এমপিও’র বৈঠকে যা বললেন শিক্ষামন্ত্রী

0

জার্নাল ডেস্ক

স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একযোগে এমপিওভুক্তির দাবিতে আন্দোলরত শিক্ষক প্রতিনিধিদের সাথে রোববার রাত ৮টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটে দুই ঘণ্টাব্যাপী এক বৈঠক হয়। ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যক্ষ গোলাম মাহদুন্নবী ডলার এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ ড. বিনয় ভূষণ রায়ের নেতৃত্বে ২২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

সেখানে এমপিওর বিষয়ে কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি। তিনি বলেন, আমরা যদি এমন এক জায়গায় থাকতাম যা কিছু ইচ্ছে করলেই করে ফেলতে পারি তাহলে এরচেয়ে আর ভালো কিছু হতে পারতোনা। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নাই যা খুশি তা করে ফেলতে পারে। আমাদের সকলেরই সীমাদ্ধতা আছে সরকারে থাকলেতো আরও বেশি সীমাবদ্ধতা।

আমাদের কারিগরি শিক্ষকদের নিয়ে এমন একটি বিপদের মধ্যে ছিলাম বহু দিন ধরে। এখনো কিছুটা আছে। আপনারা কিন্তু মনে করবেনা বা ভাববেন না যে আমরা ইচ্ছে করে আপনাদেরকে বিপদে ফেলছি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা নন এমপিও শিক্ষকদের বাঁচতে দেয়া যাবেনা। এদেরকে একটা বিপদে ফেলে রাখতে হবে। এরকম কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে বসেছি আপনাদের ধারণা? আপনাদের কী ধারণা? একটা কথা বলেছেন আমি সংসদে বলেছিলাম? হ্যা,আমি সংসদে বলেছিলাম। আমরা সবাই চাই এমপিও হোক। আপনি সংসদে একজন এমপি পাবেন না এমনকি স্পিকারসহ প্রধানমন্ত্রীসহ যে এমপিওর দরকার নাই বলবে। প্রত্যেক এমপি বলে এমপিও চাই। এই এমপিও নিয়ে সংসদে গিয়ে প্রত্যেকের প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে।

আমার এলাকায় গোটা কয়েকটা প্রতিষ্ঠান, তারা আমার ভোটার না? সেখানে কি আমার আত্বীয়স্বজন বন্ধু বান্ধব, আমাদের দলের নেতাকর্মী কি চাকরি করে না? তাদের পরিবারে কী সদস্য নাই। আপনাদের কি মনে হয় আমরা এই দুনিয়ার বাইরের মানুষ। আপনাদের কি মনে হয় আমরা ভীন্নজগতের মানুষ? আমরা যা কিছু একটা করে ফেললাম। আর যার যা কিছু হয়ে যাক। এটা কি সম্ভব? আপনারা বলেন এটা সম্ভব কি না? এমন কোনো কিছু আছে বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নিলে সেই সিদ্ধান্তটার ব্যাপারে জবাবদিহীতা করতে হবে। পছন্দ না হলে আমার সেই সিদ্ধান্তের জন্য মানুষের ক্ষোভ রাগ দুঃখ থাকবেই। আপনি কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনি সবাইকে খুশি রাখতে পারবেন না। আপনি যদি বলেন সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এপিওভুক্ত করেন।

আপনারা জানেন সব প্রাইমারি স্কুলকে জাতীয়করণ করা হয়েছে। কত বছর লেগেছে জাতীয়করণ করতে? ৪০ বছর লেগেছে তাই না? তাহলে ওই ৪০ বছরে কেনো হয় নাই? সবারইতো ইচ্ছা ছিলো।

এখন মনে করেন আপনারা যারা আসছেন আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কি ধরনের প্রতিষ্ঠান? বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। একটা দেশে সবকিছু একটা কাঠামোর মধ্যেতো চলে তাই না? সরকারি বেসরকারি সকল প্রকারের প্রতিষ্ঠান, সকল প্রকারের ব্যক্তি সরকারের নিয়মনীতি মেনেই চলতে হয়। সরকার নিজেকেই নিজের আইনের মধ্যে থাকতে হয়। এই যে আমি সরকারের নিয়ম মেনে চলি অতএব আমিতো সরকারি না। নিয়ম সবাইকে মানতে হবে।

আমি সরকারি হলেও মানবো, বেসরকারি হলেও মানবো। আপনারাতো জানেন আপনারা কি ধরনের প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছেন। সরকার কি বলেছে ভাই তুমি চাকরিটা নাও আমি তোমাদের বেতন দেবো। তাতো বলে নাই। বরং গত বেশ কিছু বছর ধরে স্বীকৃতি পায়। আর স্বীকৃতির অন্যতম শর্ত হলো আপনি এমপিও চাইতে পারবেন না। ঠিক কিনা? তাই না? আপনার যখন ২০০৩, ২০০৪-৫-৬ তখনতো এমপিও দেওয়ারই কোনো কথাবার্তা ছিলো না। তখন মন্ত্রী এমপিরা তাদের ইচ্ছামতো প্রতিষ্ঠান করে দিয়েছে। নিজেদের ইচ্ছামত চাকরি দিয়েছে আবার নিজেদের ইচ্ছামতো এমপিও করে দিয়েছে। এখন এমপিও নীতিমালা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ি কিছু প্রতিষ্ঠান এমপিও হয়েছে। অর্থাৎ যে প্রতিষ্ঠানগুলো নীতিমালা অনুযায়ি চলছে তাদের হয়েছে। একটা প্রতিষ্ঠান করার ব্যাপারে একটি নিয়ম নীতি আছে।

২০০৩-২০০৪ সালে যখন এমপিওভুক্ত হতো তখন কি কোনো নিয়ম নীতি মেনে প্রাপ্যতা যোগ্যতা দেখে এমপিও দেয়া হয়েছে? স্বীকৃতিপাপ্ত সকল প্রতিষ্ঠান কি তখন এমপিওভুক্ত ছিলো? সবতো ছিলোনা। তখন কোনো নীতিমালা ছিলোনা। তখন স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হলেই এমপিও দেয় হতো। তখন কোনো ক্রাইটেরিয়া মানতে হতো না। তখন একজন এমপি এসে বলছেন, এমনি প্রতিষ্ঠান হয়ে গেছে, একজন মন্ত্রী এসে বলছে আমার এখানে একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে গেছে। এমনও আছে পাশাপাশি স্কুল- কলেজ হয়ে গেছে। আর আরেক জায়গায় বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে সেই প্রতিষ্ঠান এমপিও হয়নি। তখন কোনো নীতিমালা ছিল না। ২০০৯ সালে এসে একটা নীতমালা তৈরি করা হয়েছে। একটা ক্রাইটেরিয়া করা হয়েছে যে এই এই শর্ত পূরণ হলে এমপিও দেয়া হবে। আমাদের অনেক মন্ত্রী এমপির দরখাস্থ পড়ে আছে, আমরা কিন্তু দিতে পারছিনা। কারও আছে পাঠদানের অনুমতি, দিতে পারছিনা কারও আছে স্বীকৃতি, দিতে পারছিনা। আমার উপর দিয়ে চাপ যাচ্ছে। আমিতো নিয়মের বাইরে যেতে পারবোনা। কারণ এখন নিয়মনীতিগুলো মানা হয়েছে। কাজেই সেসময় কি হয়েছে? সেসময়তো নিয়মনীতি মানা হয়নি।

আমরা তালিকা চেয়েছিলাম। আমরা তালিকা দিয়ে কি করবো আমাদের যার যার এলাকায় কোনো যায়গায় হয়তো বলেছে পাচঁটা দেন আমার আছে পঞ্চাটা আমার পাচঁটা দিতে হয়েছে। আমি পছন্দ করে পাচঁটা দিয়েছি। কেউ হয়তো সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট করেছে সেরকম পাচঁটা দিয়েছে। কেউ হয়তো নিজের পছন্দমতো পাচঁটা দিয়েছে। কেউ আত্মীয় স্বজনের প্রতিষ্ঠান আছে সে পাচঁটা দিয়েছে। যেমন করেই হোক সেই তালিকা নিয়ে বিরাট সমস্যা ছিলো আপনারা জানেন। তারপরও সেটার দায়িত্ব পরে আমাদের শিক্ষা উপদেষ্টা মহোদয়কে দেয়া হয়েছে। এক সময় উপদেষ্টা মহোদয় স্ট্রোক করে একবারে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আর এমপিও নিয়ে এত রকমের বিতর্ক এ জন্যতো বন্ধ হয়েই আছে। ১৮ সালে আমি ছিলাম না। আমি ছিলাম না বলেতো দায়িত্ব এড়াতে পারি না। একটা নীতিমালা করা হয়েছে। নীতিমালা ছিলোনা নীতিমালা করা হয়েছে। আগে একটা ছিলো তার কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে। নীতিমালা কোরান হাদিস না যে বদলানো যাবেনা। নিশ্চয়ই বদলানো যাবে। কোনো অসঙ্গতি ভুল-ত্রুটি থাকলে বদলানো যাবে। আইন পরিবর্তন করা যায় এমনকি সংবিধান সংশোধন করা যায়। আমাদের সংবিধানেও সংশোধন রয়েছে। সংবিধান সংশোধন করা যায় আইনও করা যায়, নীতমালাও করা যায়। আগের নীতিমালাটা ভালো মনে করা হয় নাই। তাই নতুন নীতিমালাটা করা হয়েছে। নীতিমালতেই আপনারা আপত্তি করছেন। আপত্তি করেই আন্দোলনে গেছেন।

আমার আগে যিনি দায়িত্ব ছিলেন তিনি আপনাদের বলেছেন নীতিমালাতো পরিবর্তন করা যায়। তিনিতো ঠিকই বলেছেন। কিন্তু নীতিমালাতো পরিবর্তন হয় নাই। সেসময় আন্দোলন করেছেন। কিন্তু আজকে যেভাবে আলাপ আলোচনা হচ্ছে যদি সেভাবে আলাপ আলোচনাটা হতো হয়তো সেসময়ই পরিবর্তনের একটা সুযোগ থাকতো। আপনারা বলছেন আমি চাকরি নিলাম দুই বছর আগে সেসময় তো নিয়োগ ছিলো। আপনারা যারা চাকির পেয়ে গেছেন তো গেছেনই। সেখানেতো আর নতুন করে চাকরি হওয়ার বিষয় নাই। আমি যখন একটা বেসরকারি শিক্ষককে সরকারিতে আনবো সেখানে তো একটা নীতিমালার ভিত্তিতেই আনবো। আপনারা ঠিকই বলেছেন। প্রতি বছর যদি ২০০-৫০০ প্রতিষ্ঠান এমপিও যদি দিতে পারতাম তাহলে কোনো ঝামেলা হতোনা।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি প্রতি বছর দিতে পারি নাই। দশ প্রায় লেগে গেছে আমরা দিতে পারি নাই। দিতে না পারার অনেক কারণ ছিলো। বিতর্ক ছিলো, নীতিমালায় অসঙ্গতি ছিলো, আমাদের বাজেটের অপ্রতুলতা ছিলো ইত্যাদি কারণ ছিলো। মূল কথা হলো দেওয়া হয়নি। এখন বর্তমানে আসলে গতবছর এটা নিয়ে নীতিমালা হয়েছে। নীতিমালা নিয়ে আপত্তি করছেন। সেসময় যদি ব্যাপক একটা আলাপ আলোচনার মাধ্যমে যদি একটা সমাধানে যাওয়া যেতো তাহলে ভালো হতো। যে কারণেই হোক সে উদ্যেগ হয়তো নেওয়া হয়নি। এখন ২০১৯ সাল। আমরা দায়িত্ব আসছি। আমরা দায়িত্ব এসে পেলাম এমপিওভুক্তির জন্য নীতিমালা হয়েছে, নীতিমালা অনুযায়ি দরখাস্ত চাওয়া হয়েছে ৯ হাজারের বেশি দরখাস্থ পড়েছে। আপনাদের দেয়া দরখাস্ত, বেনবেইজের তথ্য অনুসারে অনলাইনে দরখাস্তের ভিত্তিতে অনলাইনেই সকল তথ্য নিয়ে অনলাইনের মাধ্যমেই একটা তালিকা করা হয়ে গেছে।

আমি এসে জানুয়ারিতে পেলাম একটা তালিকা প্রস্তুত আছে। তারপর আপনাদের আন্দোলন দেখলাম। আমি নিজে নীতিমালাটা দেখেছি। আমি মনে করি নীতিমালাটি সংশোধন প্রয়োজন। এটা আমি বিশ্বাস করি। আমি অকপটে বলতে পারি এই নীতিমালাটা পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। এই নীতিমালায় গ্রাম এবং শহরের মধ্যে শিক্ষার্থী সংখ্যায়, পরিক্ষার্থীর সংখ্যায় তফাৎ আছে। শহরে বেশি গ্রামাঞ্চলে কম। শহরে আর গ্রামে পাশের হারেতো একটি তফাত আছেই । আমাদের শিক্ষার্থীর হারে তফাত থেকে থাকে । নীতমালা করার আগে পাশের হারের বিষয়ে চিন্তা করা উচিত ছিলো। বর্তমান নীতিমালা করার ক্ষেত্রে আরো ভালো ভাবনা থাকতে পারতো। এখন আমি যে অবস্থা পেলাম এখন আমার কি করণীয়। আমি আইনজীবী হিসাবে আইনের সুবিধাটা যেমন বুঝি আইনের সমস্যাটাও বুঝি। একটা নীতিমালার মাঝখানে গিয়ে সব পরিবর্তন করা যায়না। হলে সেটা মামলা মোকদ্দমায় গড়াবে।

সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬

Share.

About Author

Comments are closed.