৫ কারণে এইচএসসির ফলাফলে বিপর্যয়

নিজস্ব প্রতিবেদক :

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা গত তিন বছরে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে পাসের হারও। এ বছর এপ্রিলের ২ তারিখ শুরু হওয়া এই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলো ১৩ লাখের কিছু বেশি শিক্ষার্থী। তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার প্রায় আড়াই শতাংশ কমে গেছে। আর জিপিএ-ফাইভ পাওয়ার হারও কমে গেছে প্রায় নয় হাজার, যা এবছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ২৯ হাজারের একটু বেশি। কিন্তু গত বছর তা ছিল প্রায় ৩৮ হাজার।

অন্তত তিন বছর ধরে পাসের হার ও জিপিএ’র ক্ষেত্রে একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কমেছে। পাসের হার এমনভাবে হ্রাসের কারণ কী?

ঘন ঘন পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন
পরীক্ষার ফল মনের মতো হয়নি, এমন অভিজ্ঞতার সাথে কম বেশি হয়ত সবাই পরিচিত। সিলেটের শমসের নগরের এক শিক্ষার্থী বলেছেন, এবার তার জিপিএ-৫ হাতছাড়া হয়ে গেছে।

তিনি বলেছেন, “এবার পরীক্ষার হলে কোথায় যেন একটা ভয়ভীতির পরিবেশ ছিল। আর বারবার পরীক্ষার পদ্ধতি পরিবর্তনে বেশ খানিকটা উদ্বেগ ছিল। আর যে সাবজেক্টের কারণে আমার এ-প্লাস মিস হয়েছে ওই সাবজেক্টের কোয়েশ্চন প্যাটার্নটা ভিন্ন ছিল।”

নিজের নাম দিতে রাজি হননি এই ছাত্রী। তিনি আরো বলেছেন, “আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা একেক বছর একেক রকম প্যাটার্ন নিয়ে আসে। এবছর আমাদের শুরুতে বলা হল, সারা বাংলাদেশ একই কোয়েশ্চেনে সবাইকে পরীক্ষা দিতে হবে। টিচাররাও আমাদের নার্ভাস করে দিয়েছিলো। এসব কিন্তু রেজাল্ট এফেক্ট করে”।

মূল বই না সহযোগী বই?
বরিশালের রাজাপুর কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডঃ কামরুন্নেসা আজাদ বলেছেন, “ছেলে-মেয়েরা মূল বই- না, পড়ে না। যার কারণে বিষয় সম্পর্কে সে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল হতে পারে না। মূল বই যে ছেলে-মেয়ে পড়বে, সে কখনো খারাপ করতে পারে না। সে এমসিকিউ বলেন আর সৃজনশীল বলেন। অবশ্যই আমি সহযোগী বইয়ের সাহায্য নেবো। কিন্তু মূল বইটা টার্গেট থাকতে হবে। শিক্ষকের বেলায়ও তাই।”

কম লেখার অভ্যাস
আর মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল যুগের সাথে হাতে লেখার পদ্ধতি দিয়ে পরীক্ষা এই দুটিতে সামঞ্জস্যের ঘাটতি দেখছেন এই শিক্ষক।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলছেন, “আধুনিক এই যুগে ছেলে-মেয়েরা লেখে কম। ধরুন একটি রুটিন টাঙানো হল, তারা মোবাইল দিয়ে ছবি তোলে। কেউ লেখে না। ধরুন সাতটা সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। আর প্রত্যেকটির জন্য সময় মোটে ২০ মিনিট করে। তারা কুলাতে পারে না।”

কিন্তু পাসে হার বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? নানা সময়ে সেই প্রশ্ন উল্টো তুলেছেন অনেকে।

‘লিবারেল মার্কিং’-এর প্রভাব?
শিক্ষা গবেষক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেছেন, দেশে নানা সময়ে লিবারেল মার্কিং বা লিখলেই নাম্বার দেওয়ার প্রবণতা বলে একটি বিষয় সম্পর্কে শোনা গেছে। সেই কারণেও পাসের হার বেশি থাকতো বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, সেটিই বরং দেশের ক্ষতি করেছে।

তিনি বলেছেন, “তখন হয়ত লিবারেল মার্কিং বা লিখলেই নম্বর দেওয়ার একটা প্রবণতা ছিল। এভাবে অনেকেই ভালো ফল করেছে। এটাই ছিল আমাদের শঙ্কার কারণ। যোগ্যতা ছাড়াও অনেকে ভালো ফল করেছে। তারা জাতির অ্যাসেট না হয়ে বরং বার্ডেন হয়ে যায়।”

তিনি বলেছেন, “হতে পারে হয়ত বেশি পাস দেখালে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় হয়ত দেখাতে পারে যে দেশে শিক্ষার মান বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু বেশি জিপিএ পাওয়া মানেই যোগ্যতা নয়।”

অধ্যাপক রহমান বলেছেন, “এখন হয়ত আমরা আসল চিত্রটি পেতে শুরু করেছি। গত তিন বছরে আমরা এই ট্রেন্ড থেকে কিছুটা সরে আসছি। আমি মনে করি- আমরা সত্যের দিকে যাচ্ছি। আর এতে শঙ্কার কিছু নেই।”

শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য
তবে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, কেন এবার পাসের হার কম হল- এর কারণ বের করার চেষ্টা হবে।

যখন বেশি পাস করেছে সবাই বিস্মিত হয়েছে। আমরা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছি বেশি পাস করাই দিচ্ছি এই জন্য। বেশি পাস করলেও আমাদের অপরাধ, কম পাস করলেও অপরাধ।- বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।

তিনি আরও বলেছেন, “যা বাস্তব ফল বেরিয়ে এসেছে, আমরা তাই করেছি। কেউ কেউ প্রথম প্রথম বলতেন যে আমরা নম্বর বাড়াই দিতে বলি। আমরা বাড়াই দিতেও বলি না। কমাই দিতেও বলি না।”

ছাত্র-ছাত্রীর সাফল্যের তুলনামূলক চিত্র
৬৯.৭২% ছাত্রী, ৬৩.৮৮ ছাত্র। ৬ লাখ ৭ হাজার ৯০৯- জনের মধ্যে পাস করা ছাত্রী সংখ্যা ৪ লাখ ২৩ হাজার ৮৪৩ জন। আর ৬ লাখ ৮০ হাজার ৮৪৮- জনের মধ্যে পাস করা ছাত্র সংখ্যা ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৯৫৮ জন।

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা
৬৬.৬৪% পাসের হার (২০১৮) আর ৬৮.৯১% পাসের হার (২০১৭)। জিপিএ-৫ (২০১৮) ২৯ হাজার ২৬২ জন, জিপিএ-৫ (২০১৭) ৩৭ হাজার ৯৬৯ জন।

সাব্বির// এসএমএইচ//২০শে জুলাই, ২০১৮ ইং ৫ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Check Also

বিপদ জয় করে বিজয়ের দেশে ফিরে আসা

জার্নাল ডেস্ক : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’  সাক্ষাৎ বিপদ …

‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি’

জার্নাল ডেস্ক ‘টাকা দিয়ে বিপদ কিনেছি ‘।    এভাবেই নিজের হতাশার কথা  জানিয়েছেন বসনিয়ায় আটকে …