নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চট্টগ্রামে আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান

0

নিজস্ব প্রতিবেদক :

আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও চট্টগ্রাম নগরের আবাসিক এলাকাগুলো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) যথাযথ তদারকি ও অভিযানের অভাবে নগরের প্রত্যেকটি আবাসিক এলাকা গিলে খেয়েছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এসব আবাসিক এলাকাগুলোকে দেখে বোঝার উপায় নেই এগুলো আদৌ আবাসিক এলাকা কি-না।

জানা যায়, সিডিএ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, বহদ্দারহাট সিডিএ আবাসিক এলাকা ও সিডিএ কর্তৃক অনুমোদিত আবাসিক এলাকা নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি, হিলভিউ আবাসিক এলাকা, উত্তর খুলশী সোসাইটি এবং নগরীর ও.আর নিজাম রোড আবাসিক এলাকা, দক্ষিণ খুলশী আবাসিক এলাকা পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠা ছোট-বড় অসংখ্য ব্যক্তিমালিকানাধীন আবাসিক এলাকা ও ভবন শুধুমাত্র নামেই আবাসিক এলাকা ও ভবন।

সিডিএ’র খাতায় থাকা পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। নগরীর প্রায় সকল আবাসিক এলাকায় এবং আবাসিক ভবনে শিল্প কল-কারখানা, স্কুল-কলেজ, মার্কেট, হাসপাতাল, ক্লিনিক, মেসেজ পার্লার, বিউটি পার্লার, রেস্ট হাউস, শপিং মল, টেইলারিং শপ, রেস্টুরেন্টসহ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। এতে করে যারা বসবাস করার জন্য বাসা-বাড়ি করেছেন কিংবা ভাড়া নিয়েছেন তারা প্রতিনিয়ত বিড়ম্বনায় পড়ছেন। আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কর্মকান্ড  চলায় সাধারণত লোক সমাগম বেড়ে যায়। তার সাথে যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে যানজটের সৃষ্টি হয়। এদিকে আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠা এসব অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনায় ওয়াসা, কর্ণফুলী গ্যাস, বিদুৎ বিভাগ সংযোগ দিয়েও ‘সহায়তা’ করে যাচ্ছে শুরু থেকেই।
বিভিন্ন সময় সিডিএ’র পক্ষ থেকে জনগণের সতর্কতার জন্য কিছু বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে দায় শেষ করে। বাস্তবে এ পর্যন্ত কোনো অভিযান পরিচালনা কিংবা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উল্লেখযোগ্য নজির নেই বললেই চলে। শুধু তাই নয়, কেউ নিজ থেকে এ সকল অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে শুধুমাত্র নোটিস প্রদান করে দায়িত্ব শেষ করা হয়। বরং ওই অভিযোগ ও নোটিসকে ভিত্তি করে অনেক অসাধু পরিদর্শক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আর্থিক লাভবান হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। সরেজমিনে এর প্রমাণও পাওয়া যায়।

নগরীর নাসিরাবাদ হিলভিউ হাউজিং সোসাইটির ১ নং রোডের হাজী মো. ইউনুস ম্যানসনের (প্লট নং-বি/০৪) মালিক মো. ইউনুস তার ভবনের নিচতলায় তিনটি দোকান ও দ্বিতীয় তলায় মারকাজুন নূর তা’লীমুল কুরআন মাদরাসা নামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন। আবাসিক এলাকায় কিভাবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ আবাসিক এলাকার প্রত্যেকটি ভবনের নিচে এরকম দোকান আছে। সবাই বন্ধ করে দিলে আমিও বন্ধ করে দেব।

সিডিএ’র অনুমতি আছে কিনা, এ প্রশ্নের উত্তরে হেসে তিনি বলেন, সিডিএ’র লোকজন কিছুদিন পর পর আসে। আসলে তাদেরকে খুশি করতে হয়। এভাবেই চলছে। বাকিটা আপনি বুঝে নেন। ২০১৫ সালের ৮ জুন মন্ত্রিসভায় বৈঠকে আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক স্থাপনার বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগ মন্ত্রী পরিষদে এর আলোকে কয়েকটি সুপারিশ করে। মন্ত্রী পরিষদ এসব সুপারিশ থেকে চারটি সুপারিশ পাস করে।

সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিলো, আবাসিক এলাকায় বার লাইসেন্স বাতিল করে সেগুলো অপসারণ করা হবে। আবাসিক এলাকায় নতুন করে কোনো বারের লাইসেন্স দেওয়া হবে না। আবাসিক এলাকার সব গেস্ট হাউজ ও আবাসিক হোটেল বন্ধ করতে হবে। প্লট মালিককে এসব স্থাপনা সরাতে ছয় মাসের সময় দেওয়া হবে। এর মধ্যে স্থাপনা না সরালে পরবর্তী এক মাসের মধ্যে সেগুলো অপসারণ করা হবে। আবাসিক এলাকার অননুমোদিতভাবে স্থাপিত সবধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছয় মাসের মধ্যে সরাতে হবে। যেসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরকারের অনুমোদন নিয়ে আবাসিক এলাকায় কার্যক্রম চালাচ্ছে, সেসব স্থাপনা সরাতেও সংশ্লিষ্টদের সময় দেওয়া হবে। মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আবাসিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক স্থাপনা সরাতে ছয় মাসের সময় শেষে সিটি কর্পোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেবে। সরকারের এমন সিদ্ধান্তের পর চট্টগ্রাম মহানগরীর মধ্যে আবাসিক এলাকায় সকল ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন ইস্যু বন্ধ রাখে সিটি কর্পোরেশন। সিডিএ আবাসিক এলাকার অনাবাসিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযানও শুরু করে। প্রাথমিকভাবে এসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে স্ব-উদ্যোগে সরে যাওয়ার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে করা হয় জরিমানা। মালিক পক্ষকে সময় দিয়ে বাণিজ্যিক স্থাপনা সরিয়ে নিতে আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। তবে ইতিমধ্যে সে সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও বেশিরভাগ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়ে গেছে আবাসিক এলাকায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএ’র অথরাইজড-১ অফিসার মনজুর হাসান বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আবাসিক এলাকা থেকে অনাবাসিক স্থাপনা সরিয়ে নিতে আমরা অভিযান পরিচালনা করেছিলাম। অনেককে সময়ও দেয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে অনেকে তাদের স্থাপনা সরিয়ে নিয়েছে, অনেকে নেয়নি। পরবর্তিতে সিডিএতে ম্যাজিস্ট্রেট ছিলো না বলে আর অভিযান হয়নি। এখন আমাদের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আছে। শীঘ্রই অভিযান শুরু হবে। তবে ভবন মালিকদের কাছ থেকে সিডিএ পরিদর্শকদের উৎকোচ নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।

বিডিজার্নাল

Share.

About Author

Comments are closed.