ভরাট ও দখলের কবলে মহেশখালীর কোহেলিয়া নদী

0

সরওয়ার কামাল মহেশখালী :

মহেশখালী মাতারবাড়ীর মাঝখানে অবস্থিত কোহেলিয়া নদী । সৃষ্টি কালের যুগ যুগ ধরে  জোয়ার-ভাটায় অাপন গতিতে চলছে কোহেলিয়া নদীর স্রোত । কিন্তু অচিরেই কক্সবাজার তথা বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে এ নদীটি । সাম্প্রতিক মাতারবাড়ীতে দেশের সর্ববৃহৎ কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য মাতারবাড়ীর দক্ষিণে ১৪’শ ১৪ একর জায়গা অধিগ্রহণ করে বর্তমানে সেখানে মাটি ভরাট করে প্রকল্পের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ চলছে দ্রুতগতিতে । অার সে প্রকল্পের বিভিন্ন বর্জ্য ও পলি মাটি গুলো পাইপের মাধ্যমে সরাসরি কোহেলিয়া নদীর উপর ফেলায় দিন দিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদীটি । ফলে ঐ নদীর উপর চলাচল কারী ইঞ্জিনচালিত লবণের বোট ও বিভিন্ন ধরনের নৌ-যান চলাচ বন্ধ হওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে ।
এদিকে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের পলি মাটি নদীর পানির সাথে মিশে গিয়ে বর্তমানে নদীর পানি ঘোলাটে এবং দূষিত হওয়ায় প্রায় অর্ধশত চিংড়ি মাছের প্রজেক্টের মাছ মারা গেছে । এ কারনে চলতি চিংড়ি প্রজেক্টের ইজারাদাররা কয়েক’শ কোটি টাকা লোকসান হতে পারে বলে জানান চিংড়ি ব্যবসায়ীরা । দিন দিন ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে নদীটি নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে । নদীর পানি ঘোলাটে ও ভরাট হয়ে যাওয়ার কারেনই অাগের মত তেমন অার জেলেদের জালে মাছও ধরা পড়ছেনা । ফলে এ নদীর উপর নির্ভরশীল শত শত লোকজন তাদের বিভিন্ন পেশা হারিয়ে বেকার হতে পারে এমন অাশংকা সচেতন মহলের ।
বাংলাদেশ নদী মাতৃক দেশ,বাংলাদেশে ছোট বড় প্রায় ২৫০ টিরও বেশী নদ-নদী রয়েছে, অার এ নদীর উপর লাখ লাখ মানুষ তাদের পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন । তেমনি কক্সবাজার জেলার অারেক পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ নদী হচ্ছে মহেশখালীর কোহেলিয়া নদী । বর্তমানে এ নদীর উপর নির্ভরশীল উপজেলার কয়েক হাজার জেলে পরিবারের নারী-পুরুষ রয়েছে । কিন্তু এ নদী দিন দিন ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়ায় জেলেদের জালে অাগের মত তেমন অার ধরা পড়ছেনা সামুদ্রিক মাছ । মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ হওয়ার সুবাদে সেখানে নিরাপত্তার উজুহাত দেখিয়ে কোহেলিয়া নদীতে জেলেদের মাছ ধরাও নিষেধ করে দিয়েছে প্রকল্প নির্মাণ কর্তৃপক্ষ । তাই তাদের একমাত্র পেশা হারিয়ে এ নদীর উপর নির্ভরশীল অনেক জেলে এখন বেকার হয়ে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে সিমাহীন কষ্টের দিন যাপন করে যাচ্ছে। অন্য দিকে এ নদীর উপর দিয়ে চলাচল কারী ইঞ্জিন জাতীয় নৌ-যানও বন্ধ হওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে । নদী ভরাটের কারনে ভাটার সময় ছাড়াও পূর্ণ জোয়ারেও এখন বড় ও মাঝারি লবন বোট চলাচল করতে পারছে না । অাগে এ নদীতে দেখা যেত পাঁচ হাজার মণ ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন লবনের বোট চলাচল করলেও এখন সে বড় ও মাঝারি কোন ইঞ্জিন জাতীয় নৌ-যান চলাচল করতে পারছে না । শুধু তাই নয় এ নদীর উপর নির্ভরশীল ভিবিন্ন শ্রেণির পেশার মানুষের একমাত্র অায়ের উৎস হারিয়ে যাওয়ার অাশংকা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল । এদিকে নদীতে জেগে ওঠা চর গুলো একের পর এক খন্ড খন্ড ভাবে দখলে করে নিচ্ছে প্রভাবশালী ভূমি দস্যুরা । তারা প্রথমে ছোট ছোট বাঁধ দিয়ে মাছের ঘর তৈরি করে নদীর চর অবৈধ ভাবে দখল করে নিচ্ছে , ফলে দিন দিন ছোট হয়ে অাসছে কোহেলিয়া নদী । এভাবে একের পর এক ভূমি দস্যুরা নদীর চর দখলে নিলেও এ নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের । মাতারবাড়ীর আওয়ামীলিগ নেতা মাষ্টার মন্জুরুল আলম বলেন , কোহেলিয়া নদীটি যেভাবে দ্রুত ভরাট হচ্ছে একই ভাবে দখলের প্রতিযোগিতাও চলছে সমান তালে । সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এর বিহিত ব্যবস্থা না নিলে অচিরেই হারিয়ে যাবে এ নদীটি । তাই উক্ত নদীটি দখল মুক্ত করে ড্রেসিং এর ব্যবস্থা করার জন্য জোর দাবী জানাচ্ছি । হোয়ানকের লবন ব্যবসায়ী অাবদুল হক হেলালী বলেন , কোহেলিয়া নদীটি যেভাবে দিন দিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে তাতে মনে হয় ভবিষ্যতে এ নদীর অস্থিত্ব থাকবে না । অাগে এ নদী দিয়ে বড় বড় লবন বোট চলাচল করলেও এখন বড় বোট ছাড়াও ছোট ছোট লবনের বোটও অার অাসতে পারছেনা । এ কারনে লবন অানলোড করতে ব্যাপক হিমশিম খেতে হচ্ছে লবন ব্যবসায়ীদের । সরকার এ গুরুত্বপূর্ণ নদীটি ড্রেজিংএর ব্যবস্থা না করলে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে লবন চাষী ও ব্যবসায়ীরা । এতে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে বলেও জানান তিনি । কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নিশান বলেন , কোহেলিয়া নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় মারাত্বক প্রভাব পড়ছে নদীর দু-পাড়ের চিংড়ী প্রজেক্ট ও লবন চাষিদের । শীঘ্রই এ নদী ড্রেজিংএর ব্যবস্থা না করলে শত শত চিংড়ী প্রজেক্ট ও চাষিদের লবন মাঠে পানি নিষ্কাশনে বাঁধা গ্রস্থ হবে , এতে একদিকে যেমন দেশে লবন ঘাটতি দেখা দিবে অন্য দিকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে চিংড়ী মাছ ও কাঁকড়া ব্যবসায়ীরা অার প্রতি বছর শত কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে সরকার । বাংলাদেশ পরিবেশ অান্দোলন (বাপা’র) যুগ্ন সম্পাদক বিশিষ্ট পরিবেশবিদ শরীফ জামিল বলেন , যে কোন কারনে কোহেলিয়া নদী মারা গেলে এখান কার শত শত জেলে এবং লবন চাষী ও ব্যবসায়ীর জীবন হুমকির মূখে পড়বে । কাজেই প্রকৃতি এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্ভাবনা উল্লেখ করে তিনি বলেন , কোহেলিয়া নদীর অাশে পাশে চলমান অপরিকল্পিত ভরাট ও দখল প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করাসহ যতাযত ভাবে কোহেলিয়া নদীর সিমানা নির্ধারণ করে তা উদ্ধার করা উচিৎ বলে মনে করেন এ পরিবেশবিদরা ।
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কর্মকর্তা সাইফুল অাশরাফ এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন , মহেশখালীর কোহেলিয়া নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে এটা অামি অবগত নয় । তবে এ ধরনের হয়ে থাকলে নদী ভরাট এবং দখলদারের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে ।

সাব্বির// এসএমএইচ//২২শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং ৭ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Share.

About Author

Comments are closed.