ইস্টার্ন ব্যাংকের ১৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ, ৩৯ শীর্ষ কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা

0

রুবেল দাশ, চট্টগ্রাম :

চট্টগ্রামে ইস্টার্ন ব্যাংকের ১৩ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ৩৯ জন কর্মকর্তা জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। টাকা আত্মসাতের মামলা দুদকের এখতিয়ার হলেও মূল ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে থানায় ১০টি মামলা করে। পুলিশ বিষয়টি জেনেও থানায় মামলা নেয়। এ ঘটনায় ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাসহ মোট ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় যাদের ৫ জনই ব্যাংকের গ্রাহক। গ্রাহক হয়ে কিভাবে ব্যাংকের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় তারা জড়িত সেটিও সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারছে না ব্যাংক।
এছাড়া অভিযুক্ত দুই ব্যাংক কর্মকর্তা বলছেন, জোর করে ও নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্যাংক তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে স্বীকারোক্তি নিয়েছে। এখন সেগুলোই আদালতে পেশ করবেন বলে তাদের পরিবারকে নানাভাবে হয়রানি করছে।

দুদকের মামলা হলেও তদন্ত শুরু করে পুলিশ,
আদালতের নির্দেশে মামলা যায় দুদকে

দুদক সূত্র জানায়, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড ঢাকার গুলশান শাখার তিন কর্মকর্তা মুহাম্মদ আজিম উল্লাহ, শাহেদ বিন মান্নান ও অনন্ত কুমার খাঁ বাদী হয়ে গত ৮ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও থানায় আটটি এবং চকবাজার থানায় দুটিসহ দশটি মামলা করেন। একটি মামলার এজাহারে বলা হয়, ইস্টার্ন ব্যাংক চান্দগাঁও শাখার গ্রাহক কনা দে-কে তাঁর হিসাবে জমা হওয়া সাড়ে ১৩ লাখ টাকার এফডিআর খুলতে ২০১৬ সালের জুন মাসে অনুরোধ করেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মো. ইফতেখারুল কবির। এই অনুরোধে সাড়া দিয়ে এফডিআর খুলতে রাজি হন কনা দে। কিন্তু ব্যাংক কর্মকর্তা ‘ভুয়া সিল ও সই’ দিয়ে তাঁকে একটি রসিদ দেন এবং কৌশলে একটি চেকে সই করিয়ে নেন। গত ১৮ এপ্রিল কনা দে তাঁর এফডিআরের বিপরীতে কোনো ঋণসুবিধা পাবেন কি না, জানতে ব্যাংকে খোঁজখবর নেন। তখন ব্যাংক থেকে বলা হয়, ওই নামে কোনো এফডিআর নেই। তদন্তে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া চেকের মাধ্যমে ইফতেখারুল টাকাগুলো উত্তোলন করে ফেলেন। এভাবে অনন্যা বড়ুয়া, রুপম বড়ুয়া, সুপ্রভা বড়ুয়া, জেসমিন ইউসুফ, আবু সাঈদসহ ২৫ গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
মামলায় ইস্টার্ন ব্যাংকের ও আর নিজাম রোড শাখার ব্যবস্থাপক মো. ইফতেখারুল কবির এবং ওই শাখার ব্যাংক কর্মকর্তা সামিউল শাহেদ চৌধুরীসহ সাতজনকে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিরা পরষ্পর যোগসাজশে জাল কাগজের মাধ্যমে গ্রাহক ও ব্যাংকের ৭ কোটি ৯৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। ইস্টার্ন ব্যাংকের চান্দগাঁও এবং ও আর নিজাম রোড শাখায় ওই ঘটনা ঘটার কারণে সংশ্লিষ্ট দুটি থানায় মামলা করতে যায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
এ ধরনের মামলা কেন নিলেন জানতে চাইলে চান্দগাঁও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আবদুর রহিম বিডিজার্নালকে বলেন, ‘ভুলে আমরা মামলা নিয়ে ফেলেছি। আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর কাগজপত্র দুদকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে দেব।’ চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রিয়াজ উদ্দিন চৌধুরীও জানান একই কথা।
আদালত সূত্র জানায়, মামলাগুলোর অনুলিপি নিয়মানুযায়ী থানা থেকে আদালতে আসার পর পুলিশের ভুলটি উঠে আসে। চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আবু সালেম মোহাম্মদ নোমান ১৮ আগস্ট এক আদেশে উল্লেখ করেন, ‘ইস্টার্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে থানা-পুলিশ অভিযোগটিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ করে তা ডিবি পুলিশকে তদন্তের জন্য দিয়েছে। যা দুদক আইন ও বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই অবস্থায় দুদককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অভিযোগ ও কাগজপত্র পাঠানোর জন্য থানা-পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হলো।’
এদিকে, ভুক্তভোগীরা মনে করছেন ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বাঁচানোর জন্যই ব্যাংক পুলিশের কাছে মামলা নিয়ে যায়। কারণ এত বড় একটি প্রতারণা ব্যাংকের দুই কর্মকর্তার মাধ্যমে কখনোই সম্ভব নয়। যেখানে ব্যাংকের প্রতিটি লেনদেনে শীর্ষ কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর থাকা আবশ্যক। এছাড়া প্রতি বছরই দেশের প্রত্যেকটি ব্যাংককে তাদের বার্ষিক লেনদেনের হিসাব দিতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সেখানে ইস্টার্ন ব্যাংক কিভাবে ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিটকে পাশ কাটিয়ে গেল সেটি একটি রহস্যজনক ব্যাপার।
এ বিষয়ে জানার জন্য এ প্রতিবেদক চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে দেখা করেন অভিযুক্ত ইফতেখার কবিরের সাথে। তিনি বলেন, আমি কোন হ্যামিনের বাঁশিওয়ালা নই যে, আমি বাঁশি বাজিয়েছি আর সবাই মোহগ্রস্থ হয়ে আমাকে টাকা দিয়ে গেছে। যা কিছু হয়েছে তা ব্যাংকিং নিয়মকানুন মেনেই হয়েছে। সমস্ত কিছু ব্যাংকের ৩৯ জন এর অথোরাইজেশনের মাধ্যমে হয়েছে এবং সর্বশেষ অথোরাইজেশন ঢাকা হেড অফিস থেকে পাওয়ার পর লেনদেন সম্পূর্ণ করা হয়। এত কিছু কিভাবে আমার পক্ষে একা করা সম্ভব? আমাকে অন্যায়ভাবে জেলখানায় আটক করিয়েছে তারা।
তিনি বলেন, ব্যাংকে তদন্ত চলাকালীন সময়ে আমার কাছ থেকে অনেক সাদা কাগজ এবং স্টাম্পে জোর করে সাক্ষর নিয়ে রেখেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। আমার পরিবারকে গুম করা হবে বলেও হুমকি দিয়েছে। এছাড়া যে ১৩ কোটি টাকার কথা বলা হচ্ছে তার মধ্যে ১১ কোটি টাকা আমি ব্যাংকে জমা করেছি। আর ২ কোটি টাকা ব্যাংকের সবাই মিলে আত্মসাৎ করেছে। এখন আমার কাছে তারা ১৩ কোটি টাকা দাবি করছে। যে সকল একাউন্ট থেকে টাকা বের হয়েছিল সেগুলোর তদন্ত করলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।
ব্যাংকের বাইরে যাদের আসামি করা হয়েছে তারা কেউ জড়িত আছে কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ব্যাংকিং কার্যক্রমে ব্যাংকের কর্মকর্তা ছাড়া বাইরের সাধারণ জনগণ কিভাবে সহযোগিতা করতে পারে? যাদের আসামি করা হয়েছে তারা সবাই ব্যাংকের গ্রাহক। চাঁন্দগাও শাখার বর্তমান ব্রাঞ্চ ম্যানেজার পারভেজ, পূর্বের চাঁন্দগাও ব্রাঞ্চ ম্যানেজার নিজাম উদ্দিন ও এরিয়া হেড ইফতেখার উদ্দিনসহ চট্টগ্রাম ও ঢাকা হেড অফিসের ৩৯ জনের সাক্ষরে অনুমোদন করা হয়েছিল ঐ সমস্ত লেনদেন। ব্যাংকিং টার্গেট পূরণের জন্যই এগুলো করা হতো। যার কারনে সবার প্রমোশন, ইনক্রিমেন্ট এবং ব্রাঞ্চের লক্ষ্য পূরণ হতো।
ব্যাংকটির চাকরিচ্যুত প্রায়োরিটি ম্যানেজার সামিউল সাহেদ চৌধুরীকে এ ঘটনায় জড়িত থাকার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বিডিজার্নালকে বলেন, আমি তখন জিইসি ব্রাঞ্চে কর্মরত ছিলাম। আমার ৫ বছরের এই ব্যাংকের ক্যারিয়ারে আমার এক টাকারও দুর্নীতি ছিল না। ব্যাংক আমাকে অন্যায়ভাবে সাসপেন্ড করেছে। আমাকে কোন প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তো দিচ্ছেই না তার উপর এনওসি দিবেনা বলেও জানিয়ে দিয়েছে। অথচ যে ব্রাঞ্চ থেকে এই অপকর্ম হয়েছে এক ইফতেখার ছাড়া সবাই তাদের নিজ নিজ পদে বহাল তবিয়তে আছে।
আরেক অভিযুক্ত ব্যবসায়ী মো. জাকির হোসেন বাপ্পীর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিডিজার্নালকে বলেন, ভাই আমি একজন ব্যবসায়ী। আমি সুনামের সাথে বিগত ১৬ বছর ধরে এই শহরে ব্যবসা করে আসছি। ইস্টার্ন ব্যাংকে ১২ বছর ধরে আমার একটি একাউন্ট আছে। এছাড়া আমার স্ত্রীরও একটি একাউন্ট আছে যেটির বয়স ৭ বছর। ব্যাংক কর্মকর্তা ইফতেখার কবিরের সাথে সুসম্পর্ক থাকার কারনে প্রায়ই ইফতেখার আমার কাছ থেকে কিছু লভ্যাংশ দিবে বলে টাকা ধার নিত যা পরবর্তীতে লভ্যাংশসহ যথাসময়ে ফেরতও দিত। এখন এসব লেনদেন দেখিয়ে ব্যাংক বলছে আমিও টাকা আত্মসাতের সাথে দায়ী।
তিনি বলেন, আমি কিভাবে তাকে আত্মসাৎ এ সহযোগিতা করতে পারি? আমি কি ইস্টার্ন ব্যাংকে চাকরি করি? নাকি ইফতেখার আমাকে অনৈতিকভাবে ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা লোন পাইয়ে দিয়েছে ব্যাংক থেকে যা আমি আত্মসাৎ করেছি। তারা নিজেরাই এসব কান্ড ঘটিয়ে আমাদের উপর দোষ চাপানোর বৃথা চেষ্টা করছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইস্টার্ন ব্যাংক চট্টগ্রামের এয়িয়া হেড ইফতেখার উদ্দিনের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করলে তিনি বিডিজার্নালকে বলেন, বিষয়টি আদালতে তদন্তাধীন। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না।
দুদকের মামলা থানায় কেন করলেন এ প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এগুলো ফোনে বলা যাবে না। আপনি আমার অফিসে আসেন। চা-নাস্তা খান। তারপর সরাসরি বলব।
জানতে চাইলে দুদক চট্টগ্রামের পরিচালক মাহমুদ হাসান বিডিজার্নালকে বলেন, আদালত নির্দেশ দেওয়ার পর পুলিশ অভিযোগটি দুদককে ফেরত দেয়। থানায় রেকর্ড হওয়ায় করণীয় জানতে দুদক প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কিছু জানানো হয়নি। মামলার শুনানি শুরু হলে সব বিষয়েই তদন্ত করা হবে।

সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

Share.

About Author

Comments are closed.