নওগাঁয় ধান-চাল কেনার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা  

0

আব্দুল মান্নান, নওগাঁ প্রতিনিধি :

৫ মে (বৃহস্পতিবার) সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার ঘোষণা থাকলেও কোন নির্দেশণা না আসায় খাদ্যে উদ্বৃত্ত নওগাঁয় সরকারি ভাবে ধান-চাল কেনার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে কৃষক ও চাতাল ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কবে ধান-চাল কেনার সরকারি নির্দেশনা আসবে তা জানাতে পারেননি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন। এদিকে সংশ্লিষ্টরা ধান-চাউল কেনার কার্যক্রম শুরু করতে না পারাকে আমলা জটিলতাকে বলে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগকে।

জেলা খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ মে খাদ্য মন্ত্রাণালয় থেকে ৭ লাখ মেট্রিক টন ধান ও ৬ লাখ মেট্রিকটন ধান কেনার ঘোষণা দেয়া হয়। ঘোষণা মত আজ/ গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে ধান ও চাউল কেনার কার্যক্রম শুরু নির্দেশ দেয়া হয়। এর মধ্যে এই প্রথম বারের মতো ধানগুলো সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কেনার ঘোষণা দেয়া হয়। আর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ধান প্রতি কেজি ২৩ টাকা (৯২০ টাকা মণ দরে) ও চাল ৩২ টাকা দরে। চালগুলো কেনা হবে চাতাল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি থেকে ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়েছে। জেলায় ইত্যে মধ্যে ৭৫ ভাগ জমিতে ধান কাটা মাড়াই শেষ হয়েছে। আগামি ৬/৭ দিনের মধ্যে সম্পন্ন ধান কাটা মাড়াই শেষ হবে। জেলায় চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে এক লাখ ৮৯ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৪.২০ মেট্রিক টন (বিঘা প্রতি ২১ মণ)। জেলায় চলতি মৌসুমে মোট ৭ লাখ ৭০ হাজার ২১০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেক ধানই মোটাজাতের বিআর ২৮, বিআর ২৮, হাইব্রিড, খাটো-১০ ও পারিজা জাতের। বাঁকিটা চিকন জাতের জিরাশাইল ধান।

কৃষকরা জানিয়েছেন, এক বিঘা জমিতে ধান চাষাবাদ করে ঘরে তুলতে ১৩/১৪ হাজার টাকা খরচ হয়। চলতি মৌসুমে ধান মাড়াই শেষে প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ২০/২২ মণ ধান উৎপাদন হচ্ছে। এ দিকে বোরো ধান মাড়াইয়ের ভরা মৌসুমে দেখা দিয়েছে শ্রমিকের সংকট। বর্তমানে মোটা জাতের প্রতি মণ ধান কেনা বেচা হচ্ছে সাড়ে ৪শ’ থেকে ৪শ’ ৬০ টাকায়। আর চিকন জাতের জিরাশাইল ধান সাড়ে ৭শ’ থেকে ৭শ’ ২০ টাকা দরে কেনা-বেচা হচ্ছে। বর্তমানে ধানের বাজার হিসেব অনুযায়ী ধানের দাম না থাকায় উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে প্রান্তিক কৃষকদের প্রতি বিঘায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে।

কৃষকরা অভিযোগ করে বলেন, ধান কাটা মাড়াই শুরু দিন পনেরো আগে থেকে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার ঘোষণা ও প্রক্রিয়া শুরু করলে কৃষকরা ধানের নায্য মূল্য পেত। কিন্তু সরকার দেরিতে ধান শুরু করায় প্রান্তিক কৃষকরা ধানের দাম না পেলে এখন সরকার দলীয় নেতাকর্মী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেটের কারণেই তারাই লাভবান হবে।

নওগাঁ সদর উপজেলার বরুনকান্দি গ্রামের আমজাদ হোসেন জানান, ধান চাষিরা ঋণ নিয়ে জমিতে ধান চাষ করে থাকেন। এসব কৃষকরা ধান মাড়াই শেষে তাদের ঋণের টাকা দ্রুত পরিশোধ করতে হয়। এই কারণেই ক্ষুদ্র কৃষকরা ইত্যে মধ্যে তাদের ধান বিক্রি করে দিয়েছেন। তিনি আরো জানান, সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার সংবাদ তারা জানেন না।

রাণীনগর উপজেলার ঝিনা গ্রামের আজাদুল হক জানান, সরকার এই প্রথমবারের মত ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছ থেকে ২৩ টাকা কেজি দরে অর্থাৎ প্রতি মণ ৯২০ টাকা দরে ধান ঘোষণা দেয়াকে স্বাগত জানালোও সরকারিভাবে জেলা ও উপজেলা পর্যায় নির্দেশণা না আসায় ক্ষোভ জানান।

জেলা চাউল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন জানান, সরকার দলীয় নেতাকর্মী ও  মধ্যস্বত্বভোগিদের সিন্ডিকেটের কারণে অতীতে কোন সময়ই কৃষক সরকারি মূল্যে গুদামে ধান সরবরাহ করতে পারেনি। এ বছরও পারবে না বলে বিশ্বাস করেন। তিনি আরো জানান, ৬০ কেজি ধানে ৩৮/৩৯ কেজি চাউল উৎপাদন হয়। বর্তমান ধানের দাম অনুযায়ী চাউলের উৎপাদন খরচ হচ্ছে সাড়ে ২৫ টাকার মত। প্রতি কেজি চাউল ৩২ টাকা দাম নির্ধারণ করায় চাতাল মিলারদের কিছুটা লাভ ভালো হবে বলে মনে করেন। চাল কেনার কোন নির্দেশনা না আসায় জেলার প্রায় ১২শ’ চাতাল ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কবে থেকে চাল কেনা হবে জেলা খাদ্য অফিস সূত্রে জানা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির নওগাঁর সাধারণ সম্পাদক মহসিন রেজা জানান, দেশের ৮০ ভাগই যেখানে কৃষক সেখানে কৃষকদের স্বার্থ না দেখে চাতাল মিলারদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্যেই সরকার ব্যস্থ দেখা যাচ্ছে। তা না হলে প্রতি কেজি চাল উৎপাদন করতে যেখানে মাত্র ২৫ টাকা হচ্ছে সেখানে ৩২ টাকা নির্ধারণ করা প্রশ্নবিদ্ধ। সরকার ৫ মে থেকে ধান-চাল কেনার ঘোষণা দিলেও দশ/এগারো দিন পরেও কিনতে না পারা ও নির্দেশণা না আসায় মন্ত্রণালয়ের কান্ডজ্ঞানহীন কর্মকান্ডের জন্যে কর্মকর্তাদের দোষা দেন। সময় মত ধান ও চাল কিনতে না পারায় কৃষক ও চাতাল ব্যবসায়ীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক। আদৌও ধান-চাউল কেনা শুরু করতে পারবে কি না তা নিয়ে জেলা কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

তিনি আরো জানান, সরকারের এই উদ্যোগ ভালো হলেও কৃষকরা হয়রানি, দূনীতিমুক্ত চাউল কেনা ও তা সময় মতো বাস্তবায়ন করা দরকার। খাদ্য বিভাগ আসলে আমলাতান্ত্রিক নির্ভর। আমলাদের ক্ষমতা খর্ব করে মন্ত্রণালয়কে ঢেলে সেজে কৃষি বান্ধব করার দাবি জানান এ রাজনৈতিকবিদ।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, সরকারের নির্দেশনা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আসা মাত্র দ্রুত কার্যক্রম স্বচ্ছতার সাথে বাস্তবায়ন করা হবে। কবে নির্দেশণা আসবে তা তার জানা নেই। অপর প্রশ্নে তিনি আরো জানান, এখানে কোন প্রকার অনৈতিক কার্যক্রম হতে দেবেন না।

খাদ্যে উদ্বৃত্ত নওগাঁয় প্রতি বছর প্রায় ১১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক ট্রন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ধান-চাল সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম// আরডি/ এসএমএইচ // ৫ মে ২০১৬

Share.

About Author

Comments are closed.