ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য

0

মো. মুছা খালেদ :

প্রাচীন ভারতে চার্বাক নামে একটি চিন্তাগোষ্ঠী ছিলো এঁদের দার্শনিক চিন্তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে অতিমাত্রায় ভোগবাদী বা আনন্দপ্রিয় অলস মানুষের নিকট চার্বাকদের কদর ছিলো অসামান্য কেননা তাদের ভোগবাদী জীবন ভাবনার সাথে চার্বাকদের ছিলো তাত্তি¡ সমর্থন তাঁরা বলতেন: ‘যাবৎ জীবেৎ, সুখং জীবেৎ, ঋণং কিত্য ঘৃতং পীবেৎঅর্থাৎযতদিন বাঁচো, সুখ করে যাও, ঋণ করে হলেও ঘি খাওএই দার্শনিক ¤প্রদায় সুখ বা আনন্দ অন্বেষণকে জীবনের মূখ্য কাম্য বিষয় বলে মনে করতেন সুখ বা আনন্দ অন্বেষণকে তাঁরা ভালো বা উত্তম কাজ বলে মনে করতেন তাঁদের এই মতবাদ নীতিদর্শনে আনন্দবাদ বা সুখবাদ বলে পরিচিত

 প্রাচীন গ্রিসের সাইরেনিক সম্প্রদায়ের দার্শনিকগণ চার্বাকদের মতো সুখকেই জীবনের কাম্য বলে মনে করতেন। এই উভয় ¤প্রদায়ই স্থুল আত্মসুখবাদী বলে পরিচিত। অর্থাৎ নিজের সুখকেই এঁরা প্রাধান্য দিতেন এবং যে কোন প্রকারেই হোক যত নোংড়া পদ্ধতিতেই হোক তা অর্জনকেই এঁরা কাম্য মনে করতেন। এঁরা বর্তমানবাদীও বটে। ভোগের বস্তু হলেই তাকে কাম্য বস্তু বলা যায় না। কাম্য বস্তু বলা হয় তাকে যা কামনা করা উচিত বা ন্যায়সংগত। কিন্তু মানুষ অনেক সময় এমন সব বিষয় কামনা করে যা তার কামনা করা উচিত নয়। সিরেনাইকগণই পাশ্চাত্য স্থূলসুখবাদী বা উগ্রভোগবাদী চিন্তার উদ্যোক্তা। তাছাড়া মধ্যযুগের ধর্মীয় অনুশাসনে এসব উগ্রচিন্তা স্তিমিত হয়ে যায়। রেনেসাঁর পর থেকে মানুষ অনেক ভালো কিছু লাভ করলেও তার সাথে চিন্তার অবাধ যে স্বাধীনতা লাভ করে তাতে কিছু অযাচিত বিষয়ও ঢুকে পরে মানুষের চিন্তা আচরণে। শিল্পবিপ্লব, ব্যাপক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির পথ ধরে সমকালীন সভ্যতায় এসে আবারও অনেক মানুষ বাছবিচারহীন আনন্দ র্তির দিকে ছুটে চলছে

ঈদের আনন্দ উপর্যুক্ত আনন্দের মতো কোন স্থূল আনন্দ বা অপেক্ষাকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠদের আনন্দ নয়। ঈদের আনন্দ সর্বজনীন। ঈদের শিক্ষা হলো সকল ভেদাভেদ ভুলে ধনী, গরীব, জ্ঞানী, মুর্খ, শাসকশাসিত সকলে মিলে একসাথে উৎসব করা। ঈদ উপলক্ষে যদি মানুষ ভেদাভেদ ভুলে পরস্পর একাকার না হতে পারে তাহলে তা স্বার্থক ঈদ পালন হয় না। ঈদ উপলক্ষে সবাই যাতে আনন্দ করতে পারে সে পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব সকল সচেতন মানুষের

ঈদউলফিত্র আসে দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পরে। রমজান মাসের রোজা মানুষকে না খেয়ে থাকার কষ্ট বুঝতে সাহায্য করে। এতে করে দরিদ্র মানুষের দূরবস্থা সম্পর্কে ধনীকশ্রেণীর প্রত্যক্ষ ধারণা জন্মে। রোজা মানুষের কামক্রোধ, ভোগলিপ্সা নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা প্রদান করে। শিক্ষা সার্থক হয়েছে কিনা তার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায় ঈদ উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে। ঈদের আনন্দ কেবল নিজের এবং নিজের পরিবারের মধ্যে সীমিত না করে এই আনন্দকে যথা সম্ভব সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া, সকলের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়ার মধ্যে দিয়েই ঈদের আনন্দ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে ঈদের দিনে সবশ্রেণির মানুষ পরস্পর হিংসাবিবাদ বৈষম্য ভুলে পরস্পর উৎসবে মিলিত হয়। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় এক সুন্দর সামাজিক সংহতি। এই সৌহার্দ্যপূর্ণ সংহতির পরিবেশ সৃষ্টিই ঈদের যথার্থ তাৎপর্য। ঈদ উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে কাঙ্খিত সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিষয়

অন্তরায় সৃষ্টি করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি দিক হলো ধনীক শ্রেণির অপচয়মূলক কর্মকান্ড বা মাত্রাতিরিক্ত কেনাকাটা এবং দাম্ভিকতাপূর্ণ আচরণ। যাদের অতিমাত্রায় সম্পদ আছে তাদের অনেকেই ঈদকে উপলক্ষ করে মাত্রাতিক্তি জামাকাপড়, খাদ্যদ্রব্যসহ বিভিন্ন সামগ্রি ক্রয় করার মহোৎসবে মেতে ওঠেন। এতে করে বাজারদর বৃদ্ধি পায়। ফলে অল্প আয়ের মানুষের পক্ষে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রি ক্রয় করা কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। সামর্থ্যবানরা তাদের সন্তানের জন্য অনেকগুলো জামাকাপড় কেনার সময় তাদের একটু ভাবা উচিত যে গরীব মানুষ বা অল্প আয়ের মানুষ তাদের সন্তানের জন্য হয়তো একটি ঈদের পোশাকও কিনতে পারছেন না। তাই অধিক পরিমাণে নিজ পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনাকাটা না করে গরীব আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী অধিনস্ত কর্মচারীদের পরিবারের সদস্যদের জন্য কিছু বাজেট রাখলে ঈদের আনন্দে তাদেরও অংশীদার হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়

এমন অনেক মানুষ আছে ঈদের দিনে নতুন পোশাক পড়া তো দূরের কথা রুটিন মাফিক ক্ষুধার অন্নও তাদের ঘরে থাকে না। রমজানের একমাসই তারা রোজা থাকার কারণে তারা অভুক্ত থাকে তা নয়, মাঝে মধ্যেই দিনে রাত্রে তাদের অভুক্ত থাকতে হয়। ঈদ তাদের জীবনে তেমন কোন বৈচিত্র্যই আনে না, বরং নতুন মাত্রায় দুঃখ বয়ে আনে। ধরনের গরীব মানুষের কথা বলতে গিয়ে কবি নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় বলেছেন :

জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসেনা নীদ,

অভুক্ত সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?’

এরকম কৃষক, শ্রমিক তথা যে কোন পেশার অভাবী মানুষও যাতে ঈদের আনন্দে অংশগ্রহণ করতে পারে সেদিকে সকল সামর্থবানদের নজর রাখা উচিত। ঈদ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলেও অন্যান্য ধর্মের মানুষও এই আনন্দে অংশগ্রহণ করতে পারে। ভোজনপর্ব থেকে শুরু করে অন্যান্য সকল আনন্দফূর্তিতে তাদের অংশীদার করা বিশেষ করে এই জনপদের মানুষের বহুদিনের পালিত সংস্কৃতির অংশ। তাছাড়া ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকারের প্রতিও অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই কেউ যদি আত্মীয়, প্রতিবেশী, অধিনস্থ কর্মচারী এবং অভাবী মানুষদের ভুলে ভোগবাদী মানসিকতা দ্বারা পরিচালিত হয়ে আত্মসুখ অনুসন্ধান করার প্রয়াসে ঈদ পালন করেন, তাহলে তার ঈদ ইসলামি নীতি আদর্শ অনুযায়ী পালন করা হবে না। মনে রাখা প্রয়োজন ঈদ ইসলাম নির্দেশিত একটি আনন্দ উৎসব। এই আনন্দ উৎসব হবে সর্বজনীন। সকল ভেদাভেদ ভুলে হিংসাবিবাদ বিসর্জন দিয়ে এক ঐশরিক প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সকলে মিলে আনন্দ করার মধ্যেই রয়েছে ঈদ পালনের সার্থকতা। কবির ভাষায় :

মন রমজানের রোজার শেষে, এল খুশির ঈদ,

তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ

 

Share.

About Author

Comments are closed.