যে কারণে আত্মহত্যা করছেন ঢাবি শিক্ষর্থীরা

0

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। চলতি বছরে এখন অবধি আটজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা গেছে। কেবল নভেম্বরেই আত্মহত্যা করেছেন তিনজন। বিশেজ্ঞদের মতে, দেশে আত্মহত্যার ঘটনাগুলো ঘটছে অচরিতার্থ প্রেম, বিচ্ছেদ, লেখাপড়ার চাপ, পারিবারিক চাপ, বেকারত্ব এবং হতাশার কারণে।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সালমান সিদ্দিকী জানান, প্রত্যেকটি আত্মহত্যাই কী একেকটি হত্যা নয়?’ তিনি বলেন, ‘আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর পেছনে আর্থসামাজিক কারণ রয়েছে, রয়েছে একটি অমানবিক সমাজের বাস্তবতা। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে মর্যাদার সম্পর্কের পরিবর্তে এখন রাজা-প্রজার সম্পর্ক বিরাজমান। বাড়ছে হল ও বিভাগ ফি, বাড়ছে আর্থিক অনিশ্চয়তা। হলগুলোতে দখলদারির মাধ্যমে দাসব্যবস্থা তৈরি করে রাখা হয়েছে। এই অমানবিক অবস্থাই ছাত্রদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন।

প্রগতি বর্মণ তমা নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় এখন মানবিক, সৃজনশীল ও স্বপ্নবান মানুষ তৈরির পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের অনুগত মানুষ তৈরিতে ব্যস্ত। প্রতিটি আত্মহত্যা মানে একেকটি স্বপ্নের মৃত্যু। একজন মানুষকে সরাসরি হত্যা করলে হত্যাকারীর শাস্তি হয়। কিন্তু যে রাষ্ট্র অমানবিক পরিবেশ তৈরি করে বহু মানুষকে হত্যা করছে, তার শাস্তি কে নিশ্চিত করবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপার্সন ও স্টুডেন্টস কাউন্সিল এবং গাইড্যান্স সেন্টারের পরিচালক মেহজাবিন হক বলেন, প্রেমে ব্যর্থতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং পারিবারিক সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে।

তিনি বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে যে আত্মহত্যা কখনো সমাধান হতে পারে না। সব মানুষকেই তাদের জীবনে সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, কিন্তু আত্মহত্যার পথে সমাধান নেই।

শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং সেন্টারগুলোয় যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, যদিও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া উচিত, বাংলাদেশে এটি সাধারণভাবে উপেক্ষিত হয়ে থাকে। যে কোনো সংকট মোকাবেলায় শিক্ষার্থীদের নিজেদের ভেতরকার শক্তি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা, ইতিবাচক জীবনদৃষ্টি গড়ে তোলা এবং যে কোনো পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবে সামাল দেয়া উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক একেএম গোলাম রব্বানি বলেন, ‘আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। আমি জীবনকে এভাবে উপেক্ষা না করতে তাদের অনুরোধ করছি। তাদের বোঝা উচিত; তাদের জীবন তাদের পরিবার ও জাতি উভয়ের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।’

২১ নভেম্বর রাজধানীর অদূরে টঙ্গীতে নিজ বাসায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হুজাইফা রশিদ। পরিবারের ধারণা, একাডেমিক হতাশা থেকে সে আত্মহত্যা করতে পারেন।

গত ১৬ নভেম্বর যশোরে গ্রামের বাড়িতে আত্মহত্যা করেন ঢাবির ২০১০-১১ সেশনের প্রাক্তন ছাত্রী মেহের নিগার দানি। তিনি বেশ কিছুদিন ধরে বন্ধুদের এড়িয়ে চলতেন। বন্ধুদের ভাষ্যমতে, দানি একা একা ও বিষণ্নতার মধ্যে থাকতেন।

প্রেম ঘটিত কারণে চলতি মাসের ১২ নভেম্বর রাজধানীর ফার্মগেটে একটি হোস্টেলে ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করেন বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ফাহমিদা রেজা সিলভি।

এছাড়া চলতি বছরের শুরুতে ১৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর হাজারীবাগের নির্মাণাধীন একটি ভবনের ছাদ থেকে নীচে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন স্যার এ এফ রহমান হলের আবাসিক ছাত্র ফিন্যান্স বিভাগের তরুণ হোসেন। তার বন্ধুরা জানান, বিভাগের পড়ার চাপ ও সাদামাটা জীবনযাপনের জন্য সবার নিগ্রহ তাকে হতাশাগ্রস্ত করে। শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেই জীবনের ইতি টানেন।

গত ৩১ মার্চ বিজনেস ফ্যাকাল্টির এমবিএ ভবনের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন সান্ধ্য কোর্সের শিক্ষার্থী তানভীর রহমান। দীর্ঘদিন ধরে চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকে তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন বলে তার সহপাঠী ও পরিবারের সদস্যরা জানান।

১৫ আগস্ট রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় আত্মহত্যা করেন সংগীত বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মুশফিক মাহবুব। আত্মহত্যার আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি দেশের শিক্ষা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেয়া স্ট্যাটাসটি ছিল- ‘আই ওয়ান্ট ফ্রিডম অ্যাজ এ বাংলাদেশি ইভেন ইফ ইট কিলস মি ফর দ্য রিজন’।

এ ছাড়া ১০ সেপ্টেম্বরে রাজধানীর রামপুরায় নিজ বাসায় ফ্যানের সঙ্গে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দেন আফিয়া সারিকা নামের এক ছাত্রী। যিনি মার্কেটিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত ছিলেন। নিহতের পরিবারের ধারণা, প্রেম সংক্রান্ত কোনো কারণে সারিকা আত্মহত্যা করতে পারেন।

গত ১৫ অক্টোবর গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র জাকির হোসেন। পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারেন বলে ধারণা তার বন্ধুদের।

সাব্বির// এসএমএইচ//২রা ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

Share.

About Author

Comments are closed.