ভারতীয় সিরিয়ালের প্রভাবে হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতারণাসহ বাড়ছে অপরাধ 

0

এম হোসাইন : 

চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী সাদিয়া (ছদ্ধনাম)। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা সাদিয়ার খাতায় একদিন অস্বাভাবিক একটি পত্র দেখতে পায় গৃহ শিক্ষক। সেই পত্রে সাদিয়া, পারিবারিক অশান্তির কারণে আত্মহত্যার ইচ্ছার কথা লিখে। সৌভাগ্যবশত গৃহ শিক্ষকের হাতে চিঠিটি পড়ে, ফলে এ যাত্রায় বেঁচে যায় সাদিয়া। তবে, মনোবিজ্ঞানীদের মতে পারিবারিক অশান্তি আর সামাজিক বঞ্চনার কারণে নারী ও শিশুদের মধ্যে বিরুপ প্রভাব পড়ছে। তাছাড়া বিদেশী অপসংস্কৃতির প্রভাবে হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতারণাসহ নানা অপরাধ বাড়ছে।  

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আফজাল হোসেন‘র কাছে। তিনি বলেন, টেলিভিশনগুলোর অনুষ্ঠান সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে কম। তবে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। অনুষ্ঠানের অবস্থা আর পরিবারের অবস্থার মধ্যে মিল থাকলে সে ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ হয়। শিশুটি যেটা করেছে, সেটাকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। তার প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। একবার যার এমন চিন্তা মাথায় আসে, তার মধ্যে বারবার একই ধারনা আসতে পারে। তাই এ বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

আফজাল হোসেন বলেন, শিশু এবং নারীরা বেশি অনুকরণ করে। চ্যানেলের মাধ্যমে দেখা বাইরের বিষয়টা তাদের চিন্তা ধারায় ঢুকে পড়ে। যেটার মধ্যে তারা বেশি আনন্দ পায়, সেগুলোই বেশি করার চিন্তা করে। টিন এজারদের মধ্যে এ প্রভাবটা আরো বেশি।   

ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের চাকচিক্য, অভিজাত্যের দর্শনে বাঙালিদের মধ্যেও এক ধরনের বিলাসিতার বাসনা সৃষ্টি হচ্ছে। এর প্রভাবে বিবাহ-বিচ্ছেদ, আত্মহত্যা সহ নানা ধরনের অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে। এসব সিরিয়াল দেখে বাড়ছে হিংসা-বিদ্বেষ, চক্রান্ত, পারিবারিক কলহ, একাধিক প্রেমসহ নানা ধরনের প্রতারনা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে নারী ও শিশুরা।  আর এদের টার্গেট করেই নির্মাণ করা হয় এসব অনুষ্ঠান। ঈদ কিংবা পূজা, নববর্ষ কিংবা যেকোন উৎসবকে সামনে রেখে চলে এসব সিরিয়ালের অন্যরকম বানিজ্য। সিরিয়ালে নায়িকা কিংবা আকর্ষনীয় কোন নারীর নানান দিক আমাদের দেশের বিশেষ করে নারী ও শিশুদের প্রভাবিত করে। নায়িকার ড্রেস, আচার-আচরণ, ভঙ্গি সব কিছুই প্রভাবিত করে। শুধু এমনটাই নয়, আরো অনেক ভাবে এই সিরিয়ালগুলো অপরাধের পরোক্ষ মদদ দিচ্ছে। প্রতিটা সিরিয়ালেই পরকীয়া, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর অবিশ্বাষ, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর সন্দেহ, দেবর-ভাবীর মধ্যে পরকীয়াসহ বিভিন্ন চরিত্র আছে। আর এসব দেখে দেখে তার অনুকরন করছে আমাদের লোকজন (বিশেষ করে নারী ও শিশুরা)। সংসারের যত প্যাচ, সব আছে এসব সিরিয়ালে। পক্ষান্তরে এর প্রভাব পড়ছে আমাদের সংস্কৃতিতে। 

মনোবিজ্ঞানী আফজাল হোসেন বলেন, যে সব পরিবারে মা-বাবার সম্পর্ক ভাল থাকে না সেখানে সন্তানদের মধ্যে এ ধরনের প্রভাব বেশী লক্ষ্য করা যায়। অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু ফ্যাক্টর কাজ করে। আবার অপরাধের যথাযথ শাস্তি না হলেও অপরাধীরা অপরাধের দিকে বেশি ধাবিত হয়। এ বিষয়গুলো আমাদের আরো বেশি মনতাস্ত্রিক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। 

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যস্তজীবন এবং যৌথ পরিবার ভেঙে পড়ার ফলে টিভি যেন আমাদের আরও কাছের ও অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ হয়ে উঠেছে। অভিভাবকরা শিশুদের যথেষ্ট সময় না দিলে তারা একাকিত্ব বোধ করে এবং পর্যাপ্ত খেলাধুলার সুযোগ না থাকার ফলে সেই একাকীত্ব বোধ দূর করতে অগত্যা টিভিকে বেছে নেয়। আবার বাবা-মা উভয়ে যদি কর্মজীবী হন, তখন স্বভাবতই শিশু গৃহপরিচালকের কাছে বয় হয়, এবং অনেক সময় গৃহপরিচালকেরা শিশুকে ব্যস্ত রাখার জন্য টিভি দেখতে উৎসাহিত করে। ছোট শিশুরা সহজেই বিজ্ঞাপন ও কার্টুনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। প্রায় সময় দেখা যায় টিভির রিমোটটি তাদের হাতেই থাকে এবং টিভির উপর তাদের একারই রাজত্ব চলে। কিন্তু তারা যে শুধু কার্টুন চ্যানেলেই সীমাবদ্ধ থাকছে তা কিন্তু না, বরং সুযোগ পেলেই তারা কখনো মায়েদের সাথে অথবা একা বিভিন্ন হিন্দি গানের চ্যানেল, বাংলা (কলকাতা) ও হিন্দি সিরিয়াল দেখে। এ কথা সর্বজনবিদিত যে, বেশীর ভাগ শিশু এখন খেলাধুলা, বই পড়া, ছবি আঁকা, বন্ধুদের সাথে মেলামেশা, সৃজনশীল কাজ ইত্যাদির সুযোগ কম পায় এবং টিভি দেখায় বেশি সময় ব্যয় করে। সচেতন বাবা-মায়েরা কমবেশি সবাই জানেন যে, শিশুদের স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক-মানসিক উন্নয়নে টিভি একটি প্রধান অন্তরায়।

উল্লেখ্য, গত দুই বছরে ভারতীয় সিরিয়াল ‘বোঝেনা সে বোঝেনা’ এর নায়িকা পাখির নামরকনে পাখি থ্রি-পিস কিনে না দেওয়াতে আত্মহত্যা করেছে দেশের অনেক কিশোরী এবং গৃহবধু। এই ড্রেস কিনে না দেওয়ায় স্বামীকে হত্যা অথবা তালাক দেওয়ার মত ন্যাক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে। তাছাড়া এসব সিরিয়াল দেখতে না দেওয়ায় শিশুর আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম// আরডি/ এসএমএইচ // ৬ মে ২০১৬

Share.

About Author

Comments are closed.