ভেঙ্গে পড়ল নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী দুবলহাটি রাজবাড়ি

0

বিডিজার্নাল নওগাঁ প্রতিনিধি :

রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে নওগাঁ জেলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দুবলহাটী রাজবাড়িটির শেষরক্ষা আর হলো না। কিন্তু কয়েকদিনের টানা বর্ষণে সোমবার বিকাল ও রাতে দুই দফায় এক অংশের অনেকটা ভেঙ্গে পরে যায়। নওগাঁর বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে এটি ছিল একটি যা নওগাঁবাসীর আতœ অহংকারের একটি। দীর্ঘদিন রাজবাড়িটি ছিল পর্যটকদের আকর্ষনের কেন্দ্র। নওগাঁ শহর থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে নওগাঁর ঐতিহ্যবাহি দুবলহাটি রাজবাড়ি। প্রায় দু’শ বছরের প্রাচীন এই রাজবাড়ি।  
প্রাসাদের ওই অংশে বসবাসকারী মো: আলম জানান, সোমবার বিকেলে একবার ও রাত ১টায় একবার অর্থাৎ দু’ দফায় ধ্বসে পড়ে প্রাসাদের অংশটি। এসময় তাঁর পালিত প্রায় ৭৬ জোড়া পায়রা প্রসাদের ধ্বংসস্তুপের নীচে চাপা পড়ে মারা গেছে। প্রাসাদটির যা কিছু ক্ষতি হয়েছে সব করছে মানুষ। এখন প্রাসাদটির দর্শনীয় আর কিছুই রইল না। দীর্ঘদিন রাজবাড়িটি ছিল পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। শুধু যথাযথ নজড়দারি ও রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে প্রাচীন এই রাজবাড়িটি শেষ পরিণতির দিকে। বিশাল এই প্রাসাদের বিভিন্ন স্থাপনা অমানবিক ভাবে একটি একটি করে খুলে নিয়ে গেছে দুবৃত্তরা। যেনো দেখার কেউই ছিল না। এখন পর্যটকরা দেখছেন আর দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন।
জানা গেছে, রাজা হরনাথ রায় চৌধুরী ও তার পুত্র রাজা কৃঙ্করীনাথ রায় চৌধুরীর সময় ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয় রাজ ষ্টেটের। তখন তাদের বার্ষিক আয় ছিল সাড়ে ৪ লাখ টাকা। ৫ একর এলাকা জুড়ে বিশাল প্রাসাদ। আর প্রসাদের বাইরে ছিল দীঘি, মন্দির, স্কুল, দাতব্য চিকিৎসালয়, ১৬ চাকার রথসহ বিভিন্ন স্থাপনা। রাজ প্রাসাদের সামনে রোমান স্টাইলের বড় বড় পিলার গুলো রাজাদের রুচির পরিচয় বহন করে। ১৮৬৪ সালে রাজ পরিবারের উদ্যোগে একটি স্কুল স্থাপন করা হয়। পরবর্তিতে স্কুলটি নামকরন হয় রাজা হরনাথ উচ্চ বিদ্যালয়। স্কুলটিতে ইংরেজী পড়ানো হতো। প্রধান শিক্ষক ছিলেন একজন ইংরেজ। রাজা হরনাথ রায় চৌধুরীর প্রজা জন্যে জনহিতকর ও সামাজিক কাজের অবদান আছে অনেক। প্রতি বছর ষ্টেটের খরচে ৫ জন করে গরীব ও মেধাবী ছাত্রদের লেখা-পড়ার ব্যবস্থা ছিল। 

 সংক্ষিপ্ত ইতিহাস থেকে আরও জানা যায়, রঘুনাথ নামের এক ব্যক্তি লবন ও গুড়ের ব্যবসা করতেন। তিনি দীঘলি বিলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত খয়রা নদী দিয়ে নৌকা যোগে দুবলহাটিতে ব্যবসার জন্য আসেন (বর্তমানে নদীর অস্তিত্ব আর নেই)। তিনি প্রায় প্রতিরাতে স্বপ্ন দেখতেন তাঁকে কে যেনো বলছে “তুই যেখানে নৌকা বেঁধেছিস সেখানে জলের নীচে রাজ রাজেশ্বরী দেবীর প্রতিমা আছে।  সেখান থেকে তুলে স্থাপন কর।” রঘুনাথ একদিন ভোর বেলা জলে নেমে দেখলেন সত্যিই সেখানে রাজ রাজেশ্বরীর প্রতিমা আছে। তিনি প্রতিমাটি পানি থেকে তুলে একটি মাটির বেদী তৈরী করে প্রতিষ্ঠা করলেন। এরপর তাঁর ব্যবসায় ব্যাপক উন্নতি হতে থাকে। রঘুনাথের বিত্ত-বৈভবের খবর পৌঁছে যায় মোগল দরবারে। মোগল দরবারের নির্দেশে তাঁকে ডেকে পাঠানো হয় মুর্শিদাবাদ নবাবের দরবারে। নবাব তাঁকে রাজস্ব প্রদানের নির্দেশ জারি করেন। 
 তিনি নবাবকে জানান তিনি যে এলাকায় থাকেন সেখানে শুধু জল আর জল। কোন ফসল হয়না। তবে বড় বড় কৈ মাছ পাওয়া যায়। বিষয় বুঝতে পেরে নবাব তঁকে প্রতি বছর রাজস্ব হিসাবে ২২ কাহন কৈ মাছ প্রদানের নির্দেশ দেন। দুবলহাটি রাজ প্রাসাদে সাড়ে ৩’শ ঘর ছিল। ছিল ৭ টি আঙ্গিনা। প্রাসাদের ভিতর কোনটি ৩ তলা আবার কোনটি ছিল ৪ তলা ভবন। 
 রাজা কৃঙ্করীনাথ রায় চৌধুরীর নাতি ও কুমার অমরেন্দ্র নাথ রায় চৌধুরীর ছেলে দুবলহাটি রাজ পরিবারের ৫৪ তম পুরুষ রবীন্দ্রনাথ রায় চৌধূরী (৭২) জানান,  দুবলহাটীর জমিদারী ছিল সিলেট, দিনাজপুর, পাবনা, বগুড়া, রংপুর ও ভারতের কিছু অংশে। ১টি গোল্ডেন সিলভার ও ১টি আইভরির তৈরী সিংহাসন ছিল। বৃটিশরা সিংহাসন দুটি নিয়ে যায়। হরনাথ রায় চৌধুরী  প্রথম রাজা খেতাব পেয়েছিলেন। 
 রাজা কৃঙ্করীনাথ রায় চৌধুরী পিতা রাজা হরনাথ রায় চৌধুরী অবসাদ যাপনের জন্য “রনবাগ” নামে একটি বাগানবাড়ি তৈরী করেছিলেন। প্রাসাদের ভিতরে ও বাইরে ছিল নাটক এবং যাত্রা মঞ্চ। নিয়মিত নাটক ও যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হতো। দুবলহাটি রাজবাড়িটি একটি ঐতিহ্যবাহি রাজবাড়ি। ইতোমধ্যে দূর্বৃত্তরা প্রাসাদের লোহার বিম, ইট, দরজা জানালা, কড়ি-বর্গা খুলে নিয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময় পত্র পত্রিকায় বহু সংবাদ প্রকাশও হয়েছে। তবু প্রসাশন কোন পদক্ষেপ না নেওয়ায় অবশেষে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেল ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি।
 বিষযটি নিয়ে একুশে পরিষদ নওগাঁ এর সাধারন সম্পদক এমএম রাসেল এর সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, দুবলহাটি রাজবাড়িটি  ছিল আমাদের অহংকার সে কারনে এটি ভেঙ্গে পরার সংবাদে আমরা চরমভাবে ব্যথিত হয়েছি। ঐতিহ্যে নওগাঁ এর সম্পাদক কাজী রাহাত জানান, দুবলহাটি রাজবাড়িটি ছিল নওগাঁবাসীর ঐতিহ্যের  মধ্যে অন্যতম। এটি ভেঙ্গে পরায় আমরা  একটি সম্পদ হারালাম যা আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস বহন করে।

বিডিজার্নাল৩৬৫ডটকম// আরডি/ এসএমএইচ // ২৬ জুলাই ২০১৬

Share.

About Author

Comments are closed.