হোসেন। এছাড়া ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ভবনটি অপসারণ না করার জন্য হাইকোর্ট থেকে নিয়ে এসেছেন নিষেধাজ্ঞা। ফলে জমির প্রকৃত মালিক ও ওয়ারিশরা আহমদ হোসেনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। এমনকি প্রশাসনকে জানিয়েও পাচ্ছেন না কোন প্রতিকার।

জানা যায়, ওরিয়েন্ট টাওয়ারটি যে জায়গার উপর দাঁড়িয়ে আছে ওয়ারিশ সূত্রে জায়গাটির মালিক আরিফ মইনুদ্দিন ও মো. ফখরুদ্দিন। তবে ফখরুদ্দিন থেকে তার অংশ কিনে নেয় বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর চট্টল শার্দুল নামে খ্যাত এম এ আজিজের সেজ পুত্র শওকত ওসমান। এদিকে ওরিয়েন্ট টাওয়ার বানানোর কথা বলে আরিফ মইনুদ্দিনের সাথে একটি চুক্তি করে আহমদ হোসেন। চুক্তি অনুসারে টাওয়ারের দ্বিতীয় তলার মালিকানা দেয়া হয় আরিফ মইনুদ্দিনকে। কিন্তু নীতিমালা অনুসারে ভবনের উপর তালা বাড়াতে হলে সব মালিকের অনুমতি প্রয়োজন। কিন্তু অবৈধভাবে ওরিয়েন্ট টাওয়ার ৬ তলা থেকে ৯ তলায় রূপান্তর করলেও আরিফ মইনুদ্দিনের কাছে বিষয়টি গোপন রাখে আহমদ হোসেন। তিনি  জাল কাগজপত্র তৈরি করে ও আরিফ মইনুদ্দিনের স্বাক্ষর জাল করে সিডিএ এর কাছে ৬ তলা থেকে ৯ তলার অনুমোদন চাইলেও সিডিএ কাগজপত্র যাচাই করে অনুমতি দেয় না। উল্টো ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ও যেকোন মুহূর্তে ভবনটি ধরে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় পুরো ভবনটিই অপসারণের নির্দেশ দেয়া হয় সিডিএ থেকে। কিন্তু আহমদ হোসেন সিডিএ’র আইন কর্মকর্তা মো. ইলিয়াছ ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী মো. আবু সৈয়দ ও মো. সেলিমকে মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে সিডিএতে থাকা ওরিয়েন্ট টাওয়ারের নকশা ও অন্যান্য কাগজপত্র গায়েব করে ফেলে।    

এদিকে, আহমদ হোসেনের নামে ভূমি দখল ছাড়াও প্রতারণা, চেক জালিয়াতি ও হত্যার নির্দেশদাতাসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে র‌্যাব-৭ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। তবে র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে জেল থেকে ছাড়া পায় সে। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী মো. মহসিনের কাছ থেকে ব্যবসার কথা বলে ৪৫ লাখ টাকা নিয়েছিল আহমদ হোসেন। পরে মহসিন তার কাছ থেকে ব্যবসার লভ্যাংশ চাইতে গেলে আহমদ হোসেন তাকে শারীরিক ভাবে নির্যাতন করে এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে র‌্যাবের কাছে ধরিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। এছাড়া ওরিয়েন্ট টাওয়ারের পাশ্ববর্তী ভবন আমান আলী টাওয়ারের ব্যবসায়িক অংশীদার সৈয়দ নূর, মোজাফফর আহমদ ও সৈয়দ হোসেনকেও একই কায়দায় ভয় দেখালে এবং সন্ত্রাসী দিয়ে গুম করাবে বলে হুমকি দিলে তারা ২০১৮ সালের ১৩ জানুয়ারি কোতোয়ালী থানায় একটি জিডি করেন। এ ঘটনার পর ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে আমান আলী টাওয়ারের সামনে টাওয়ারের কর্মচারী তপন মিয়াকে নিজ সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করায় আহমদ হোসেন। তবে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ওই হত্যাকাণ্ডের এজাহার থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করিয়ে নেয় সে। তপনকে খুনের পর আমান আলী টাওয়ারের মালিকদের ফোন করে এ খুন থেকে শিক্ষা নেয়ার কথা বলে আহমদ হোসেন। তার বিরোধিতা করলে কি পরিণতি হবে সে বার্তা পৌঁছে দেয় অন্যদের কাছে।   

জানতে চাইলে এম এ আজিজের পুত্র শওকত ওসমান বলেন, জায়গার ওয়ারিশসূত্রে মালিকদের কাছ থেকে আমরা জায়গা কিনে নিয়েছি। কিন্তু আহমদ হোসেন জায়গার দলিল জাল করে আমার ভাগের জমি নিজের নামে করে নিয়েছে। এখন আমাদের ভাগের জায়গা বুঝে নিতে গেলে সে নানা হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। এ বিষয়ে আমি কোতোয়ালী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছি।

জায়গার অন্যতম মালিক আরিফ মইনুদ্দিন বলেন, পুরো জায়গায় আমার ভাগের অংশ ১ গন্ডা এক কড়া। কিন্তু আমাকে না জানিয়ে আহমদ হোসেন ৬ তলা ভবনটি ৯ তলাতে রূপান্তর করেছে। এসময় সে আমার সই জাল করে এ কাজ করেছে। বর্তমানে আমাকে জায়গাটি থেকে বেদখল করার জন্য নানা হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে আমি সিডিএ বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু সে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সিডিএ’র অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে রেখেছে। ফলে সিডিএ তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসএম আহমদ হোসেন বলেন, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা এসব কথা বলছে। এসবের কিছুই আমি জানি না। আমার কাছে সবকিছুর কাগজপত্র আছে। যে যখন দেখতে চাইবে দেখাতে পারব।

তবে একাধিকবার তার কাছে এ প্রতিবেদক সিডিএ’র নকশা ও অন্যান্য কাগজপত্র দেখতে চাইলেও তিনি গড়িমসি করে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, সিডিএ’র পক্ষ থেকে ওরিয়েন্ট টাওয়ার অপসারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে ভবনটি অপসারণ করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে আইন মোতাবেক পদক্ষেপ নেয়া হবে।

Share.

About Author

Comments are closed.