আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে মুসলিম জাহানের ৫৪তম বিশ্ব ইজতেমা

0

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সাদ অনুসারীদের আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে আজ মঙ্গলবার শেষ হচ্ছে মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় ধর্মীয় সমাবেশ তবলিগ জামাতের ৫৪তম বিশ্ব ইজতেমা। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে এ মোনাজাত হবে বলে জানিয়েছে আয়োজক কমিটি। তা পরিচালনা করবেন দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের শীর্ষ মুরব্বি ও ইজতেমার জিম্মাদার মাওলানা শামীম আহমদ। তার আগে হবে হেদায়েতি বয়ান। তবে অনুসারীরা চাইছেন, প্রতিবছরের মতো যেন সামনের বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদ কান্ধলভি অংশ নেন।

পাশাপাশি যাদের সঙ্গে আদর্শগত মিল নেই, তাদের নিয়ে কোনো ইজতেমা হবে না বলে জানান তবলিগের মুরব্বি মাওলানা আশরাফ আলী। এদিকে দ্বিতীয় পর্বের আখেরি মোনাজাত উপলক্ষেও পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা। থাকছে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয়। গত রবিবার বাদ ফজর ভারতের মাওলানা মো. ইকবাল হাফিজের আমবয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবারের বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় অংশের আনুষ্ঠানিকতা।

তার পর শীর্ষ মুরব্বিদের গুরুত্বপূর্ণ বয়ান শোনে ও নফল নামাজ, তসবিহ-তাহলিল, জিকির-আসগারে গতকাল দ্বিতীয় দিন শেষ করেন ইজতেমায় অংশ নেওয়া মুসল্লিরা। তবে প্রথম দিন সকালে হঠাৎ বজ্রসহ বৃষ্টির হানায় ইজতেমা ময়দানে অবস্থানরত মুসল্লিরা পড়েন চরম দুর্ভোগে। বৈরী আবহাওয়ায় জবুথবু হয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা পার করতে হয়েছে তাদের। ভিজে একাকার হয়ে যায় সঙ্গে থাকা মালসামান। অনেকে রান্নাবান্নাও করতে পারেননি সেদিন।

তবে দুর্ভোগ উপেক্ষা করেই ময়দানে অবস্থান নেন তবলিগ জামাতের সাদপন্থি মুসল্লিরা। এদিকে গতকাল মাঠ প্রস্তুতিতে সময় কম পাওয়া এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ইজতেমা আরও এক দিন বাড়ানোর অনুরোধ জানান মুরব্বিরা। পরে স্বরাষ্ট্র ও ধর্ম মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আলোচনা করে সময় বাড়ায়।

এ বিষয়ে মাওলানা আশরাফ আলী বলেন, আখেরি মোনাজাতের জন্য এক দিন বাড়ানোর সিদ্ধান্তে খুশি মুসল্লিরা। তারা মুরব্বিদের সিদ্ধান্ত মেনে মোনাজাতের পরই ময়দান ত্যাগ করবেন। তবে ইজতেমায় দুগ্রুপ হওয়ায় দ্বীনের দাওয়াতের ক্ষতি হয়েছে বলে আক্ষেপও করেন তারা।

সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় প্রশাসনের আগের মতো প্রস্তুতি রয়েছে উল্লেখ করে পুলিশ কমিশনার ওয়াইএম বেলালুর রহমান বলেন, ‘আগত মুসল্লিদের যেন কোনো ধরনের সমস্যা না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি রয়েছে। ওয়াচ টাওয়ার, সিসিটিভি, মোটর সাইকেল টহলের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।’

যারা বয়ান করলেন : সোমবার বাদ ফজর দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের মাওলানা মুরছালিন বয়ান করেন। বাংলায় অনুবাদ করেন মাওলানা আব্দুল্লাহ মনসুর। সকাল সাড়ে ১০টায় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্দেশে বয়ান করেন ইকবাল হাফিজ ও এলাহাবাদের শাহেদ। এ ছাড়া খাওয়াছদের (ভিআইপি) বয়ান করেন নিজামুদ্দিন মারকাজের মুফতি সাজিদ। বধিরদের উদ্দেশে বয়ান করেন নিজামুদ্দিন মুরব্বি মাওলানা ওমর মেওয়াতি। আরবি খিত্তায় বয়ান করেন বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল্লাহ মনসুর এবং ইংরেজি খিত্তায় নিজামুদ্দিন মুরব্বি প্রফেসর লিয়াকত। এ ছাড়া মালয়েশীয় খিত্তায় বয়ান করেন নিজামুদ্দিন মারকাজের মুফতি শাহজাদ ও মুফতি রিয়াছত, উর্দু খিত্তায় নিজামুদ্দিন মারকাজের মাওলানা শওকত, রুশ (রাশিয়া) খিত্তায় প্রফেসর নওশাদ, চায়না খিত্তায় মাওলানা আসআদ।

বিদেশি নিবাসে সংবাদ সম্মেলন : আখেরি মোনাজাত পরিচালনা, সামনের বছর অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব ইজতেমা ও মাওলানা সাদের আগমনসহ নানা বিষয় নিয়ে ময়দানের বিদেশি কামরায় গতকাল সংবাদ সম্মেলন করা হয়। এতে দেশি মুসল্লিদের জিম্মাদার ও ইজতেমার মুরব্বি মাওলানা আশরাফ আলী বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। তিনি জানান, এ বছর মাওলানা সাদ কান্ধলভি ইজতেমায় আসেননি। তবে তার পক্ষে ৩২ জনের একটি প্রতিনিধি দল এসেছে। তাদের মধ্য থেকে মাওলানা শামীম মঙ্গলবার সকাল ১০টায় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করবেন।

এক প্রশ্নের জবাবে আশরাফ আলী বলেন, ‘মাওলানা সাদ কান্ধলভিকে যারা আমির মানেন, তারা চাইছেন প্রতিবছরের মতো সামনের বিশ্ব ইজতেমায় তিনি যেন আসেন। তার মাধ্যমেই বিশ্ব ইজতেমা তথা সারা দুনিয়া উপকৃত হয়। এ জন্য আগামী বছর তার অংশগ্রহণ আমরা নিশ্চিত করতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘মাওলানা সাদের অনুমতি নিয়ে আমাদের ইজতেমার তারিখ নির্ধারণ করতে হয়। এ কারণে আগামী বছর ইজতেমার তারিখ এখনো নির্ধারণ হয়নি।’ বিভাজনের বিষয়ে আদর্শগত বিরোধকে দায়ী করে মাওলানা আশরাফ আলী আরও বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আদর্শগত পার্থক্য থাকবে ততদিন ইজতেমা একসঙ্গে করার প্রশ্নই আসে না। আদর্শ ভিন্ন রেখে একসঙ্গে হওয়া মানে হচ্ছে সংঘাত ডেকে আনা।’

এ সময় বিদেশি জামাতের সমন্বয়কারী রেজা আরিফ, আব্দুল্লাহ শাকিলসহ ইজতেমার মুরব্বিরা উপস্থিত ছিলেন। এদিকে ইজতেমার সার্বিক ব্যবস্থাপনা পরিদর্শনে গতকাল ইজতেমা ময়দানে আসেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহ। আগামী বছর দুগ্রুপকে ঐক্যবদ্ধ করে ইজতেমা আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আগামীতে যাতে ঐক্যবদ্ধভাবে পরস্পরের ভেদাভেদ ভুলে টঙ্গীর ময়দানে আগের মতো ইজতেমা করতে পারি, সে জন্য আল্লাহর কাছে তওফিক কামনা করি।’

এবার পাঁচ দিনব্যাপী ইজতেমার প্রথম দুদিন জোবায়ের অনুসারীরা অংশ নেন। শনিবার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় তাদের আয়োজন। ইজতেমায় এক মুসল্লির মৃত্যু : টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে ইসমাইল হোসেন নামে এক মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। তার বাড়ি বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলায়। বার্ধক্যজনিত কারণে রবিবার রাত ১টার দিকে খিত্তায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। বাদ ফজর ইজতেমা ময়দানে এই বৃদ্ধের জানাজা হয়।

যানাবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ : আখেরি মোনাজাতে লোকজন আসার সুবিধার্থে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচলে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। সোমবার মধ্যরাত থেকেই আব্দুল্লাহপুর থেকে ভোগড়া বাইপাস এবং মীরেরবাজার থেকে স্টেশন রোড পর্যন্ত উভয়মুখী মহাসড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ট্রেন সার্ভিস : টঙ্গীর রেলওয়ে স্টেশনের কর্মকর্তা মো. হালিমুজ্জামান জানান, আখেরি মোনাজাতের দিন মুসল্লিদের সুষ্ঠুভাবে যাতায়াতের জন্য ১১ জোড়া বিশেষসহ ১২০টি ট্রেন টঙ্গীতে যাত্রাবিরতি করবে।

 

নিলা চাকমা/এসএমএইচ//  মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৭ ফাল্গুন ১৪২৫,

Share.

About Author

Comments are closed.