চট্টগ্রামে আমনের বাম্পার ফলন: কৃষক পরিবারে আনন্দের বন্যা

0

চট্টগ্রাম ব্যুরো:

অতীতের রেকর্ড ভেঙে চট্টগ্রামে এবার আমনের বাম্পান ফলন হয়েছে। এতে কৃষক পরিবারে বইছে আনন্দের বন্যা। গ্রামের ঘরে ঘরে চলছে নবান্ন উৎসবের আমেজ। জেলার ১৪ উপজেলার বিস্তীর্ণ জমির মাঠে মাঠে এখন পাকাঁ সোনালী ধান। দিগন্ত বিস্তৃৃত মাঠের যে দিকে চোখ যায় সে দিকে শুধু ধান আর ধান। প্রতিটি উপজেলার ইউনিয়নে ব্লক সমুহের অধিকাংশ মাঠে মাঠে কাঁচা আধাপাকা ধান দোলা দিচ্ছে। এসময়ে কৃষকরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে পাঁকা ধান কেটে ঘরে তুলবেন। চলতি মাসের ২০ তারিখের পর শুরু হয় ধান কাটা উৎসব। ইতিমধ্যে ধান কেটে ঘরে তুলছে জেলার কৃষকরা। প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুকুলে থাকায় মাঠের ধান ঘরে তুলতে ও সুবিদা হচ্ছে কৃষদের। এবার ধানের ফলন ও আশানুরুপ। কৃষকদের মতে সময়ে সময়ে বৃষ্টিপাত হওয়ায় রোপা আমন ফলন খুব ভাল হয়েছে। তদুপরি এবারে তেমন বন্যা না হওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি আমন ধানের। তাছাড়া উপজেলা কৃষি বিভাগের নিবিড় পরিচর্যা, সঠিক পরামর্শ কৃষকরা কাজে লাগিয়েছে। যথা সময়ে মাঠ উপযোগী করে চারা লাগানো, সার দেয়া, কিটনাশক ছিটানো, পোকামাকড় দমন,ক্ষেতে পাচিং পদ্ধতি প্রয়োগ সহ নানা কারণে ও এবার আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিমত। এসব কারণে এক বছরের ব্যবধানে এখানে আমন আবাদ বেড়েছে ১৯ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে। কৃষকের কষ্ট বৃথা যায়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর নির্ধারণ করা হয়। তবে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবাদ হয়েছে ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে; যা গত বছরের চেয়ে ১৯ হাজার ৩৭১ হেক্টর বেশি।
চট্টগ্রাম জেলায় আমনের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৭৫ হাজার ৫৮৯ হেক্টর ধরা হলেও আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৪০০ হেক্টর। ২০১৬-১৭ মৌসুমে আবাদ হয়েছিল ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৭৫ হেক্টর। কক্সবাজার জেলায় ৭৮ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আবাদ হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে এবার ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৩ লাখ ৬৮ হাজার ৫৯৮ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি বছর আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে উফশী জাত ১ লাখ ৪৩ হাজার ৯০৮ হেক্টর, হাইব্রিড ১ হাজার ৮১৮ হেক্টর ও স্থানীয় জাত ২৯ হাজার ৮৬৩ হেক্টর জমিতে।
চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশে ১ হাজার ১০৫ হেক্টর, পতেঙ্গায় ৯৪০ হেক্টর, ডবলমুরিংয়ে ৪৮৫ হেক্টর, উপজেলার মধ্যে রাউজানে ১১ হাজার ২৫ হেক্টর, রাঙ্গুনিয়ায় ১৪ হাজার ৬১৩ হেক্টর, ফটিকছড়িতে ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর, হাটহাজারীতে ৮ হাজার ৯০০ হেক্টর, আনোয়ারায় ৬ হাজার ৭০০ হেক্টর, বোয়ালখালীতে ৩ হাজার ৮০০ হেক্টর, পটিয়ায় ১২ হাজার ৪০০ হেক্টর, বাঁশখালীতে ১৪ হাজার ৫০০ হেক্টর, সীতাকুন্ডে ৫ হাজার ৩০০ হেক্টর, মিরসরাইয়ে ২০ হাজার ৬২৮ হেক্টর, চন্দনাইশে ৮ হাজার হেক্টর, লোহাগাড়ায় ১০ হাজার ৮০০ হেক্টর এবং সন্ধীপে ২২ হাজার ৭২৩ হেক্টর জমিতে আমন চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
চলতি মৌসুমে আমনের বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৯৫৫ হেক্টর। এর মধ্যে হাইব্রিড ছিল ৯১ হেক্টর, উফশী ছিল ৭ হাজার ৯৯৫ হেক্টর ও স্থানীয় জাত ১ হাজার ৮৬৯ হেক্টর।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম জেলায় এবছর আবাদ হয়েছে পাঁচটি উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান। স্থানীয় জাতের মধ্যে কালিজিরা, বিন্নি, বালাম, রাজাশাইল, কাজলশাইল, কালামোটা, চাক্কল, গিউস এবং উফশী জাতের ব্রি-১০, ব্রি-১১, ব্রি-২২, ব্রি-২৩, ব্রি-২৫, ব্রি-৩০, ব্রি-৩১, ব্রি-৩২, ব্র্রি-৩৯, ব্রি-৪০, ব্রি-৪৬, ব্রি-৫১, ব্রি-৬২ এবং ব্রি-৪৯, ব্রি-৪০, ব্রি-৫২, বিআর-২৩ ধান।
জেলার মিরসরাইয়ে এখন চলছে ধান কাটার উৎসব। উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এবার পুরো উপজেলায় ৭ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। প্রকৃতি অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। সীতাকুন্ডে চলতি বছরে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭ হাজার হেক্টর। ফলন হয়েছে সাত হাজার ৩শ’ হেক্টর জমিতে। বাঁশখালীতেও চলছে ধান কাটার উৎসব। উপজেলায় ১৪ ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ৬৫০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়। উপকূলীয় ইউনিয়নের কৃষকরা ব্রি-৪৭ ও ব্রি-৩৯ ধান চাষে সফলতা পেয়েছেন। প্রতিবছর জুলাই-আগস্ট মাসে আমন ধান চাষাবাদ শুরু হলেও আবহাওয়া তারতম্যের কারণে জুন মাসেই দুই জাতের ধান চাষে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। বোয়ালখালীতে গত পাঁচ বছর ধরে আমন ধানের ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, বোরো চাষে সেচ ও সারসহ খরচ বেশি হয়। কিন্তু আমন চাষাবাদে সেই ঝুঁকি নেই।
পটিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, কৃষকরা এখন আমন চাষাবাদে আগ্রহী হয়েছেন। কয়েক বছর ধরে জিংকসমৃদ্ধ জাতের ধানে ভালো ফলন হচ্ছে। অতিবৃষ্টি ও বন্যায় আউশ রোপণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও অনুকূল পরিবেশের কারণে আমন উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মনিটরিং ও মূল্যায়ন কর্মকর্তা শামিম আহমেদ হেলাল মানবকন্ঠকে বলেন, প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদের ৮২৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। আমন চাষাবাদে কৃষকদের জন্য বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ সহজে পাওয়া যাচ্ছে। এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ বেড়েছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ধানে ব্লাস্টসহ অন্যান্য রোগের আক্রমণ কমে গেছে। খরচও কম হওয়ায় কৃষকরা আমন ধানের আবাদ করছেন। কৃষি অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়েছেন। চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলতি মৌসুমে আমনের আবাদ রেকর্ড গড়েছে।

সাব্বির// এসএমএইচ//২৫শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং ১০ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Share.

About Author

Comments are closed.